প্লাস্টিকের দাপট ঠেকিয়ে বাঁশে স্বপ্ন: পাহাড়ের কারিগরদের হাতে খুলছে নতুন অর্থনীতির দুয়ার
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
পরিবেশদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মধ্যে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে বিশ্বজুড়ে গুরুত্ব বাড়ছে পরিবেশবান্ধব ও পচনশীল বাঁশের। ‘সবুজ সোনা’ হিসেবে পরিচিত এই প্রাকৃতিক সম্পদ এখন শুধু পাহাড়ি মানুষের ঘরবাড়ি কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী তৈরির উপকরণ নয়; আধুনিক নকশা ও প্রযুক্তির সংযোজনে বাঁশ হয়ে উঠছে সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক পণ্য তৈরির কাঁচামাল। আর এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে রাঙামাটির পাহাড়ি জনপদে তৈরি হচ্ছে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ।
একসময় পাহাড়ে বাঁশের ব্যবহার মূলত ঘরবাড়ি নির্মাণ, ঝুড়ি, ঝাঁকা ও অন্যান্য গৃহস্থালি সামগ্রী তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সহজলভ্য ও তুলনামূলক সস্তা প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার বাড়তে থাকায় বাঁশের ঐতিহ্যবাহী বহুমুখী ব্যবহার অনেকটাই কমে যায়। প্লাস্টিকের সহজলভ্যতার কারণে পাহাড়ের বহু পরিবারে বাঁশের তৈরি ঐতিহ্যবাহী পণ্যের ব্যবহারও কমতে থাকে।
তবে পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে সচেতনতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আবার বদলাতে শুরু করেছে। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ায় বাঁশের তৈরি সামগ্রীর বাজারেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী বাঁশশিল্পকে আধুনিক ও বাণিজ্যিক রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রাঙামাটিতে সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং ‘বারেং শেয়ার্ড মার্কেট’ চালুর উদ্যোগ এই সম্ভাবনাকে আরও এগিয়ে নিচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব উদ্যোগ সফলভাবে এগিয়ে নেওয়া গেলে পাহাড়ের হাজারো কারিগর ও প্রান্তিক নারী-পুরুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বাঁশজাত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে পাহাড়ি অর্থনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

আধুনিক নকশায় তৈরি বাঁশের হাতব্যাগ, ল্যাম্পশেড, গয়না, শো-পিসসহ নানা ধরনের পণ্য ইতোমধ্যে তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। পাশাপাশি টিস্যু বক্স, পেনস্ট্যান্ড, ট্রে ও পরিবেশবান্ধব ফাইল ফোল্ডারের মতো পণ্যেও প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে বাঁশের ব্যবহার বাড়ছে। গৃহস্থালিতে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বিভিন্ন পাত্রের পরিবর্তে বাঁশের তৈরি আকর্ষণীয় বাটি, চামচ, টেবিলম্যাটসহ নানা পণ্যও জায়গা করে নিচ্ছে।
পাহাড়ে সহজলভ্য কাঁচামাল এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা বাঁশশিল্পের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে এসব পণ্য তৈরি করছেন স্থানীয় কারিগরেরা। বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাও এ কাজে এগিয়ে এসেছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্থানীয় কারিগরদের আধুনিক নকশায় পণ্য তৈরির কৌশল শেখানোর পাশাপাশি তাঁদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রশিক্ষণার্থী অমর বিকাশ চাকমা বলেন, আগে তাঁদের বাড়িতে নিজেদের ব্যবহারের জন্য কিছু বাঁশের পণ্য তৈরি করা হতো। প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়ার পর সেই চর্চাও অনেকটা কমে যায়। তবে প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন নতুন নতুন নকশায় বাঁশের পণ্য তৈরির কৌশল শিখেছেন। এসব পণ্য বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানো যাবে বলে আশা করছেন তিনি।
আরেক প্রশিক্ষণার্থী মঙ্গল কুমার চাকমা বলেন, পাহাড়ে বাঁশজাত পণ্য তৈরির কাঁচামালের অভাব নেই। ফলে পণ্য উৎপাদনে কাঁচামাল সংকট হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে পণ্য তৈরির চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সেগুলো বাজারজাত করা। তাঁর মতে, আশিকা ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েটস তাঁদের জন্য ‘বারেং’ নামে একটি বিক্রয়কেন্দ্র চালু করায় এখন উৎপাদিত পণ্য সরাসরি বাজারে বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
‘বারেং’-এ পণ্য বিক্রির সঙ্গে যুক্ত নমিতা চাকমা বলেন, এই বাজারের মাধ্যমে পণ্য উৎপাদনকারীরা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য থেকে অনেকটাই মুক্ত হতে পারবেন। কারিগরেরা তাঁদের তৈরি পণ্যের ন্যায্য মূল্য সরাসরি হাতে পাওয়ার সুযোগ পাবেন। এতে পণ্য তৈরিতে সাধারণ মানুষের আগ্রহ আরও বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।

প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি পাহাড়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আশিকা ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েটসের নির্বাহী পরিচালক বিল্পব চাকমা।
তিনি বলেন, প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহারের কারণে পরিবেশের চরম ক্ষতি হচ্ছে। এই ক্ষতি কমিয়ে আনার পাশাপাশি বাঁশের বহুমুখী ব্যবহার বাড়িয়ে স্থানীয় মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যেই তাঁদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। এখন পর্যন্ত প্রায় ২০০ জন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তাঁরা প্রত্যেকে ২০ ধরনের নকশায় বিভিন্ন বাঁশজাত পণ্য তৈরির কাজ শিখেছেন।
বিল্পব চাকমার ভাষ্য, পাহাড়ের প্রান্তিক নারী-পুরুষ কারিগরদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করতে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দেশীয় বাজারে বাঁশের তৈরি পণ্যের ভালো চাহিদা রয়েছে। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে বাঁশজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো গেলে একদিকে পরিবেশ সুরক্ষা সম্ভব হবে, অন্যদিকে পার্বত্য অঞ্চলের প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের হাত ধরে দেশের অর্থনীতিতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
শুধু স্থানীয় পর্যায়েই নয়, বাঁশের এই বহুমুখী সম্ভাবনা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে সরকারি পর্যায়েও। সম্প্রতি বাঁশের তৈরি বিভিন্ন পণ্যের বহুমুখী ব্যবহার দেখতে রাঙামাটি সফর করেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের সচিব মো. দাউদ মিয়া।

তিনি বলেন, বাঁশ দিয়ে তৈরি বিভিন্ন পণ্য তিনি দেখেছেন। পরিবেশ ধ্বংসকারী প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করে পরিবেশবান্ধব বাঁশের পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো গেলে একদিকে পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে নতুন নতুন উদ্যোক্তাও তৈরি হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড়ে বাঁশের প্রাচুর্য, স্থানীয় কারিগরদের ঐতিহ্যবাহী দক্ষতা এবং আধুনিক নকশার সমন্বয় ঘটাতে পারলে এ খাত বড় একটি শিল্পে পরিণত হতে পারে। প্রয়োজন শুধু প্রশিক্ষণের ধারাবাহিকতা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, মানসম্মত পণ্য উৎপাদন এবং নির্ভরযোগ্য বাজারব্যবস্থা।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন বাজারজাতকরণ। উৎপাদিত পণ্য নিয়মিত ও ন্যায্যমূল্যে বিক্রির নিশ্চয়তা না থাকলে নতুন উদ্যোক্তাদের আগ্রহ ধরে রাখা কঠিন হবে। ‘বারেং শেয়ার্ড মার্কেট’-এর মতো সরাসরি বাজারব্যবস্থা আরও বিস্তৃত করা গেলে কারিগর ও ক্রেতার মধ্যে দূরত্ব কমবে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উৎপাদকরা বেশি লাভবান হতে পারবেন।
পরিবেশ রক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার এই দ্বৈত সম্ভাবনাই বাঁশকে পাহাড়ের মানুষের জন্য নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে বাঁশের ব্যবহার যদি ঘরোয়া পর্যায় থেকে বাণিজ্যিক ও বৃহৎ বাজারে আরও বিস্তৃত করা যায়, তাহলে পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী বাঁশশিল্প শুধু টিকে থাকবে না, বরং নতুন প্রজন্মের কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির অন্যতম ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।