থানচিতে পানি চাওয়া তৃষ্ণার্ত ফেরিওয়ালার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানি চেষ্টার অভিযোগ, সাম্প্রদায়িক ট্রাম্পকার্ড পিসিপির

থানচিতে পানি চাওয়া তৃষ্ণার্ত ফেরিওয়ালার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানি চেষ্টার অভিযোগ, সাম্প্রদায়িক ট্রাম্পকার্ড পিসিপির

থানচিতে পানি চাওয়া তৃষ্ণার্ত ফেরিওয়ালার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানি চেষ্টার অভিযোগ, সাম্প্রদায়িক ট্রাম্পকার্ড পিসিপির
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

পাহাড়ি জেলা বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া দুইটি পৃথক ঘটনাকে কেন্দ্র করে পার্বত্য অঞ্চলে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে বান্দরবানের থানচি উপজেলার দনরই ম্রো পাড়ায় এক ফেরিওয়ালার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির চেষ্টার অভিযোগে সামাজিকভাবে বিচার সম্পন্ন হয়েছে, অন্যদিকে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় এক ত্রিপুরা কিশোরীর আত্মহত্যাকে ঘিরে স্বজাতির এক যুবকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও কথিত অধিকার আদায়ের নামে পাহাড়ে সহিংসতা ছড়ানো সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর দৃশ্যমান কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। দুই ঘটনায় ভিন্নমুখী প্রতিক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) সহ সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা নিয়ে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গতকাল বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল ২০২৬) বিকাল আনুমানিক ৪টার দিকে বান্দরবানের থানচি উপজেলার দনরই ম্রো পাড়ায় মোঃ রাশেল (২২) নামের এক ফেরিওয়ালাকে সাই রাও ম্রো (১২) নামে এক কিশোরীর প্রতি শ্লীলতাহানির চেষ্টার অভিযোগে পাড়াবাসী আটক করে। অভিযুক্ত রাশেল চুয়াডাঙ্গার দামুরহুদা উপজেলার কুডুলগাছি এলাকার বাসিন্দা বলে জানা গেছে। ঘটনার পর স্থানীয় কারবারি, মৌজার হেডম্যান রেংচিং ম্রো এবং বাঙালি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে ব্যবসায়ী মোঃ জসিমের উপস্থিতিতে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। পরে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য খামলাই ম্রো এবং থানচি সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অংপ্রু ম্রোর পরামর্শক্রমে ঘটনাটি সামাজিকভাবে নিষ্পত্তি করা হয়।

অভিযোগকারী সাই রাও ম্রো’র পরিবার থানায় মামলা করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করায় সামাজিক বিচারের মাধ্যমে অভিযুক্তকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা পরিশোধের পর বিকাল সাড়ে ৬টার দিকে রাশেল পাড়া ত্যাগ করেন।

স্থানীয় অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাশেল ওই এলাকায় ক্রোকারিজ বিক্রির উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন এবং পানির তৃষ্ণা পেলে পাশের ঝিরিতে থাকা মেয়েটিকে কয়েকবার ডাকেন। মেয়েটি বাংলা ভাষা না বোঝায় সাড়া না দিলে তার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য হাত ধরে ২০ টাকার একটি নোট দিয়ে একটু খাবার পানির ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করেন বলে দাবি করা হয়েছে। এ ঘটনায় ভয় পেয়ে কিশোরীটি দৌড়ে পাড়ায় ফিরে গেলে স্থানীয়রা শ্লীলতাহানির অভিযোগ এনে তাকে আটক করে।

ঘটনাটি সামাজিকভাবে মীমাংসা হলেও পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিশেষ করে পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিষ ছড়ানো পিসিপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী অভিযুক্তকে গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে সমালোচনায় সরব হন। একই সঙ্গে ঘটনাটিকে ‘ধর্ষণচেষ্টা’ হিসেবে উপস্থাপনের অভিযোগও উঠেছে।

তবে স্থানীয় কারবারি, হেডম্যান, ভুক্তভোগীর পরিবার ও ম্রো সম্প্রদায়ের নেতাদের পক্ষ থেকে সামাজিক বিচার নিয়ে কোনো আপত্তি পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে, খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার সাপমারা এলাকায় গত ১৩ এপ্রিল কনিকা ত্রিপুরা (১৫) নামে অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো ময়নাতদন্ত ছাড়াই ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাফন সম্পন্ন করা হলেও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট ভাইরাল হলে ঘটনাটি আলোচনায় আসে। ওই পোস্টে দাবি করা হয়, প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে স্বজাতির এক আত্মীয় তরুণ কৃপন ত্রিপুরার মাধ্যমে কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছিল।

মাটিরাঙ্গায় স্বজাতির যুবক কর্তৃক ত্রিপুরা কিশোরী ধর্ষণের অভিযোগ, আত্মহত্যার ঘটনায় তোলপাড়

বৈসু উৎসবের দিন কিশোরীকে কৌশলে বাড়ির বাইরে ডেকে নিয়ে একটি পানীয় পান করানো হয়, যার পর তার আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। পরে তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণের শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। আত্মহত্যার আগে কিশোরী দুটি চিরকুটে নিজের অবস্থার কথা লিখে যায়, যেখানে ঘটনার আভাস পাওয়া যায়। পরিবারের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে বিরোধ ও মানসিক চাপের কারণে সে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে এই ঘটনায় পিসিপি কিংবা অন্যান্য আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর তেমন কোনো প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। একইভাবে অধিকার আদায়ের কথা বলে পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়ানো হিল উইমেন্স ফেডারেশনসহ নারীবাদি সংস্থাগুলোর নীরবতাও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অথচ থানচির ঘটনায় তাদেরই প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে, যা দুই ঘটনার প্রেক্ষিতে ভিন্ন অবস্থান হিসেবে দেখছেন অনেকেই।

বিশ্লেষকদের মতে, দুটি সংবেদনশীল ঘটনায় ভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া পার্বত্য অঞ্চলে বিদ্যমান রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের ইঙ্গিত বহন করে। বিশেষ করে কোনো কোনো গোষ্ঠী নির্দিষ্ট ঘটনাকে ঘিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখালেও অন্য ঘটনায় নীরব থাকার বিষয়টি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

প্রসঙ্গত, পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরেই তথাকথিত উপজাতিভিত্তিক সংগঠন, বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে জাতিগত বিভাজন উসকে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সামান্য ঘটনা কিংবা বিচ্ছিন্ন সামাজিক বিরোধকেও অনেক সময় পরিকল্পিতভাবে ‘জাতিগত নিপীড়ন’ বা ‘সম্প্রদায়গত সংঘাত’ হিসেবে উপস্থাপন করে উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা করা হয় বলে স্থানীয় বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এতে করে পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়ার পাশাপাশি সহাবস্থান ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশও বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, যাচাই-বাছাই ছাড়া তথ্য প্রচার, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাখ্যা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা—এসবই পাহাড়ে স্থিতিশীলতা নষ্টের অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও সম্প্রীতির জন্য উদ্বেগজনক।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed