মিজোরামে নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও এসিড নিক্ষেপ: দুই বিএসএফ সদস্যের ৪২ বছরের কারাদণ্ড
![]()
নিউজ ডেস্ক
ভারতের মিজোরামে প্রায় নয় বছর আগে সংঘটিত এক ভয়াবহ অপরাধের ঘটনায় দুই বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) সদস্যকে মোট ৪২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ২০১৭ সালে এক নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ এবং পরে তার মুখে এসিড নিক্ষেপের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হওয়া বিএসএফ সদস্য নিলাঞ্জন দাস ও দিনেশ কুমারের বিরুদ্ধে এ রায় ঘোষণা করা হয়।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) আইজলের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ সিলভি জোমুয়ানপুই রালতে সাজা ঘোষণা করেন। এর আগে ১২ জুন ভারতীয় দণ্ডবিধির (আইপিসি) বিভিন্ন ধারায় দুই আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। তবে ভুক্তভোগীর সঙ্গীকে হত্যার অভিযোগে পর্যাপ্ত প্রমাণ না পাওয়ায় আদালত তাদের খালাস দেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত জানান, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের দায়ে দুই আসামিকে ২০ বছর, গুরুতর শারীরিক ক্ষতিসহ ধর্ষণের অপরাধে ১০ বছর এবং এসিড হামলার দায়ে ১২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সাজাগুলো ধারাবাহিকভাবে কার্যকর হবে। ফলে প্রত্যেককে মোট ৪২ বছর কারাভোগ করতে হবে।
এছাড়া তিনটি অভিযোগের প্রতিটিতে দুই আসামির প্রত্যেককে ৬০ হাজার রুপি করে জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে প্রতিটি অভিযোগের জন্য অতিরিক্ত দুই মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ১৬ জুলাই মিজোরাম-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মিজোরামের মামিত জেলার সিলসুরি ওয়েস্ট গ্রামের গাসকাটা নদীসংলগ্ন এলাকায় ঘটনাটি ঘটে। ওই নারী ও তার সঙ্গী রাঙ্গোবি বনাঞ্চলে কাঁকড়া ও বুনো শাকসবজি সংগ্রহ করতে গেলে সেখানে দায়িত্বরত বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্য নিলাঞ্জন দাস ও দিনেশ কুমারের মুখোমুখি হন।
বিচার চলাকালে ভুক্তভোগী আদালতে সাক্ষ্য দেন যে, দুই বিএসএফ সদস্য জোরপূর্বক তাকে কাছের একটি সুপারি বাগানে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে। ধর্ষণের পর তারা তার মুখে ক্ষয়কারী রাসায়নিক পদার্থ নিক্ষেপ করে। এতে তার মুখমণ্ডল মারাত্মকভাবে দগ্ধ হয়, স্থায়ী বিকৃতি সৃষ্টি হয় এবং এক চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান তিনি।
ঘটনার দুই দিন পর ২০১৭ সালের ১৮ জুলাই ভুক্তভোগীর ভাইয়ের দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে মারপাড়া থানায় মামলা দায়ের করা হয়। তদন্তকারীরা পরে ভুক্তভোগীর পোশাক এবং ঘটনাস্থলের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া রাঙ্গোবির মরদেহের অবশিষ্টাংশ থেকে গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক আলামত সংগ্রহ করেন।
পরীক্ষাগার প্রতিবেদনে এসিড হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্ষয়কারী রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। এছাড়া ২০১৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর একজন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে আয়োজিত টেস্ট আইডেন্টিফিকেশন প্যারেডে ভুক্তভোগী দুই আসামিকে শনাক্ত করেন।
মামলার শুনানিতে চিকিৎসক, তদন্ত কর্মকর্তা এবং স্থানীয় বাসিন্দাসহ মোট ১৮ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। আদালত ভুক্তভোগীর সাক্ষ্যকে ধারাবাহিক, বিশ্বাসযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য বলে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি চিকিৎসা ও ফরেনসিক প্রমাণ প্রসিকিউশনের মামলাকে আরও শক্তিশালী করেছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।
তবে ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক প্রতিবেদনে রাঙ্গোবিকে হত্যা করা হয়েছে বলে ইঙ্গিত মিললেও আদালত মনে করেন, ওই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দুই আসামির সম্পৃক্ততা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে প্রসিকিউশন ব্যর্থ হয়েছে। বিচারক রালতে রায়ে বলেন, হত্যার সঙ্গে আসামিদের যুক্ত করার মতো পূর্ণাঙ্গ ও নিরবচ্ছিন্ন পারিপার্শ্বিক প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে হত্যার অভিযোগ থেকে তাদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর এই রায়কে ভুক্তভোগীর জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নৃশংস এ হামলার ফলে তিনি স্থায়ী শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন।
ঘটনার ভয়াবহতা এবং দেশের সীমান্ত সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ততার কারণে মামলাটি মিজোরামসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।