মিয়ানমারে সংঘাত-দুর্যোগে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যে ৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষ

মিয়ানমারে সংঘাত-দুর্যোগে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যে ৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষ

মিয়ানমারে সংঘাত-দুর্যোগে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যে ৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষ
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

মিয়ানমারে বছরের পর বছর ধরে চলা সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং জলবায়ুজনিত অভিঘাতের কারণে দেশটির কোটি কোটি মানুষের বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও জীবিকার ব্যবস্থা একসঙ্গে ভেঙে পড়েছে। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এ তথ্য জানিয়েছে।

সংস্থাটি জানিয়েছে, মিয়ানমারের প্রতি তিনজনের মধ্যে দুজনেরও বেশি মানুষ এখন ‘বহুমাত্রিক দারিদ্র্যে’ ভুগছেন অথবা এতে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। দেশটির ৩ কোটি ৭০ লাখের বেশি মানুষ (মোট জনসংখ্যার ৬৮ শতাংশ) পরস্পর-সম্পর্কিত একাধিক সংকটে আক্রান্ত।

ইউএনডিপির এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক কান্নি উইগনারাজা বলেন, ‘মিয়ানমার হয়তো আর আন্তর্জাতিক সংবাদ শিরোনামে আগের মতো নেই, কিন্তু দেশটির লাখো মানুষের দুর্ভোগ ক্রমেই গভীর হচ্ছে।’

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর থেকেই গৃহযুদ্ধে জর্জরিত মিয়ানমার। একই সঙ্গে দেশটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং ২০২৫ সালের মার্চের ভয়াবহ ভূমিকম্পের অতিরিক্ত অভিঘাত মোকাবিলা করছে।

উইগনারাজা বলেন,‘মিয়ানমারে আমরা এমন এক গভীর দারিদ্র্য দেখতে পাচ্ছি, যা মানুষের উন্নয়নকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এটি এমন এক যুদ্ধ, যেখানে কারও জয় নেই। সবাই হারছে। দেশের মূল সক্ষমতাগুলো পরিকল্পিতভাবে ক্ষয় করা হচ্ছে।’

‘Layers of Deprivation: Multidimensional Poverty in Myanmar’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমার শুধু আয়সংকটের মুখে নেই; পরিবারগুলোকে সংকট মোকাবিলায় সহায়তা করা সঞ্চয়, স্থিতিশীল জীবিকা, বিভিন্ন সেবায় প্রবেশাধিকার এবং সামাজিক সহায়তার নেটওয়ার্কও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।

বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের ৮০ শতাংশের বেশি জুড়ে রয়েছে স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মানসংক্রান্ত ঘাটতি। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া, পর্যাপ্ত বাসস্থান, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও অন্যান্য মৌলিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সংকট। সংঘাতকবলিত এলাকাগুলোতে এসব সমস্যা সবচেয়ে প্রকট।

মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চলে দারিদ্র্যের চিত্রও ভিন্ন। কোথাও সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি ও সেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার দারিদ্র্যের প্রধান কারণ; আবার কোথাও দীর্ঘদিনের জীবিকা, শিক্ষা, অবকাঠামো ও সরকারি সেবার ঘাটতিই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের সবচেয়ে ভয়াবহ হটস্পটগুলোর একটি পশ্চিম মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। সেখানে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যে ভুগছেন এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ফোনের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের সীমাবদ্ধতার কারণে কিছু রাষ্ট্রহীন ও বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর বঞ্চনার প্রকৃত চিত্র প্রতিবেদনে কম প্রতিফলিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে কয়েক দশক ধরে সামরিক বাহিনীর জাতিগত নিপীড়নের শিকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। ২০১৭ সালে তৎকালীন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার জেইদ রা’দ আল হুসেইন মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিপীড়নকে ‘পাঠ্যবইয়ে থাকা জাতিগত নির্মূলের উদাহরণ’হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

ইউএনডিপি-এর প্রকাশিত প্রতিবেদনটি দারিদ্র্যকে শুধু গ্রামীণ সমস্যা হিসেবে দেখার ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করেছে। সংঘাতকবলিত অনেক রাজ্যের তুলনায় ইয়াঙ্গুন অঞ্চলে দারিদ্র্যের হার কম হলেও সেখানেই বহুমাত্রিক দারিদ্র্যে আক্রান্ত মানুষের বড় একটি অংশের বসবাস। শহর ও শহরতলির পরিবারগুলোর বাড়তে থাকা ঝুঁকিই এর প্রতিফলন।

জলবায়ু ও অর্থনৈতিক অভিঘাত

প্রতিবেদনটি এমন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে যখন মিয়ানমারের প্রায় প্রতি পাঁচটি পরিবারের একটি বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা ও ভূমিধসের মতো জলবায়ুজনিত ঝুঁকিতে রয়েছে। আসন্ন এল নিনো আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে এসব দুর্যোগ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টের শেষ নাগাদ দেশটিতে বন্যায় প্রায় ৬ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এর পাশাপাশি উপসাগরীয় সংকটের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং খাদ্যের দাম বাড়ার মতো বাহ্যিক ‘অর্থনৈতিক অভিঘাত’ও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।

দেশ ছাড়ছেন তরুণরা

সংঘাত, নিরাপত্তাহীনতা এবং গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মধ্যে বেড়ে ওঠা তরুণদের পরিস্থিতিও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হওয়ায় অনেক তরুণের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, চলাচল এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে সম্ভাবনা সীমিত হয়ে পড়ছে বলে সতর্ক করেছে ইউএনডিপি।

সংস্থাটির হিসাবে, ২০২১ সাল থেকে অন্তত ১০ লাখ তরুণ মিয়ানমার ছেড়ে চলে যেতে পারেন। সাম্প্রতিক ইতিহাসে এটি দেশটির মানবসম্পদের অন্যতম বড় ক্ষয় হিসেবে উল্লেখ করেছে ইউএনডিপি। বিশেষ করে এমন সময়ে এই মানবসম্পদ হারাচ্ছে দেশটি যখন এর জনসংখ্যা ক্রমেই বয়স্ক হয়ে উঠছে।

এদিকে, দৈনিক বা অনিয়মিত শ্রমের ওপর নির্ভরশীল প্রায় অর্ধেক পরিবার বহুমাত্রিক দারিদ্র্যে রয়েছে। এসব পরিবার, অভিবাসী এবং সংঘাতকবলিত এলাকার মানুষই সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্যের মুখে পড়ছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় মানসম্মত জীবিকা, শিক্ষা ও মৌলিক সেবায় আরও বেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

উইগনারাজা বলেন, ‘মিয়ানমারের সামনে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি শুধু আজকের দিনে দারিদ্র্য আরও গভীর হওয়া নয়; বরং আগামী দিনের সুযোগগুলো ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসা।’

তিনি বলেন, ‘সংঘাত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সামাজিক পুনরুদ্ধারের অপেক্ষা করা যায় না। জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, স্থানীয় বাজার এবং মৌলিক সেবায় বিনিয়োগ অব্যাহত রাখা জরুরি। কারণ দেশটির ঘুরে দাঁড়ানো ও সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য যে মৌলিক মানবিক সক্ষমতা প্রয়োজন, তা ধরে রাখতে হবে।’

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *