তিন পার্বত্য জেলার প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে প্রকল্পে অনিয়মের ছড়াছড়ি, ৪৯ কোটি টাকার বরাদ্দে নয়ছয়
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
শূকরের খাদ্য বাবদ বরাদ্দ ২ কোটি ৮ লাখ টাকা, তবু মেলেনি এক দানা। খামার সংস্কারের জন্য ধরা আছে ২ কোটি ২৭ লাখ টাকা, অথচ এখনো শুরুই হয়নি সংস্কারকাজ। মাচাং ঘরে জায়গা না হয়ে মরে যাচ্ছে মুরগি। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় বাস্তবায়নাধীন ৪৮ কোটি ৯৯ লাখ টাকার একটি প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পে এমন ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে যখন প্রশ্ন করা হলো প্রকল্প পরিচালককে, উত্তর এলো, ‘এগুলো সাংবাদিকের জানার বিষয় নয়… সাধারণ মানুষের এটি বোঝার দরকার নেই।’!
বরাদ্দ আছে, প্রাণীর খাদ্য নেই
প্রাণীর খাদ্য বাবদ প্রকল্পে বরাদ্দ ২ কোটি ৮ লাখ ৫ হাজার টাকা। কিন্তু সুবিধাভোগীদের অভিযোগ, তাঁরা কোনো খাদ্যই পাননি।
সুবিধাভোগী ফুল রতন চাকমা বলেন, কুতুকছড়ি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে আধাবেলা একটি কর্মশালা হয়েছিল, যেখানে এক প্যাকেট ভাত ও ৮০০ টাকা দেওয়া হয়। তবে শূকর দেওয়ার আগে-পরে কোনো খাদ্য মেলেনি।
কুতুকছড়ি আবাসিক এলাকার শান্তি রাম চাকমা বলেন, ‘দুটি শূকর ছানা ও একটি মাচাং ঘর পেয়েছি।’ ঘর তৈরিতে নিম্নমানের কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
প্রাণী যা-ই হোক না কেন—একই মাপের ঘর, মরেছে অর্ধেকের বেশি মুরগি
প্রকল্পের প্রথম ধাপে ২ হাজার ৫৬০ পরিবারকে ৩০টি করে ফাউমি মুরগি, সমসংখ্যক পরিবারকে দুটি করে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল, ৩ হাজার ৪৫৬ পরিবারকে দুটি করে ভেড়া এবং ৩ হাজার ২০০ পরিবারকে দুটি করে শূকর দেওয়া হয়েছে। কারও ঘরে উঠেছে ৩০টি মুরগি, কারও ঘরে মাত্র দুটি ছাগল বা দুটি ভেড়া—অথচ সবার জন্য বরাদ্দ হয়েছে একই মাপের ঘর, ৪ ফুট বাই ৫ ফুটের মাচাং ঘর। প্রাণীর সংখ্যা কত, আকার কত বড়—কোনো কিছু বিবেচনায়ই নেওয়া হয়নি; মোট ১১ হাজার ৭৭৬টি ঘরের প্রতিটিই তৈরি হয়েছে একই নকশা ও একই মাপে।

ফল ভুগতে হয়েছে সরাসরি প্রাণীদেরই। সদর উপজেলা পরিষদসংলগ্ন খামারি লুৎফুন নাহার জানান, ৩০টি মুরগির জন্য দেওয়া ছোট্ট ঘরে জায়গা কুলাতে না পারায় তাঁর ১৪টি মুরগি মারা গেছে—অর্থাৎ পাওয়া মুরগির প্রায় অর্ধেকই।
প্রাণিসম্পদ বিভাগেরই এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাচাং ঘর তৈরিতে ১০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হলেও প্রাণীর ধরন ও সংখ্যা অনুযায়ী আলাদা নকশা না করায় এগুলো উপযুক্ত হয়নি, ফলে সরকারি অর্থ নষ্ট হয়েছে।
কুতুকছড়ি আবাসিক এলাকার সুবিধাভোগী শান্তি রাম চাকমা অভিযোগ করেন, ঘর তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের কাঠ।
পিগ ফার্মের সংস্কার শুরুই হয়নি
রাঙামাটি পিগ ফার্ম সংস্কারের নামে প্রকল্পে বরাদ্দ ২ কোটি ২৭ লাখ ১৩ হাজার টাকা। অথচ এই সংস্কারকাজ এখনো শুরুই হয়নি।
পিগ ফার্মের ব্যবস্থাপক ডা. লেলিন দে জানান, সংস্কার না হলেও তাঁদের খামার থেকে ইতিমধ্যে প্রকল্পের জন্য প্রায় ৮০টি শূকরছানা সরবরাহ করা হয়ে গেছে।
লোকবল সংকটে হিমশিম উপজেলা কর্মকর্তারা
প্রকল্পের নিজস্ব লোকবল না থাকায় এর তদারকির পুরো চাপ এসে পড়েছে উপজেলা পর্যায়ের নিয়মিত কর্মকর্তাদের ওপর—তাঁদের নিজস্ব অফিশিয়াল কাজ ফেলে রেখে সামলাতে হচ্ছে প্রকল্পের কার্যক্রম। অথচ প্রকল্পে আউটসোর্সিং ও অনিয়মিত শ্রমিক নিয়োগ বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ৬১ লাখ টাকার বেশি।
প্রকল্পের রাঙামাটির দায়িত্বে থাকা প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কল্পনা চাকমা বলেন, ‘তিন জেলায় আমাদের মাত্র ৬ জন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জেলা-উপজেলার স্টাফদের নিয়ে কাজ চালাচ্ছি।’ অর্থাৎ তিন জেলার ২৬ উপজেলা ও ১২৮ ইউনিয়নের হাজার হাজার সুবিধাভোগীর কার্যক্রম দেখভালের জন্য প্রকল্পের নিজস্ব জনবল মাত্র ছয়জন—বাকি সব দায়িত্ব বর্তেছে ইতিমধ্যে ব্যস্ত থাকা উপজেলা কর্মকর্তাদের ওপর।
সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা প্রীমা মহাজন বলেন, ‘লোকবল সংকটের মধ্যে ভৌগোলিক বাস্তবতায় প্রতি ইউনিয়নে গিয়ে তাদের কাজ দেখাশোনা করা আমাদের জন্য কঠিন একটি বিষয়। এগুলো দেখাশোনার জন্য প্রতি ইউনিয়নে অন্তত একজন করে লোক দেওয়া দরকার ছিল।’
পাহাড়ি এলাকার দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে এমনিতেই একেকটি ইউনিয়নে যাতায়াতে সময় ও শ্রম বেশি লাগে—তার ওপর পর্যাপ্ত জনবল ছাড়া নিয়মিত তদারকি কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানান তিনি। ফলে মাচাং ঘরের মান, প্রাণীর খাদ্য বিতরণ বা প্রাণী দেখভাল—কোনো কিছুই মাঠপর্যায়ে ঠিকমতো তদারকি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
কাগজে-কলমে যা থাকার কথা ছিল
পার্বত্য অঞ্চলের দরিদ্র মানুষের ভাগ্যবদল, আমিষের চাহিদা পূরণ ও ক্ষুদ্র খামারিদের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি শুরু হয় ‘তিনটি পার্বত্য জেলায় সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প’। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের ২৬ উপজেলার ১২৮ ইউনিয়নে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে এই প্রকল্প, যার প্রাক্কলিত ব্যয় ৪৮ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।

প্রকল্প বিবরণী অনুযায়ী, এই অর্থের একটি বড় অংশ ব্যয় হওয়ার কথা সরাসরি সুবিধাভোগীদের জন্য—প্রশিক্ষণ বাবদ ২ কোটি ৫৬ লাখ ৭ হাজার টাকা, মেডিসিন ও ভ্যাকসিনে ২ কোটি ৫৫ লাখ ৭৮ হাজার টাকা, প্রাণীর খাদ্যে ২ কোটি ৮ লাখ ৫ হাজার টাকা, ইনকিউবেটর মেশিনে ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং সবচেয়ে বড় খাত প্যাকেজ অনুদানে ৩১ কোটি ১১ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। এ ছাড়া রাঙামাটি পিগ ফার্মের সংস্কারে ২ কোটি ২৭ লাখ ১৩ হাজার টাকা, পোলট্রি খামার মেরামতে ২০ লাখ টাকা এবং বেইস লাইন সার্ভেতে ১২ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।
প্রশাসনিক ও প্রচারণা খাতেও বরাদ্দ কম নয়—কর্মশালায় ৪ লাখ ৭৬ হাজার, ভিডিও চিত্র নির্মাণে ৮ লাখ, মুদ্রণ ও প্রকাশনায় ১৯ লাখ, আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগে ৩৪ লাখ ৬ হাজার এবং অনিয়মিত শ্রমিক নিয়োগে ২৭ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। অর্থাৎ পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পে সুবিধাভোগীদের সরাসরি প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত খাদ্য, চিকিৎসা এবং তদারকির জন্য পর্যাপ্ত জনবল—সব মিলিয়েই একটি সমন্বিত কাঠামো দাঁড় করানোর কথা ছিল। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এসব খাতের বেশির ভাগ প্রতিশ্রুতিই থেকে গেছে কাগজে-কলমে।
‘সাধারণ মানুষের বোঝার দরকার নেই’
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, বিভাগটি তাঁর কাছে ন্যস্ত না থাকায় তিনি বিষয়টি অবগত নন। আর প্রকল্প পরিচালক নজরুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এগুলো সাংবাদিকের জানার বিষয় নয়। এটি সম্পূর্ণ প্রাণিসম্পদ বিভাগের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটি আমরা বুঝব, সাধারণ মানুষের এটি বোঝার দরকার নেই।’
-দৈনিক আজকের পত্রিকা।