ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে প্রদেশ ভাঙার নতুন সিদ্ধান্ত সেনাপ্রধানের!
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) সমর্থকদের বিক্ষোভ আয়োজনের অনুমতি দেয়া হবে কি না, তা নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে টানাপোড়েন চলছে পাকিস্তানের রাজনীতিতে। ক্রিকেটার থেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়া ইমরান খানের সমর্থকেরা তার প্রতি নিজেদের অটুট আনুগত্য দেখাতে ডাক দিয়েছেন বিক্ষোভের। জবাবে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন সরকারের মন্ত্রীরাও।
সোমবার (৫ অক্টোবর) ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানী ইসলামাবাদে কর্তৃপক্ষ দুই হাজারের বেশি পণ্যবাহী কনটেইনার দিয়ে সড়ক বন্ধ করে দিয়েছে। কিছু কনটেইনারে আবার পেরেকও লাগানো হয়েছে। শহরের প্রবেশপথগুলোতে লাঠি হাতে পুলিশ সদস্যদের বাস দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।
পিটিআই ও সরকারের মধ্যে আলোচনা অচলাবস্থায় পৌঁছানোর পর অবশেষে ৪ অক্টোবর বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। ইসলামাবাদ থেকে ২৭৫ কিলোমিটার পশ্চিমে পিটিআই-শাসিত খাইবার পাখতুনখাওয়া (কেপি) প্রদেশের লাক্কি মারওয়াত থেকে প্রায় ৫ হাজার ইমরান সমর্থক মিছিল শুরু করেন। পথে আরও সমর্থক তাদের সঙ্গে যোগ দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তবে তারা শেষ পর্যন্ত রাজধানীর দিকে মিছিল করবেন কি না, সে সিদ্ধান্ত এখনও নেননি।
প্রদেশ ভাঙার পরিকল্পনা
তবে এই রাজনৈতিক উত্তেজনার আড়ালে পাকিস্তানে ক্ষমতার আরেকটি লড়াই চলছে। ইমরান খান যখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন, তখন তাকে কারাগারে পাঠানোর পেছনে থাকা ব্যক্তি নিজের পরবর্তী পদক্ষেপের পরিকল্পনা করছেন। পাকিস্তানের কার্যত শাসক ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির দেশটির রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে নতুন প্রদেশ তৈরির পরিকল্পনা করছেন।
এটি প্রশাসনিক পরিবর্তন মনে হলেও এর রাজনৈতিক প্রভাব অনেক বড়। এর মাধ্যমে পাকিস্তানের বংশপরম্পরায় ক্ষমতা ধরে রাখা রাজনৈতিক দলগুলোর শক্ত ঘাঁটিগুলো ভেঙে দেয়া হতে পারে। তবে ফিল্ড মার্শাল তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেন কি না, সেটিই তার ক্ষমতার ওপর বড় পরীক্ষা হয়ে উঠবে।
গত দুই বছরে পাকিস্তানের সংবিধান দুইবার সংশোধন করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের অনুগতদের দিয়ে গঠিত নতুন ফেডারেল কনস্টিটিউশনাল কোর্ট (এফসিসি) এখন সুপ্রিম কোর্টের ওপর প্রাধান্য পাচ্ছে। সেপ্টেম্বরে আদালত কার্যত এমন একটি সিদ্ধান্ত আটকে দেয়, যেখানে ইমরান খানকে চিকিৎসার জন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের কথা বলা হয়েছিল।
আসিম মুনির দেশটির বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করেছেন এবং সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগ ও বরখাস্তের ক্ষেত্রেও তার নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছেন। এমনকি আনুষ্ঠানিকভাবে বেসামরিক সরকারের হাতে থাকা বিভিন্ন নিয়োগের ওপরও তার নিয়ন্ত্রণ প্রকাশ্যভাবে স্বীকৃত। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফকে ব্যাপকভাবে তার হাতের পুতুল হিসেবে দেখা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভিকে তার চেয়েও ক্ষমতাবান মনে করা হয়, কারণ তিনি ফিল্ড মার্শালের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।
এত ক্ষমতা অর্জনের পরও আসিম মুনির হতাশ বলে তার ঘনিষ্ঠরা মনে করেন। এদিকে পাকিস্তানের অর্থনীতি এখনও সংকটে। সেপ্টেম্বরে দেশটির বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। ঋণ পরিশোধ, সামরিক বাহিনীর সদস্যদের নতুন পোশাক ও অন্যান্য সুবিধার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করার পর কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে খুব বেশি অর্থ অবশিষ্ট থাকে না। জুলাইয়ে সরকার পেট্রোলের ওপর কর বাড়ায়। তবে নতুন এই করের বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিক্ষোভের কর্মসূচি সেপ্টেম্বরে স্থগিত করা হয়।
ইমরান খান ও বর্তমান সেনাবাহিনীঘনিষ্ঠ সিনেটর ফয়সাল ভাউদার ভাষ্য, বিশ্বমঞ্চে ফিল্ড মার্শালের সাফল্যের সঙ্গে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে তার বেসামরিক সহকর্মীদের সাফল্যের কোনো মিল নেই। ভাওদার মতো সমর্থকেরা এখন প্রকাশ্যেই বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সমালোচনা করছেন। তিনি বলেন, ‘তারা দেশটাকে ধর্ষণ করেছে।’
নতুন প্রদেশ তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে বিতর্কের পেছনে এই পরিস্থিতিও ভূমিকা রাখছে। পরিকল্পনার সূচনা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভি। জুলাইয়ে দেয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থা ধসে পড়েছে।’ জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আমদানিনির্ভরতা ও বাড়তে থাকা ঋণের কারণে দেশটি সংকটে পড়েছে এবং এসব সমস্যা মোকাবিলা করতে পারছে না বর্তমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘হতাশ তরুণেরা সবকিছু উল্টে দিতে পারে। এর একমাত্র সমাধান হলো পাকিস্তানের চারটি প্রদেশকে আরও ছোট ছোট ইউনিটে ভাগ করা।’ এই প্রস্তাবই তীব্র বিতর্ক তৈরি করেছে।
পাকিস্তানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই প্রদেশ পাঞ্জাব ও সিন্ধু। পাঞ্জাব দেশটির সবচেয়ে ধনী ও জনবহুল প্রদেশ। পুরোনো ব্যবসাকেন্দ্র লাহোর এবং এর আশপাশের উর্বর সমভূমি নিয়ে গঠিত এই প্রদেশের নামের অর্থ ‘পাঁচ নদী’। গত প্রায় চার দশক ধরে প্রদেশটি শরিফ পরিবার ও তাদের দল পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) নিয়ন্ত্রণে।
প্রথমে নওয়াজ শরিফ প্রদেশটির রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেন এবং পরে প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর তার ভাই শেহবাজ শরিফ প্রধানমন্ত্রী হন। এখন নওয়াজের মেয়ে মরিয়ম পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী। তিনি আবার তার চাচার পদে বসার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের দরিদ্র প্রদেশ সিন্ধুতে রয়েছে দেশটির প্রধান বন্দরনগরী করাচি। প্রদেশটি ভুট্টো পরিবারের রাজনৈতিক ঘাঁটি। জুলফিকার আলী ভুট্টো ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) মাধ্যমে সেখানে রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলেন এবং পরে পাকিস্তানের শাসক হন। তার মেয়ে বেনজির ভুট্টো ২০০৭ সালে নিহত হওয়ার আগে প্রদেশটির নেতৃত্বে ছিলেন।
এখন সিন্ধু ভুট্টোর স্বামী আসিফ আলি জারদারির নিয়ন্ত্রণে। তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। তিনি ক্ষমতাসীন জোটকে সমর্থন করেন এবং সেনাবাহিনী-সমর্থিত সরকারের ঘনিষ্ঠ। ভুট্টো পরিবারের উত্তরাধিকারী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারিকে ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
নতুন প্রদেশ তৈরির পক্ষে সরকারের যুক্তি হলো, বর্তমান প্রদেশগুলো অনেক বড় ও দুর্নীতিগ্রস্ত এবং স্থানীয় শাসনব্যবস্থা দুর্বল। এই যুক্তির কিছু ভিত্তিও রয়েছে। পাঞ্জাবে ১২ কোটি ৮০ লাখ মানুষ বসবাস করে। গ্রামীণ বাসিন্দাদের জমি-সংক্রান্ত বিরোধ মেটাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভ্রমণ করতে হয়।
পাকিস্তানিরা নওয়াজের প্রাসাদ ও মরিয়মের বিমানের মতো বিষয়কে ব্যাপক সুবিধাভোগী শাসকশ্রেণির প্রতীক হিসেবে দেখে। সাবেক সিন্ধু গভর্নর মুহাম্মদ জুবায়েরের ভাষায়, সিন্ধুতে পিপিপি দুর্নীতিকে একটি শিল্পে পরিণত করেছে। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে দলটি।
তবে অনেকের সন্দেহ, ফিল্ড মার্শালের পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতা কমিয়ে দেয়া। সেনাবাহিনী কেন্দ্রীয় পর্যায়ে শাসনকার্য পরিচালনা করে এবং দীর্ঘকাল ধরেই ক্ষমতা ও সম্পদ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীভূত করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। জুনে ফিল্ড মার্শাল মুনির প্রদেশগুলোকে কেন্দ্রের কাছ থেকে পাওয়া অনুদান ছেড়ে দিতে বাধ্য করেন, যার পরিমাণ ছিল মোট সরকারি ব্যয়ের প্রায় ৩ শতাংশ।
নতুন পরিকল্পনার সমালোচকেরা বলছেন, এর ফলে বেসামরিক সরকারের ক্ষমতা আরও দুর্বল হবে। দীর্ঘমেয়াদে আরও বেশি প্রদেশ তৈরি হলে শুধু আরও বেশি সরকারি পদ ও সুবিধা তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। পাকিস্তানের বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, কোনো প্রদেশকে ভাগ করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রাদেশিক পরিষদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। ফলে ফিল্ড মার্শালকে নিজের পরিকল্পনার পক্ষে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের ভোট দিতে রাজি করাতে হবে।
পিএমএল-এন এ ক্ষেত্রে প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে। দলটি বর্তমানে অজনপ্রিয় এবং ক্ষমতাসীন ব্যবস্থার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেছে। তবে শরিফ পরিবার পাঞ্জাব ভাগ হয়ে যাক তা কখনই চাইবেন না, তবে তাতে তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকে থাকবে। পিপিপির জন্য বিষয়টি অস্তিত্বের প্রশ্ন। করাচি তাদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার ব্যবস্থার ভিত্তি। সিন্ধু শাসনের মাধ্যমে শহরটির ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকলেও সেখানে দলটির সমর্থন খুব বেশি নয়।
সেপ্টেম্বরে সিন্ধু প্রাদেশিক পরিষদ নতুন প্রদেশ তৈরির পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে একটি প্রস্তাব পাস করেছে। ব্যক্তিগত আলোচনায় আসিম মুনির এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে জানা যায়। সিনেটর ফয়সাল ভাউদা ভবিষ্যৎ কয়েক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে জাতীয় গণভোট হতে পারে বলে ধারণা করছেন। এতে প্রাদেশিক পরিষদের অনুমোদনের প্রয়োজন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কেউ কেউ মনে করছেন, এমন গণভোট ফিল্ড মার্শালের নিজেকে শক্তিশালী নির্বাহী প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথে একটি ধাপ হতে পারে। ২০০০-এর দশকে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত বেসামরিক সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখলের পর পারভেজ মোশাররফও এ ধরনের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেছিলেন।
তবে ফিল্ড মার্শাল শেষ পর্যন্ত নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারবেন কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তার খুব বেশি জনসমর্থন নেই। একই সঙ্গে জনসমর্থনপুষ্ট ইমরান খান কারাগারে থাকা অবস্থায় তিনি তার সব রাজনৈতিক মিত্রকে বিরাগভাজন করতে চাইবেন কি না, সেটিও প্রশ্ন।
ইমরান খানের দলেও কেউ কেউ সেনাবাহিনী ও সরকারের মধ্যে তৈরি হওয়া ফাটলকে সুযোগ হিসেবে দেখছেন। পিটিআইয়ের সাবেক এক মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ‘ব্ল্যাক সোয়ান’ বা একটি অপ্রত্যাশিত বড় ঘটনার অপেক্ষায় আছি।’
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।