যুক্তির লড়াইয়ে জমজমাট খাগড়াছড়ির বিতর্ক উৎসব, চ্যাম্পিয়ন নতুন কুঁড়ি

যুক্তির লড়াইয়ে জমজমাট খাগড়াছড়ির বিতর্ক উৎসব, চ্যাম্পিয়ন নতুন কুঁড়ি

যুক্তির লড়াইয়ে জমজমাট খাগড়াছড়ির বিতর্ক উৎসব, চ্যাম্পিয়ন নতুন কুঁড়ি
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

আড়াইশ আসনের পরিপাটি হলকক্ষে একটি আসনও খালি নেই। চারদিকে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও বিতর্কপ্রেমীদের সরব উপস্থিতি। আর মঞ্চে একের পর এক যুক্তি, পাল্টা যুক্তি ও বাচিক দক্ষতায় নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখছে খুদে বিতার্কিকরা। জেলা শহরের ছয়টি এবং দীঘিনালা উপজেলার দুটি বিদ্যালয়ের অংশগ্রহণে দিনব্যাপী জমজমাট বিতর্ক উৎসবে এমনই প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে খাগড়াছড়ির বিতর্ক অঙ্গন।

শব্দ ও বাক্যের প্রতি মমতা, যুক্তির শক্তি এবং আত্মবিশ্বাসী উপস্থাপনায় সম্ভাবনাময় খুদে বিতার্কিকদের সরব উপস্থিতিতে মুখর ছিল পুরো আয়োজন। ঘড়ির কাঁটা যখন সকাল ১০টার কাছাকাছি, তখন সমবেত জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে নতুন কুঁড়ি ক্যান্টনমেন্ট হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক শিবাজী কুমার দে বিতর্ক উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন।

নতুন কুঁড়ি ক্যান্টনমেন্ট হাই স্কুলের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মাটিরাঙা গোমতী বি. কে. হাই স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ বেতারের উপস্থাপক ও খাগড়াছড়ি ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুদ্দীন আনসারী মিঠু।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বিএফএফ-সমকাল আয়োজিত এ বিতর্ক উৎসব খাগড়াছড়িতে বিতর্কচর্চার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। এ ধরনের আয়োজনের ফলে গত এক যুগে জেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে বিতর্কচর্চার প্রতি আগ্রহ ও দায়বদ্ধতা বেড়েছে। অনেক বিদ্যালয়ে বিতর্কের জন্য আলাদা কক্ষ, দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত চর্চার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যেও বিতর্কচর্চার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বেড়েছে।

বক্তারা আরও বলেন, বিতর্ক শুধু প্রতিযোগিতার বিষয় নয়; এটি শিক্ষার্থীদের যুক্তিবোধ, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস ও বক্তব্য উপস্থাপনের দক্ষতা বিকাশে সহায়তা করে। একটি বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি তুলে ধরার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা তথ্য যাচাই, চিন্তার গভীরতা এবং শুদ্ধভাবে মত প্রকাশের অভ্যাস গড়ে তোলার সুযোগ পায়। এ আয়োজন থেকে উঠে আসা অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তী শিক্ষা জীবনেও নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখছে বলেও তারা উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন নতুন কুঁড়ি ক্যান্টনমেন্ট হাই স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম এবং এডুলাইফ আইটি ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী আমির হোসেন রোজেল। স্বাগত বক্তব্য দেন সমকাল প্রতিনিধি প্রদীপ চৌধুরী।

এবারের বিতর্ক উৎসবে অংশ নেয় দীঘিনালা মডেল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, দীঘিনালা বড়াদম উচ্চ বিদ্যালয়, খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, খাগড়াছড়ি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, নতুন কুঁড়ি ক্যান্টনমেন্ট হাই স্কুল, খাগড়াছড়ি পুলিশ লাইন্স হাই স্কুল, টিউফা আইডিয়াল হাই স্কুল ও এপিবিএন উচ্চ বিদ্যালয়।

যুক্তির লড়াইয়ে জমজমাট খাগড়াছড়ির বিতর্ক উৎসব, চ্যাম্পিয়ন নতুন কুঁড়ি

প্রথম পর্বেই প্রথমবারের মতো অংশ নিয়ে নজর কাড়ে দীঘিনালার দুটি বিদ্যালয়। যুক্তির শক্তিতে খাগড়াছড়ি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়কে হারিয়ে সেমিফাইনালে জায়গা করে নেয় দীঘিনালা মডেল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। অন্যদিকে খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়কে পরাজিত করে সেমিফাইনালে ওঠে দীঘিনালা বড়াদম উচ্চ বিদ্যালয়। প্রথমবার অংশ নিয়েই দুই বিদ্যালয়ের এমন সাফল্য বিতর্ক উৎসবে নতুন মাত্রা যোগ করে।

সেমিফাইনালে খাগড়াছড়ি পুলিশ লাইন্স হাই স্কুলকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে দীঘিনালা বড়াদম উচ্চ বিদ্যালয়। অপর সেমিফাইনালে দীঘিনালা মডেল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়কে পরাজিত করে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে নতুন কুঁড়ি ক্যান্টনমেন্ট হাই স্কুল।

ফাইনালে মুখোমুখি হয় দীঘিনালা বড়াদম উচ্চ বিদ্যালয় ও নতুন কুঁড়ি ক্যান্টনমেন্ট হাই স্কুল। মঞ্চে দুই দলের বিতার্কিকদের যুক্তি-পাল্টা যুক্তিতে জমে ওঠে প্রতিযোগিতা। দীঘিনালা বড়াদম উচ্চ বিদ্যালয়ের পারমী চাকমা, উজুকো চাকমা ও আদর্শি চাকমা নিজেদের যুক্তি ও উপস্থাপনার মাধ্যমে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলে নতুন কুঁড়ির দলকে বেশ চাপের মধ্যে ফেলেন। তবে শেষ পর্যন্ত নতুন কুঁড়ি ক্যান্টনমেন্ট হাই স্কুলের ইলমুল হক নোহার দক্ষতা ও যুক্তির ধার ফাইনালে তাদের এগিয়ে নেয়।

ফলাফলে চ্যাম্পিয়ন হয় নতুন কুঁড়ি ক্যান্টনমেন্ট হাই স্কুল। রানারআপ হয় দীঘিনালা বড়াদম উচ্চ বিদ্যালয়। ফাইনালে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি নতুন কুঁড়ির ইলমুল হক নোহা নির্বাচিত হন শ্রেষ্ঠ বক্তা। এর আগে বিদ্যালয়টি বিএফএফ-সমকাল বিজ্ঞান বিতর্ক প্রতিযোগিতায়ও একাধিকবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে।

সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন খাগড়াছড়ি জেলা রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ভাইস চেয়ারম্যান ও খাগড়াছড়ি ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক দুলাল হোসেন। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন মাটিরাঙা শান্তিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক আব্দুল খালেক, দীঘিনালা মডেল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক লিটন দাস, বড়াদম উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ডিগনিটি চাকমা ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রতিভা ত্রিপুরা।

দিনব্যাপী এ বিতর্ক উৎসব ঘিরে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে ছিল ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। বিশেষ করে দীঘিনালার দুই বিদ্যালয়ের প্রথমবার অংশগ্রহণ এবং তাদের সেমিফাইনাল ও ফাইনালে ওঠার মধ্য দিয়ে প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিতর্কচর্চার সম্ভাবনা ও আগ্রহের বিষয়টি সামনে এসেছে।

আয়োজকদের মতে, নিয়মিত বিতর্কচর্চার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যুক্তিনির্ভর চিন্তা, শুদ্ধ ভাষায় বক্তব্য উপস্থাপন, শ্রোতার সামনে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলা এবং ভিন্নমতকে বোঝার মানসিকতা তৈরি হয়। এ ধরনের আয়োজন শুধু প্রতিযোগিতায় বিজয়ী নির্ধারণ করে না, বরং ভবিষ্যতের শিক্ষার্থী ও নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে। খাগড়াছড়িতে দীর্ঘদিনের বিতর্কচর্চার ধারাবাহিকতায় এমন আয়োজন ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হবে—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন সংশ্লিষ্টরা।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *