নারী ফুটবল টুর্নামেন্ট থেকে গাছের চারা বিতরণ- সেনাবাহিনীর আয়োজনে ব্যতিক্রমী জনসম্পৃক্ততার দৃষ্টান্ত
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
খেলাধুলার মাঠে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো, তরুণ প্রজন্মকে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য জোরদারের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তা ছড়িয়ে দিতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দীঘিনালা জোন। জোনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘দীঘিনালা ফুটবল কাপ টুর্নামেন্ট (নারী)-২০২৬’ ঘিরে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। আর খেলার মাঠের এই আয়োজনেই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে ফলজ, বনজ ও ফুলের ১ হাজার ৫০০ চারা।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা জোনের আয়োজনে এ নারী ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়। খেলায় বাবুছড়া ইউনিয়ন পরিষদ একাদশের কাছে ৫-০ গোলে পরাজিত হয় বোয়ালখালী ইউনিয়ন পরিষদ একাদশ।
টুর্নামেন্টকে ঘিরে শুধু দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যেই নয়, স্থানীয় মানুষের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়। আয়োজকদের তথ্যমতে, খেলাটি উপভোগ করতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষসহ প্রায় তিন হাজার দর্শক উপস্থিত ছিলেন। পাহাড়ি জনপদে নারী ফুটবলকে কেন্দ্র করে এমন ব্যাপক জনসমাগম স্থানীয় পর্যায়ে খেলাধুলার প্রতি মানুষের আগ্রহ এবং নারী ক্রীড়ার সম্ভাবনাকে নতুন করে সামনে এনেছে।
দীঘিনালা জোনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—এটি কেবল একটি ফুটবল ম্যাচে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে পরিবেশ রক্ষার বার্তাকে একসূত্রে যুক্ত করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে দীঘিনালা জোনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১ হাজার ৫০০টি ফলজ, বনজ ও ফুলের চারা বিতরণ করা হয়।
জোন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আল আমিন শিক্ষার্থীদের হাতে এসব চারা তুলে দেন। শিক্ষার্থীদের হাতে গাছের চারা তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পরিবেশ সংরক্ষণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, পাহাড়ি অঞ্চলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়, বন ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্ক সরাসরি। ফলে শিক্ষার্থীদের হাতে চারা তুলে দিয়ে সেগুলো রোপণ ও পরিচর্যার দায়িত্বে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ ভবিষ্যতে পরিবেশবান্ধব একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে পারে।

একই সঙ্গে নারী ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজনের মধ্য দিয়ে নারীদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকার অনেক নারী ও কিশোরী নানা সামাজিক ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে নিয়মিত ক্রীড়াচর্চার সুযোগ পান না। এমন বাস্তবতায় স্থানীয় পর্যায়ে নারী ফুটবল আয়োজন তাদের জন্য অংশগ্রহণের পাশাপাশি নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরার একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খেলাধুলা শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি তরুণদের শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব, দলগত মনোভাব, আত্মবিশ্বাস ও প্রতিযোগিতার মানসিকতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে মাদক, অপরাধ ও নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রেখে সুস্থ ও সুশৃঙ্খল জীবনের দিকে ধাবিত করতে ক্রীড়া কার্যক্রম কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
দীঘিনালা জোনের এ আয়োজনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা। অনুষ্ঠানে দীঘিনালা জোনের উপ-অধিনায়ক, জোন অ্যাডজুটেন্ট, কোয়ার্টার মাস্টার, মেডিকেল অফিসার, দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিল পারভেজ, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য মোশারফ হোসেন ও শান্তিপ্রিয় চাকমা, দীঘিনালা উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. শফিকুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক জয়নুল আবেদীন, বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
পাহাড়ি-বাঙালি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে আয়োজনটি পরিণত হয় একটি বৃহৎ সামাজিক মিলনমেলায়। ফলে ক্রীড়াকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও পারস্পরিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
খেলায় শুরু থেকেই দাপট দেখায় বাবুছড়া ইউনিয়ন পরিষদ একাদশ। ধারাবাহিক আক্রমণে বোয়ালখালী ইউনিয়ন পরিষদ একাদশের রক্ষণভাগকে চাপে রেখে একে একে পাঁচটি গোল আদায় করে নেয় তারা। শেষ পর্যন্ত ৫-০ গোলের বড় ব্যবধানে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে বাবুছড়া ইউনিয়ন।
খেলা শেষে বিজয়ী দলের খেলোয়াড় ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া খেলোয়াড়রাও ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে নারী ফুটবল আয়োজনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সেনাবাহিনীর এমন আয়োজন সাধারণ মানুষের সঙ্গে একটি ইতিবাচক যোগাযোগের ক্ষেত্র তৈরি করছে। বিশেষ করে শুধু নিরাপত্তা কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ক্রীড়া, শিক্ষা, পরিবেশ ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হওয়ার ফলে স্থানীয় জনগণের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে পারস্পরিক যোগাযোগ আরও বাড়ছে।

তাদের মতে, একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের মাধ্যমে একই সঙ্গে নারী ক্ষমতায়ন, তরুণদের ক্রীড়ামুখী করা, সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি এবং পরিবেশ সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। এ ধরনের কার্যক্রম প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় প্রতিভা বিকাশের সুযোগও তৈরি করে।
বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের হাতে ১ হাজার ৫০০ চারা তুলে দেওয়ার বিষয়টি আয়োজনটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। একটি গাছ শুধু পরিবেশের জন্য নয়, পাহাড়ি জনপদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি সম্পদ—এই উপলব্ধি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে এ উদ্যোগের মাধ্যমে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে নিয়মিতভাবে এ ধরনের ক্রীড়া ও সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হলে দীঘিনালার তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নেতৃত্ব ও দায়িত্ববোধ আরও বাড়বে। পাশাপাশি নারী খেলোয়াড়দের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে এবং পরিবেশ সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণও আরও জোরদার হবে।
দীঘিনালা ফুটবল কাপ টুর্নামেন্ট (নারী)-২০২৬ তাই কেবল একটি ফুটবল ম্যাচের আয়োজন নয়; বরং খেলাধুলার মাধ্যমে তরুণদের ইতিবাচক পথে এগিয়ে নেওয়া, নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো, সামাজিক সম্প্রীতি জোরদার এবং শিক্ষার্থীদের পরিবেশ সংরক্ষণে সম্পৃক্ত করার একটি সমন্বিত উদ্যোগ হিসেবে স্থানীয়দের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
পাহাড়ের জনপদে উন্নয়ন ও নিরাপত্তার পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ, তরুণ প্রজন্মের সম্ভাবনা বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবুজ পরিবেশ তৈরিতে এমন উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে তা স্থানীয় সমাজে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।