বর্ষার রাঙামাটি: ঝর্ণার যৌবনে পর্যটন ও অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের স্পন্দন
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
পাহাড়, হ্রদ আর ঝর্ণার অপরূপ মিলনে গড়া পার্বত্য জেলা রাঙামাটি বর্ষার ছোঁয়ায় যেন ফিরে পেয়েছে তার চিরচেনা প্রাণ। আষাঢ়-শ্রাবণের টানা বৃষ্টিতে প্রাণ ফিরে এসেছে দীর্ঘদিনের শুকিয়ে যাওয়া ঝর্ণাগুলোতে। শুভলং, ধূপপানি, মুপ্পাছড়া, ঘাগড়া ও নকাটা ঝর্ণার গর্জনে এখন মুখর চারপাশ। প্রকৃতির এই মোহনীয় রূপ উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন পর্যটকরা। এতে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে জেলার পর্যটন খাত, প্রাণ ফিরেছে স্থানীয় অর্থনীতিতেও।
বর্ষার পানি নামতেই রাঙামাটির পাহাড়ি ছড়া ও ঝর্ণাগুলো নতুন রূপে সেজে উঠেছে। পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা জলধারা আর সবুজে মোড়া প্রাকৃতিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। কাপ্তাই হ্রদের শান্ত জলরাশির বুকে স্পিডবোট কিংবা নৌকায় ভ্রমণের সময় চারপাশের সবুজ পাহাড়, মেঘের আনাগোনা এবং ঝিরিঝিরি বৃষ্টির আবহ পর্যটকদের মুগ্ধ করে তুলছে।
রাঙামাটি শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শুভলং ঝর্ণা বর্ষা মৌসুমে পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। ভরা বর্ষায় প্রায় ৩০০ ফুট উঁচু পাহাড় থেকে প্রবল বেগে নেমে আসা জলধারা এক অনন্য সৌন্দর্যের জন্ম দেয়। রাঙামাটির রিজার্ভ বাজার, পর্যটন ঘাটসহ বিভিন্ন স্থান থেকে স্পিডবোট ও নৌযানে সহজেই পৌঁছানো যায় এ পর্যটনকেন্দ্রে।
অন্যদিকে, প্রকৃতিপ্রেমী ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়দের কাছে ধূপপানি ঝর্ণা সবসময়ই একটি বিশেষ আকর্ষণ। পাহাড়ি পথ, ছড়া আর বনাঞ্চল পেরিয়ে প্রায় তিন ঘণ্টার যাত্রা শেষে দেখা মেলে এই ঝর্ণার। স্থানীয়দের ভাষায় ‘ধূপ’ অর্থ সাদা। প্রচলিত জনশ্রুতি রয়েছে, ঝর্ণার উজানে এক সাধু ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। সেই ইতিহাসও পর্যটকদের কাছে বাড়তি আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে।

শুভলংয়ের পাশাপাশি কাউখালীর ঘাগড়া ঝর্ণা, বিলাইছড়ির নকাটা মুপ্পাছড়া ও ধূপপানি ঝর্ণাতেও এখন পর্যটকদের সরব উপস্থিতি। অনেকেই হিমশীতল ঝর্ণার পানিতে গা ভাসিয়ে উপভোগ করছেন প্রকৃতির নির্মল সৌন্দর্য। এছাড়া ঝুলন্ত সেতু, পলওয়েল পার্ক, লাভ পয়েন্ট এবং কাপ্তাই হ্রদকেন্দ্রিক বিভিন্ন পর্যটন স্পটেও প্রতিদিন বাড়ছে দর্শনার্থীর সংখ্যা।
বর্ষা মৌসুমে পর্যটকদের আগমনে স্বস্তি ফিরেছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে। কয়েক মাসের মন্দাভাব কাটিয়ে হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, নৌযান পরিচালনাকারী, পাহাড়ি হস্তশিল্প বিক্রেতা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় নতুন গতি এসেছে। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে পর্যটকের চাপ বাড়ায় বুকিং ও বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা পর্যটক দেবপ্রিয় ও নমিতা রায় বলেন, “বর্ষা মৌসুমে ঝর্ণাগুলো প্রাণ ফিরে পেয়েছে। শুভলং ঝর্ণার সৌন্দর্য আমাদের মুগ্ধ করেছে। পরিবার নিয়ে এখানে এসে দারুণ সময় কাটছে।”
অন্যদিকে, ঢাকা থেকে আসা অনিন্দ্য ও শারমিন দম্পতি বলেন, “শহরের কোলাহল থেকে দূরে পাহাড়, ঝর্ণা আর লেকের শান্ত পরিবেশ আমাদের মুগ্ধ করেছে। বর্ষার রাঙামাটির সৌন্দর্য সত্যিই অনন্য।”

স্থানীয় ব্যবসায়ী মন্টু চাকমা বলেন, “ছুটির দিনে পর্যটকের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। ঝর্ণাগুলোতে পর্যাপ্ত পানি থাকায় দর্শনার্থীরাও বেশি আসছেন। এতে আমাদের ব্যবসা আগের তুলনায় অনেক ভালো হচ্ছে।”
পাহাড়ি হস্তশিল্প ব্যবসায়ী মো. মাসুদ রানা বলেন, “ফেব্রুয়ারির পর পর্যটক অনেক কম ছিল। এখন বর্ষার সৌন্দর্য দেখতে মানুষ আবার রাঙামাটিতে আসছেন। এতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন।”
রাঙামাটি পর্যটন কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক অলোক বিকাশ চাকমা বলেন, “বর্ষায় কাপ্তাই হ্রদের পানি পূর্ণতা পেয়েছে এবং ঝর্ণাগুলোও স্বরূপে ফিরে এসেছে। ফলে পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কক্ষের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বুকিং হচ্ছে। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে রুম ভাড়ায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়ও দেওয়া হচ্ছে।”
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্ষার এই মৌসুমে পর্যটকদের ধারাবাহিক আগমন অব্যাহত থাকলে শুধু পর্যটন শিল্পই নয়, বরং রাঙামাটির স্থানীয় অর্থনীতি, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কর্মসংস্থানেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। পাহাড়, হ্রদ ও ঝর্ণার অপার সৌন্দর্যে ভরপুর রাঙামাটি আবারও দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে নিজস্ব অবস্থান আরও সুদৃঢ় করছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।