রাঙামাটি চ্যাম্পিয়ন্স লীগ শুরু, ফুটবল উন্নয়নের পাশাপাশি যুবসমাজকে মাদকমুক্ত রাখার আহ্বান
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
উৎসবমুখর ও জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে রাঙামাটিতে শুরু হয়েছে ‘রাঙামাটি চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ফুটবল টুর্নামেন্ট’। দীর্ঘদিন পর জেলার ফুটবল অঙ্গনে এমন বড় আয়োজনকে ঘিরে খেলোয়াড় ও দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে। উদ্বোধনী আয়োজনে ফুটবল উন্নয়নের পাশাপাশি যুবসমাজকে মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে রেখে সুস্থ ও কর্মমুখী জীবনে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার দুপুরে রাঙামাটি মারী স্টেডিয়ামে সেনাবাহিনীর রাঙামাটি রিজিয়নের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় এবং রাঙামাটি পার্বত্য জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহযোগিতায় টুর্নামেন্টের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে টুর্নামেন্টের উদ্বোধন ঘোষণা করেন রাঙামাটি রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ নাজমুল হক।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দীপন তালুকদার, জেলা প্রশাসক নামজা আশরাফী, পুলিশ সুপার আব্দুর রকিব এবং জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব সাইফুল ইসলাম (ভুট্টো)। এ ছাড়া জেলা ক্রীড়া ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, খেলোয়াড় এবং বিপুলসংখ্যক ফুটবলপ্রেমী দর্শক উপস্থিত ছিলেন।
আয়োজকরা জানান, পার্বত্য অঞ্চলে খেলাধুলার প্রসার ঘটানো, স্থানীয় পর্যায়ে নতুন ফুটবল প্রতিভা খুঁজে বের করা এবং যুবসমাজকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে দূরে রেখে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে উদ্বুদ্ধ করাই এই টুর্নামেন্টের অন্যতম উদ্দেশ্য। টুর্নামেন্টকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন পর রাঙামাটির ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। উদ্বোধনী ম্যাচে দর্শকদের উপস্থিতি ও উচ্ছ্বাসে মারী স্টেডিয়াম ছিল প্রাণবন্ত।
উদ্বোধনী বক্তব্যে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, রাঙামাটি চ্যাম্পিয়ন্স লীগ থেকে নতুন প্রতিভাবান খেলোয়াড় উঠে আসবে এবং তারা ভবিষ্যতে জাতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে—এটাই তাঁর প্রত্যাশা। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ফুটবলকে আরও সমৃদ্ধ করতে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিভা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কার্যক্রম শুধু ফুটবল উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের মানুষের উন্নয়ন ও পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের কল্যাণেও সেনাবাহিনী বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
রিজিয়ন কমান্ডার সেনাবাহিনীর বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের কথা তুলে ধরে বলেন, প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্যারামেডিক প্রশিক্ষণ, বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি নারীদের স্বাবলম্বী করতে সেলাই প্রশিক্ষণ, স্থানীয় তরুণদের জরুরি চিকিৎসাসেবায় সক্ষম করে তুলতে ফার্স্ট এইড ক্যাডার প্রশিক্ষণ, ছানি অপারেশন এবং যুবকদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে মেকানিক্যালসহ বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, এসব কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য হচ্ছে দুর্গম এলাকার মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং তাদের নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করা।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউপিডিএফ নেতা মাইকেল চাকমার সেনাবাহিনীর বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে রিজিয়ন কমান্ডার বলেন, সেনাবাহিনী দেশকে ভালোবাসে, পার্বত্য অঞ্চলকে ভালোবাসে এবং এ অঞ্চলের মানুষকে ভালোবাসে। তাই সেনাবাহিনীর জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম নিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে আগের মতো পরিস্থিতি তৈরি করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, জনগণ এখন অনেক বেশি সচেতন এবং কে তাদের পাশে আছে, আর কে তাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে—তা তারা বুঝতে পারে।
রিজিয়ন কমান্ডার অভিযোগ করেন, রাঙামাটি অঞ্চল থেকে ইউপিডিএফের পক্ষ থেকে প্রতি মাসে ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়।
তিনি সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রসঙ্গ টেনে প্রশ্ন রাখেন, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য ইউপিডিএফ কী ধরনের সহায়তা করেছে। রিজিয়ন কমান্ডার বলেন, বিপদের সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত জনসেবা। তাঁর অভিযোগ, সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সংগঠনটির পক্ষ থেকে কোনো আর্থিক সহায়তা তিনি দেখতে পাননি।
তিনি বলেন, “পার্বত্য এলাকার মানুষকে এত বোকা মনে করবেন না।” জনগণ কারা তাদের জন্য কাজ করছে এবং কারা সুযোগ নিচ্ছে—তা বুঝতে সক্ষম বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রিজিয়ন কমান্ডার আরও বলেন, ইউপিডিএফের মতো সশস্ত্র সংগঠনকে মোকাবিলার জন্য সবসময় সেনাবাহিনীর প্রয়োজন হবে—এমনটি তিনি মনে করেন না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় জনগণই একসময় এ ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় অবস্থান নেবে।

তিনি বলেন, জনগণকে বিভ্রান্ত না করে বাস্তবতা মেনে নেওয়া উচিত। তাঁর ভাষায়, জনগণ বুঝতে পারে কে সঠিক আর কে ভুল এবং শেষ পর্যন্ত জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে কার অবস্থান কোথায়।
উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের উদ্দেশ্য হলো সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানো। স্বাস্থ্যসেবা, কারিগরি দক্ষতা, নারী স্বাবলম্বিতা, শিক্ষা ও ক্রীড়ার সুযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করাই এসব উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
রিজিয়ন কমান্ডারের বক্তব্যে ফুটবলকে শুধু বিনোদন বা প্রতিযোগিতার মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং যুবসমাজকে মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে রাখার কার্যকর মাধ্যম হিসেবেও তুলে ধরা হয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই টুর্নামেন্টের মাধ্যমে রাঙামাটির প্রত্যন্ত এলাকা থেকে নতুন নতুন খেলোয়াড় উঠে আসবে এবং ভবিষ্যতে তারা জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে মাঠে গড়ায় টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচ। এতে মুখোমুখি হয় লংগদু উপজেলা ও বরকল উপজেলা দল। শুরু থেকেই দুই দল আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে খেললেও নির্ধারিত সময়ে কোনো দলই গোল করতে পারেনি। ফলে ম্যাচের ফল নির্ধারণের জন্য টাইব্রেকারের আশ্রয় নিতে হয়।
টাইব্রেকারে শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে লংগদুকে পরাজিত করে জয় ছিনিয়ে নেয় বরকল উপজেলা দল। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচটি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে। দুই দলের খেলোয়াড়দের লড়াই, গোলরক্ষকদের দৃঢ়তা এবং টাইব্রেকারের টানটান উত্তেজনা উদ্বোধনী ম্যাচকে স্মরণীয় করে তোলে।
আয়োজকদের মতে, রাঙামাটি চ্যাম্পিয়ন্স লীগ শুধু একটি ফুটবল প্রতিযোগিতা নয়; এটি পার্বত্য জেলার তরুণদের ক্রীড়ামুখী করে গড়ে তোলা, স্থানীয় প্রতিভা বিকশিত করা এবং তাদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার একটি উদ্যোগ। নিয়মিতভাবে এ ধরনের আয়োজন করা গেলে জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের জাতীয় পর্যায়ে তুলে আনার সুযোগ তৈরি হবে।
একই সঙ্গে ক্রীড়া কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে তরুণদের মাদক, অপরাধ ও নানা ধরনের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখার ক্ষেত্রেও এই আয়োজন কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রাঙামাটি রিজিয়নের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় শুরু হওয়া এই টুর্নামেন্টকে ঘিরে তাই ক্রীড়াঙ্গনের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়েও তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।