রাখাইনে সব বেসামরিককে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, দাবি যুদ্ধবন্দি দুই সেনার
ছবি- ইরাবতী।
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
রাখাইনে পাল্টা অভিযানে ব্যর্থ হয়ে সাধারণ বেসামরিক মানুষকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। এমন দাবি করেছেন আরাকান আর্মির (এএ) হাতে আটক হওয়া দেশটির দুই সেনাসদস্য। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, নারী, শিশু ও বয়স্কসহ কোনো বেসামরিক মানুষকে রেহাই না দেওয়ার নির্দেশ ছিল।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে হারানো এলাকা পুনর্দখলে গত ৪ সেপ্টেম্বর ‘অপারেশন ৪৯২৬’ শুরু করে দেশটির সামরিক বাহিনী। অভিযানে যুদ্ধবিমান, গোলন্দাজ ইউনিট ও নৌবাহিনীর জাহাজ ব্যবহার করা হলেও কিয়াউকফিউ ও পন্ন্যাগুন টাউনশিপে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ে তারা। এসব সংঘর্ষে সামরিক বাহিনীর কয়েক ডজন সদস্য, এমনকি কয়েকজন কমান্ডারও আরাকান আর্মির কাছে আত্মসমর্পণ করেন।
গত রোববার পন্ন্যাগুন ও রাখাইন রাজ্যের রাজধানী সিত্তের মধ্যবর্তী এলাকায় ১৬ সেপ্টেম্বরের সংঘর্ষের পর উদ্ধার করা বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদের পাশাপাশি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিহত সদস্যদের মরদেহ প্রদর্শন করে আরাকান আর্মি। একই সঙ্গে আটক দুই সেনাসদস্যের বক্তব্যের ভিডিও প্রকাশ করে তারা।
আরাকান আর্মির প্রকাশ করা ভিডিওতে ‘মাইকেল’ নামে এক সেনাসদস্য বলেন, তাঁদের সামনে যেসব জাতিগত রাখাইন বেসামরিক মানুষ পড়বে, সবাইকে হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। নারী ও শিশুকেও রেহাই না দেওয়ার কথা তাঁদের জানানো হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
মাইকেলের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ম্যাগওয়ে অঞ্চলের পাকোক্কু টাউনশিপে অবস্থানরত ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন-১০১-এর ২৫৭ ব্যাটালিয়নে বাধ্যতামূলকভাবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। সরকারি বাহিনী পিছু হটার সময় আমিইন্ট কিউন গ্রামের কাছে আরাকান আর্মির একটি ইউনিট তাঁকে আটক করে। তিনি বলেন, সম্মুখসারিতে তাঁকে রেখে যাওয়া হয়েছিল এবং আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে গুলি চালিয়ে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
মাইকেল আরও জানান, তাঁর সঙ্গে থাকা অনেক নিম্নপদস্থ সেনাসদস্যই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে আগ্রহী ছিলেন না। সুযোগ পেলে তাদের দলত্যাগ করে আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগ দেওয়ার পরামর্শও দিয়েছিলেন তিনি।
একই ধরনের দাবি করেছেন আরেক যুদ্ধবন্দি অং পায়ে সোনে। তিনি ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন-১০১-এর ২৫২ ব্যাটালিয়নের নিয়মিত সেনাসদস্য এবং আমিইন্ট কিউন গ্রামের কাছেই আটক হন। আরাকান আর্মির প্রকাশ করা ভিডিওতে তিনি বলেন, শিশু ও বয়স্কসহ সামনে যাকে পাওয়া যাবে, সবাইকে গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে স্থানীয়দের গবাদিপশু নিয়ে যাওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়।
অং পায়ে সোনে বলেন, তাঁকে ও তাঁর মতো জুনিয়র সেনাসদস্যদের শেষ পর্যন্ত লড়াই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পিছু হটা কিংবা আত্মসমর্পণের কোনো সুযোগ ছিল না। তাঁর দাবি, বাহিনীর অনেক সদস্যই দলত্যাগের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। তবে ধরা পড়লে নিজেদের সেনাদের হাতেই গুলিতে নিহত হওয়ার আশঙ্কা ছিল তাদের।
তবে রাখাইনে বেসামরিক মানুষকে দেখামাত্র হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম দ্য ইরাবতী।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনী থেকে বেরিয়ে আসা সাবেক ক্যাপ্টেন জিন ইয়াও দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারের সংঘাত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর কমান্ডাররা দীর্ঘদিন ধরেই রাখাইন জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে আরাকান আর্মির সমর্থক হিসেবে বিবেচনা করে আসছেন। তাঁর মতে, বেসামরিক মানুষকে হত্যার নির্দেশসংক্রান্ত যুদ্ধবন্দিদের বক্তব্যের সঙ্গে সেনাবাহিনীর অতীত কর্মকাণ্ডেরও মিল রয়েছে।
জিন ইয়াও দাবি করেন, বিদ্রোহী জাতিগোষ্ঠীগুলোকে চাপে রাখতে বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করার কৌশল মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পুরোনো। ২০১৬ সালে তিনি সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকার সময় কাচিন রাজ্যে তৎকালীন নর্দার্ন মিলিটারি কমান্ডের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নি নি সোয়েকে বেসামরিক মানুষ দেখামাত্র হত্যার নির্দেশ দিতে দেখেছেন বলেও দাবি করেন। তবে বিদ্রোহীদের ঘাঁটি বা অস্ত্রের বদলে বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে তাঁর বক্তব্য।
বর্তমানে রাখাইন রাজ্যের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টির নিয়ন্ত্রণ রয়েছে আরাকান আর্মির হাতে। পাশাপাশি প্রতিবেশী চিন রাজ্যের পালেতোয়া টাউনশিপও তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এখন তারা চীনের সহায়তায় গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক অঞ্চল ও সমুদ্রবন্দরের কারণে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিয়াউকফিউ এবং রাখাইন রাজ্যের রাজধানী সিত্তে দখলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। একই সঙ্গে ম্যাগওয়ে, বাগো ও ইরাবতী অঞ্চলেও নিজেদের অভিযান সম্প্রসারণ করছে আরাকান আর্মি।
এদিকে পাল্টা অভিযানে ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে পড়ার মধ্যে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী রাখাইনে বেসামরিক স্থাপনায় নৌবাহিনীর জাহাজ ও যুদ্ধবিমান দিয়ে হামলা বাড়িয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব হামলায় ইতোমধ্যে বহু মানুষ নিহত হয়েছেন এবং স্কুল, বাজার, হাসপাতাল ও ধর্মীয় স্থাপনাসহ বিভিন্ন বেসামরিক অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।