কলকাতা বিমানবন্দরের বাঁকড়া মসজিদ বিতর্ক, ঘিরে রেখেছে পুলিশ-কেন্দ্রীয় বাহিনী
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভেতরে রানওয়ে সংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী বাঁকড়া মসজিদে অনির্দিষ্টকালের জন্য নামাজ বন্ধের সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত প্রতিবাদ কর্মসূচি বাতিল করেছেন তৃণমূলের সাবেক মন্ত্রী ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) বেলা ১১টায় বিমানবন্দরের ৭ নম্বর গেটের সামনে জমায়েতের ডাক দিয়েছিলেন তিনি। তবে কর্মসূচি শুরুর আগেই সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী জানান, আজ কোনো প্রতিবাদ কর্মসূচি হচ্ছে না।
তবে তার আগেই জমায়েত হন মুসলিম সম্প্রদায়ের একাংশ। যদিও প্রতিবাদ কর্মসূচি বাতিল হওয়ায় তারা অন্যত্র জুমার নামাজ আদায় করেন।
এদিকে, শুক্রবার ভোর ৫টা থেকেই বাঁকড়া মসজিদ ও সংলগ্ন এলাকা ঘিরে ফেলে পুলিশ ও ভারতের কেন্দ্রীয় বাহিনী। প্রায় ২০০ জন কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদস্য এবং বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের প্রায় ২৫০ জন পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়।
এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১৬৩ ধারা জারি করে চারজনের বেশি মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়। পাশাপাশি গার্ডরেল, জলকামান, কাঁদানে গ্যাসের শেল এবং দমকলের একটি ইঞ্জিন প্রস্তুত রাখা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকিং করে সাধারণ মানুষকে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে সতর্ক করা হয়। এমনকি সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীর বাড়ির আশপাশেও রুট মার্চ চালানো হয় এবং বাইরে থেকে কেউ এলাকায় প্রবেশ করলে তাদেরও আটকে দেওয়া হয়।
প্রায় ১৩৫ বছরের পুরনো বাঁকড়া মসজিদে স্থানীয় মুসল্লিরা প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও জুমার নামাজ আদায় করে আসছেন। স্থানীয়দের দাবি, বামফ্রন্টের ৩৫ বছরের শাসনকাল ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৫ বছরের সরকার– কোনো সময়ই সেখানে নামাজ আদায়ে বাধা সৃষ্টি হয়নি।
তবে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর কলকাতা বিমানবন্দরের সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। রাজ্য সরকারের দাবি, রানওয়ের পাশে মসজিদটি থাকার কারণে বৃহৎ আকারের বোয়িং যাত্রীবাহী ও কার্গো বিমান কলকাতা বিমানবন্দরে অবতরণে সমস্যা হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক যাত্রী ও বিদেশি পণ্যবাহী বিমানের একটি বড় অংশকে দিল্লি, মুম্বাই বা গুজরাটের বিমানবন্দরে অবতরণ করে পরে স্থলপথে কলকাতায় পৌঁছাতে হয়।
এই পরিস্থিতিতে সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও মুসলিম প্রতিনিধিদের মধ্যে একাধিক বৈঠক হয়। বিমানবন্দরের সম্প্রসারণের স্বার্থে বিকল্প স্থানে মসজিদ স্থানান্তরের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মুসলিম কমিটিগুলো নীতিগতভাবে সম্মতি জানায়। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মসজিদে নামাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
কিন্তু বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী দাবি করেন, ঐতিহাসিক ওই মসজিদেই পুনরায় নামাজ পড়ার সুযোগ দিতে হবে। একইসঙ্গে তিনি শুক্রবার বিমানবন্দরের ৭ নম্বর গেটের সামনে প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দেন। তবে প্রশাসনের কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেই শেষ মুহূর্তে সেই কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেন।
এর আগে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, সরকার কারো ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে না। তবে জাতীয় নিরাপত্তা, বিমান চলাচলের নিরাপত্তা এবং কলকাতা বিমানবন্দরের আধুনিকীকরণ সরকারের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তার দাবি, বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ সম্পন্ন হলে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল, বিশেষ করে বড় আকারের যাত্রী ও কার্গো বিমান পরিচালনায় কলকাতার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
বিমানবন্দরের ভেতরে অবস্থিত বাঁকড়া মসজিদকে ঘিরে ধর্মীয় অধিকার, জাতীয় নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন– এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের সূচনা হয়েছে। সিদ্দিকুল্লার কর্মসূচি প্রত্যাহারের পর আপাতত পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকেই নজর রয়েছে রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।