আপত্তি ও বিক্ষোভের মুখেই দুবাইয়ের কোম্পানির হাতে চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও আপত্তির মধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব পেল সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ড।
বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে তিনটায় ঢাকার আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটির কার্যালয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ড ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যে ১৫ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি সই হয়।
বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি এই চুক্তি সমন্বয় করতে ভূমিকা রেখেছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কনটেইনার টার্মিনালগুলোর একটি হলো এনসিটি।
২০০৭ সালে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই টার্মিনালে পাঁচটি জেটি রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে মোট যত কনটেইনার ওঠানামা করে, তার প্রায় অর্ধেক পরিচালিত হয় এই টার্মিনালের মাধ্যমে।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের শাসনামলেই এনসিটি পরিচালনার কাজ ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উদ্যোগটি বাস্তবায়ন হয়নি তখন।
পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও এটিকে বিদেশি কোম্পানির সাথে চুক্তি করার কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। কিন্তু বন্দরের শ্রমিক কর্মচারীদের বিরোধিতার মুখে সরকার সেই কার্যক্রম স্থগিত করে।
এরপর চলতি বছরের শুরুতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে তারা ফের এই কার্যক্রমে হাত দেয়।
কী কারণে এই চুক্তি, কী কী পরিবর্তন আসবে?
এতদিন নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্বে ছিল দেশীয় প্রতিষ্ঠান। আওয়ামী লীগের শাসনামল থেকে এক যুগেরও বেশী সময় ধরে এটি পরিচালনা করেছে সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড।
এরপর ২০২৫ সালের ছয়ই জুলাই প্রতিষ্ঠানটির চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে পরদিন থেকে দায়িত্ব নেয় বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেড।
আর, এই নতুন চুক্তির ফলে এখন থেকে এটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ডিপি ওয়ার্ল্ডের।
তবে টার্মিনালের মালিকানা বিদেশি কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে না। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতেই মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ থাকবে। চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ১৫ বছর টার্মিনাল পরিচালনার পাশাপাশি যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের দায়িত্ব পালন করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড।
আর এই ১৫ বছর পর যদি দুই পক্ষ সম্মত হয়, তাহলে চুক্তির মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়তে পারে।
নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মলনে জানিয়েছেন, “পোর্ট ইজারা দেওয়া আর কনটেইনার হ্যান্ডলিং একই জিনিস নয়। যারা বলছে পোর্ট ইজারা দেওয়া হচ্ছে, তারা এই চুক্তি সম্বন্ধে জ্ঞাত নয়।”
“এই পোর্টের মালিকানা, নিরাপত্তা, সার্বিক ব্যবস্থাপনা দেখভালের দায়িত্ব বন্দর কর্তৃপক্ষের, এনবিআরের, কাস্টমসের, গোয়েন্দা সংস্থার, নিরাপত্তা বাহিনীর। এটা ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে যাচ্ছে না।”
সরকারের উদ্দেশ্য এই টার্মিনালকে আন্তর্জাতিক মানের করা, প্রযুক্তিগত দিক থেকে আধুনিকায়ন করা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, আমদানি-রপ্তানি বাড়ানো, অপেক্ষার সময় কমিয়ে আনাসহ বেশ কিছু বিষয়।
“ম্যানুয়াল বা অযাচিত হস্তক্ষেপ থেকে এটিকে মুক্ত করা হলো প্রাপ্তি। আমরা প্রতি বছর ১০ কোটি টাকা পোর্ট থেকে পাবো। যে রাজস্ব সংগ্রহ হবে, তার ৬৭ শতাংশ সরকার পাবে। অর্থাৎ, আধুনিক পোর্ট পাচ্ছেন, অর্থনৈতিক সম্পৃদ্ধি ও অগ্রগতি পাচ্ছেন, শ্রমিক-কর্মচারীদের দক্ষ করতে পারছেন,” বলেন মন্ত্রী।
তিনি আরও জানান, ডিপি ওয়ার্ল্ড টার্মিনালকে নতুন করে সাজানোর জন্য ১৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে এবং বাংলাদেশ ৬০০ কোটি টাকা সাইনিং মানি হিসেবে পাচ্ছে।
এই চুক্তি হতে এত লম্বা সময় কেন লাগলো?
এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার আলোচনা অবশ্য নতুন নয়।
২০১৯ সাল থেকেই এ নিয়ে আলোচনা চলছিল। ২০২৩ সালের মার্চে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।
পরে অন্তর্বর্তী সরকার ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেয়।
তবে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের তীব্র বিরোধিতা ও ধর্মঘটের মুখে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের আগে সেই প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সেই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন বিএনপির নেতারাও।
সেসময় চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এই টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা দেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ নয় এবং এই বন্দরকে বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সরকারই আবার ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে এবং চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেয়।
চলতি বছরের পহেলা অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তির খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেয়।
যদিও বিএনপিপন্থী শ্রমিক সংগঠনগুলো এখনও এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছে।
কিন্তু বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের সাত মাসের মাঝেই কীভাবে এই চুক্তি সম্পন্ন করল, এমন প্রশ্নের জবাবে নৌ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, “ফ্যাসিস্ট আমলে এই উদ্যোগ বন্দর কর্তৃপক্ষ নিয়েছে। তারা এটি সম্পন্ন করতে পারেনি। কারণ ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে নিজেদের বার্গেনিং করে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।”
“কিন্তু যেসব জায়গায় বার্গেনিং করে আমাদের স্বার্থ প্রতিষ্ঠিত করা দরকার, সে ব্যাপারে আমরা এই ছয় মাস কাজ করে কনক্লুশন করতে পেরেছি। এটা এই নির্বাচিত সরকারের অর্জন।”
শ্রমিকদের আপত্তি কেন
বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের একাংশ সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন। এমনকি, এ চুক্তির বিরোধিতা করে বৃহস্পতিবারও ইনভেস্ট বাংলাদেশ অডিটোরিয়ামের সামনে অবস্থান নিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন।
গত কয়েক মাস ধরেই শ্রমিক কর্মচারীরা বিদেশি কোম্পানির কাছে দায়িত্ব দেয়ার বিপক্ষে অনশন, বিক্ষোভ, মিছিলসহ নানা কর্মসূচি পালন করছেন। তাদের বক্তব্য, দেশের আমদানি-রপ্তানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই টার্মিনাল দেশীয় ব্যবস্থাপনাতেই পরিচালিত হওয়া উচিত।
চুক্তি স্বাক্ষরের আগে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বিবিসি বাংলাকে বলেন, “আমরা নির্দিষ্ট ট্যারিফের ওপর চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনা করি। কিন্তু বিদেশিদের দিলে তাদেরকে কমিশন দিতে হবে। এভাবে চলে গেলে আমার দেশ ডলারে স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকবে না।”
তিনি মনে করেন, “চট্টগ্রাম বন্দর সেমি-অটোমেটেড বন্দর। এটিকে আধুনিকায়ন করার কোনো সুযোগ নেই। তাহলে কেন আমরা বিদেশিদেরকে দিচ্ছি? চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আমরাই তো দক্ষ করতে পারি। আর চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন বিদেশীদের হাতে তুলে দিচ্ছে? পায়রা বা মোংলা বন্দরে ডেভেলপ করার সুযোগ রয়েছে। সেগুলোকে না দিয়ে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বন্দরকে কেন বিদেশিদেরকে দিচ্ছে?”
যদিও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ-এর সাবেক সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. জাফর আলম মনে করছেন, বিদেশি কোম্পানির হাতে দায়িত্ব যাওয়ায় টার্মিনালের সক্ষমতা অবশ্যই বাড়বে।
“কিন্তু মূল সমস্যা হলো, ৭০ শতাংশ কনটেইনার ঢাকাগামী এবং এগুলোর জন্য ল্যান্ড করিডোর নেই। রেলওয়েতেও খুব একটা জায়গা পায় না। জাহাজ থেকে কনটেইনার নামানোর পারফরম্যান্সও কম। এই ধরনের সমস্যাগুলো সমাধান হলে নিঃসন্দেহে সুবিধা পাবো আমরা,” যোগ করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, “বন্দরে কনটেইনার চারদিন বিনামূল্যে থাকে এবং এরপর স্টোর রেন্ট দিতে হয় বন্দরকে। স্টোর রেন্টের লাভ কাম্য হতে পারে না। দেখতে হবে অপারেশনাল লাভ কীরকম হচ্ছে।”
তবে এখন কেউ যাতে চাকরি না হারায়, সেটিও বিবেচনা করা উচিত বলে মত তার।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।
যদিও নৌ পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জোর দিয়ে বলেছেন, “এই চুক্তির সাথে চাকরি যাওয়া বা শ্রমিকদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং, ডিপি ওয়ার্ল্ড যখন এটিকে ঢেলে সাজাবে এবং যে বিদেশি বিনিয়োগ এখানে আসবে, তখন এখানে চাকরির সুযোগ বাড়বে ও কর্মীদের দক্ষতা বাড়ার সম্ভাবনা আছে।”
আর, শ্রমিকদের বিরোধিতা প্রসঙ্গে তার অভিমত, যেকোনো পরিবর্তনের সময় কিছু মানুষের মাঝে শঙ্কা থাকে। কারও চাকরি হারানোর ভয় থাকে। কারও কারও সংগঠনের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ বা কর্তৃত্ব আছে এবং তারা মনে করছেন যে তাদের স্বাধীনতা চলে যাবে। কিন্তু সবকিছু বিবেচনা করে সরকার এই চুক্তি করেছে।
-বিবিসি বাংলা।