পাইলিং জটিলতায় থমকে ব্যাঙছড়ি সেতুর নির্মাণ, ঝুঁকিপূর্ণ বেইলি ব্রিজে প্রতিদিন শত শত যানবাহন
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই আঞ্চলিক সড়কের ব্যাঙছড়ি সেতুর নির্মাণকাজ পাইলিং জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে নির্মাণাধীন পাকা সেতুর পাশ দিয়ে নির্মিত ঝুঁকিপূর্ণ অস্থায়ী বেইলি ব্রিজের ওপর দিয়েই প্রতিদিন শত শত ছোট-বড় যানবাহন চলাচল করছে। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকায় যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা ও স্থানীয়রা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ব্যাঙছড়ি এলাকার পুরোনো কালভার্ট ব্রিজটি দীর্ঘদিন ব্যবহারে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় প্রায় দুই বছর আগে সেখানে নতুন একটি পাকা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম সড়ক ও জনপথ বিভাগ সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু করে। নির্মাণকাজ চলাকালে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বিকল্প হিসেবে নির্মাণ করা হয় একটি অস্থায়ী বেইলি ব্রিজ।
নতুন পাকা সেতুটি নির্মিত হলে দীর্ঘদিনের ঝুঁকি দূর হবে এবং এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যানবাহন চলাচল আরও নিরাপদ হবে—এমন প্রত্যাশা ছিল স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবহন চালকদের। কিন্তু নির্মাণকাজ শুরুর প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও পাইলিং জটিলতায় কাজ থেমে থাকায় সেই প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি।
চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কটি শুধু স্থানীয় যোগাযোগের জন্য নয়, পার্বত্য রাঙামাটির সঙ্গে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের যোগাযোগের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। কাপ্তাই একটি অন্যতম পর্যটন এলাকা হওয়ায় প্রতিদিন বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকবাহী ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস ও অন্যান্য যানবাহন এই সড়ক ব্যবহার করে।
এর পাশাপাশি স্থানীয় ও দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, পণ্যবাহী যান, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করে সড়কটিতে। ফলে ব্যাঙছড়ির অস্থায়ী বেইলি ব্রিজটি হয়ে উঠেছে এই বিশাল যানবাহন চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্ভরতা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে অস্থায়ী ব্রিজটি ব্যবহারের কারণে এর ওপর চাপও বাড়ছে। বিশেষ করে ভারী যানবাহন চলাচলের সময় চালক ও যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। বেইলি ব্রিজের ওপর দিয়ে পার হওয়ার সময় প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে বলে জানান তারা।

স্থানীয় সিএনজি চালক আবু বক্কর ও গিয়াস উদ্দিন, মোটরসাইকেল আরোহী পাইসু মারমা ও ইমন দাশ এবং ট্রাকচালক জব্বার বলেন, পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনার পরিবর্তে নতুন পাকা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হওয়ায় তারা আশাবাদী হয়েছিলেন। দ্রুত কাজ শেষ হলে নিরাপদে যানবাহন চলাচল করতে পারবে—এমন প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় সেই প্রত্যাশা এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা বাস-মিনিবাস সমিতির সভাপতি নুর হোসেন বলেন, দীর্ঘদিনেও পাকা সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় ঝুঁকি নিয়েই যানবাহন চলাচল করতে হচ্ছে। দ্রুত সেতুটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই কমবে।
দক্ষিণ চট্টগ্রাম ট্রাক সমিতির সভাপতি মির্জা নাজিম উদ্দীন খোকন বলেন, পাকা সেতুর নির্মাণকাজ শুরুর প্রায় দুই বছর অতিবাহিত হলেও দৃশ্যমান তেমন অগ্রগতি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ থাকায় একদিকে যানবাহন চলাচলে ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে যাত্রী ও চালকদের ভোগান্তিও বাড়ছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইরফান উল করিমের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সেতু নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় এ পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে পাইলিং-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। এজন্য কাজের সময় বাড়ানোর জন্য ওয়ার্ক এক্সটেনশনের প্রয়োজন হয়েছে।
নির্মাণকাজের তদারকির দায়িত্বে থাকা মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, কয়েক মাস ধরে তিনি বেতন পাচ্ছেন না। কাজ বন্ধ থাকায় নির্মাণস্থলে রাখা রডসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীও দীর্ঘদিন ধরে পড়ে রয়েছে। এতে নির্মাণসামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী মাইদুল ইসলাম বলেন, কারিগরি ত্রুটির কারণে সেতুটির নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল। দ্রুতই কাজ আবার শুরু করা হবে।
তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, শুধু কাজ পুনরায় শুরু করাই নয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দ্রুত ও মানসম্মতভাবে নির্মাণকাজ শেষ করা হবে। কারণ চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কে যানবাহনের চাপ দিন দিন বাড়ছে। একই সঙ্গে কাপ্তাইয়ের পর্যটন সম্ভাবনা ও স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে এই সড়কের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাঙছড়িতে একটি টেকসই পাকা সেতু নির্মাণ সম্পন্ন হলে দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ঝুঁকি কমার পাশাপাশি যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে গতি আসবে। পর্যটকদের যাতায়াত আরও নিরাপদ হবে, কমবে পরিবহন ব্যয় ও সময়। একই সঙ্গে কাপ্তাই ও আশপাশের এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তাই পাইলিং জটিলতা দ্রুত নিরসন করে ব্যাঙছড়ি সেতুর নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে দীর্ঘদিনের অস্থায়ী সমাধানের পরিবর্তে দ্রুত স্থায়ী অবকাঠামো নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।