পাহাড়ে ৩ জাতীয় কমিটিকে সাধুবাদ, চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের দাবি পিসিএনপির
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সম্প্রতি গঠিত তিনটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় কমিটিকে সাধুবাদ জানিয়ে পাহাড় থেকে সশস্ত্র তৎপরতা ও চাঁদাবাজি নির্মূল, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন এবং সশস্ত্র সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ (পিসিএনপি)। একই সঙ্গে জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রতিবাদ, পাহাড়ের সর্বসাধারণের প্রতিনিধি হিসেবে শিশির চাকমার দেওয়া সংবাদ সম্মেলন প্রত্যাখ্যান এবং ব্যারিস্টার মীর হেলালকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে বহাল রাখার দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাঙামাটি শহরের কাঁঠালতলীর মৃধা ভবনে পিসিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়। সংগঠনটির নেতারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, নীতি নির্ধারণ, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে সমন্বয় এবং জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে সরকার যে তিনটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে, সেগুলো পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি, নিরাপত্তা ও পাহাড়ি-বাঙালি সম্প্রীতি জোরদারে ভূমিকা রাখতে পারে।
এর আগে, সরকার ১০ সেপ্টেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি, নির্বাহী কমিটি ও পরামর্শক কমিটি গঠন করে। সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী; নির্বাহী কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং পরামর্শক কমিটির সভাপতি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির চেয়ারম্যান। জাতীয় কমিটির দায়িত্বের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন তদারকি রয়েছে। নির্বাহী কমিটিকে নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন, সীমান্ত নিরাপত্তা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও জীবনমান উন্নয়নে জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আর পরামর্শক কমিটিকে উন্নয়ন, নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন ও সম্প্রীতি রক্ষায় সুপারিশ দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে পিসিএনপি নেতারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও পাহাড়ে অস্ত্রের ব্যবহার, সশস্ত্র তৎপরতা, চাঁদাবাজি ও সংঘাত পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে তারা মনে করেন। তাদের ভাষ্য, শান্তিচুক্তির মাধ্যমে যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বাস্তব পরিস্থিতিতে তার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেনি। এ কারণে বর্তমান বাস্তবতা, নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে চুক্তিটি পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
লিখিত বক্তব্যে পিসিএনপি চেয়ারম্যান কাজী মজিবর রহমান বলেন, পাহাড়ের স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় সরকারের নতুন উদ্যোগকে তারা ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তবে চুক্তির দীর্ঘ সময় পরও সশস্ত্র তৎপরতা ও চাঁদাবাজি অব্যাহত থাকার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তিনি বলেন, শুধু প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক উদ্যোগ নয়, পাহাড়ে বসবাসরত সব জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা, সমঅধিকার ও উন্নয়ন নিশ্চিত করার বিষয়টিকেও জাতীয় কর্মকৌশলের কেন্দ্রে রাখতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে জেএসএসের সাম্প্রতিক বিবৃতিরও তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। পিসিএনপি নেতাদের অভিযোগ, জেএসএস এখনো অস্ত্র ও সশস্ত্র কর্মকাণ্ড থেকে পুরোপুরি সরে আসেনি এবং পাহাড়ে চাঁদাবাজি ও অবৈধ সশস্ত্র অবস্থান বজায় রেখে শান্তিচুক্তির কথা বলছে। তাদের ভাষায়, এ ধরনের বক্তব্য বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে জেএসএস এর আগে সরকারের তিন কমিটি গঠন নিয়ে আপত্তি জানিয়ে বলেছে, চুক্তিকে পাশ কাটিয়ে একতরফাভাবে কমিটিগুলো গঠন করা হয়েছে। দলটির ২৭ সেপ্টেম্বরের বিবৃতিতে তিন কমিটি বাতিল এবং চুক্তি বাস্তবায়নের বিদ্যমান কাঠামো পুনর্গঠনের দাবি জানানো হয়েছে।
পিসিএনপি নেতারা শিশির চাকমার সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনেরও নিন্দা জানান। তারা বলেন, শিশির চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বসাধারণের প্রতিনিধি নন। পিসিএনপির অভিযোগ, তিনি মূল বাস্তবতা আড়াল করে জেএসএসের বক্তব্য ও অবস্থানকে সামনে নিয়ে আসছেন। সংগঠনটির নেতারা দাবি করেন, সাধারণ জনগণের পক্ষ থেকে কথা বলার ক্ষেত্রে কারা প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব করছেন, সেটি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা উচিত নয়।
সংবাদ সম্মেলনে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলালকে স্বপদে বহাল রাখার দাবিও জানানো হয়। পিসিএনপি নেতারা বলেন, পাহাড়ে শান্তি, সম্প্রীতি এবং সর্বস্তরের মানুষের উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা রয়েছে বলে তারা মনে করেন। এ কারণে তাঁকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে বহাল রাখার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান তারা।
পিসিএনপির অন্যতম প্রধান দাবি ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন। সংগঠনটির নেতাদের অভিযোগ, জেএসএস চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে সশস্ত্র কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে চুক্তির বাস্তবায়ন, কার্যকারিতা এবং পাহাড়ের নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে এর বিভিন্ন দিক নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জেএসএস, ইউপিডিএফ ও কেএনএফকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণার আহ্বান জানানো হয়।
তবে এ দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর অবস্থান এক নয়। বিশেষ করে জেএসএস সরকার গঠিত তিন কমিটিকে চুক্তির কাঠামোর বাইরে গিয়ে গঠিত উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করে তা বাতিলের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটি বলেছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক উপায়ে সমাধানের জন্য চুক্তি বাস্তবায়নের বিদ্যমান কাঠামোকে কার্যকর করা প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে পাহাড়ে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচার নিশ্চিত করতে একটি ‘লিগ্যাল টাস্কফোর্স’ গঠনের দাবিও জানানো হয়। পিসিএনপি নেতারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা গেলে অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি ভবিষ্যতে সহিংসতা কমানোর ক্ষেত্রেও তা ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর কাছে ন্যস্ত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিভাগগুলো পুনরায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে পিসিএনপি। সংগঠনটির নেতাদের মতে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক খাতের কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তদারকি প্রয়োজন।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থার পরিবর্তে সব পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য ‘অনগ্রসর কোটা’ চালুর দাবিও উত্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদে জনসংখ্যার অনুপাতে পাহাড়ে বসবাসকারী সব জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানান পিসিএনপি নেতারা। তাদের মতে, স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামোতে সব জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব থাকলে পারস্পরিক আস্থা ও অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়তে পারে।
বিদেশি এনজিওগুলোর কার্যক্রমেও আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। পিসিএনপি নেতারা এ ক্ষেত্রে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে তদারকির প্রস্তাব দেন। তাদের বক্তব্য, পার্বত্য চট্টগ্রামে কাজ করা দেশি-বিদেশি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং তাদের প্রকল্প ও অর্থব্যয়ের বিষয়ে যথাযথ নজরদারি থাকা প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে পিসিসিপি কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও রাঙামাটি জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য হাবীব আজমের সঞ্চালনায় লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন পিসিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান কাজী মজিবর রহমান। এ সময় পিসিএনপি রাঙামাটি জেলা সভাপতি আবু বক্কর সিদ্দিক, সাধারণ সম্পাদক মো. ইব্রাহিম, সহসাধারণ সম্পাদক মাওলানা ইব্রাহিম, মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মোরশেদা আক্তার, যুব পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুর হোসেন, পিসিসিপি রাঙামাটি জেলা সভাপতি তাজুল ইসলাম তাজ, সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেনসহ পিসিএনপি, পিসিসিপি, পিসিজেপি ও পিসিএমপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনের শেষভাগে পিসিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি, নিরাপত্তা, সম্প্রীতি ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় সরকার গঠিত তিনটি জাতীয় কমিটির যেকোনো গঠনমূলক উদ্যোগে নাগরিক পরিষদ সহযোগিতা করবে। একই সঙ্গে পাহাড়ের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা, সশস্ত্র সহিংসতা ও চাঁদাবাজি বন্ধ করা এবং উন্নয়ন কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার জন্য সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
পিসিএনপির এই সংবাদ সম্মেলন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে সরকারের গঠিত তিনটি কমিটির কার্যপরিধি নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সরকারি কাঠামোতে জাতীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নির্বাহী পর্যায়ে কর্মকৌশল প্রণয়ন এবং পরামর্শক পর্যায়ে সুপারিশ প্রদানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অন্যদিকে জেএসএস এই কাঠামোর বিরোধিতা করে চুক্তি বাস্তবায়নের বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠনের দাবি জানিয়েছে। ফলে নতুন কমিটিগুলোর কার্যক্রম এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সঙ্গে এর সম্পর্ক আগামী দিনে পাহাড়ের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।