সীমান্তে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার, ৫ দিনে উদ্ধার ২০ লাখ ইয়াবা; পাচারের কৌশল বদলেছে চক্রগুলো
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তে মাদক পাচার ও বিস্তারের উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। সীমান্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়লেও ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ বা আইস পাচার থামছে না। বরং নজরদারি এড়াতে কৌশল বদলে ছোট নৌকা, জেলেদের ছদ্মবেশ এবং পাহাড়ি ছড়া ও দুর্গম জঙ্গলের পথ ব্যবহার করছে পাচারকারীরা। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ দিনে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), কোস্টগার্ড, পুলিশ ও স্পেশাল ফোর্স এসআরবির পৃথক অভিযানে প্রায় ২০ লাখ ইয়াবা জব্দ এবং আটজন মাদক কারবারি আটক হয়েছেন। তবে এই বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধারের পরও সীমান্ত দিয়ে পাচারের পুরো চিত্র কতটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, উখিয়া ও টেকনাফের ১১টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা, রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং শহরকেন্দ্রিক জনপদে ইয়াবা ও আইসের অবৈধ বেচাকেনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। গ্রাম থেকে শহর—বিভিন্ন এলাকায় মাদকের বিস্তার স্থানীয় সামাজিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের পরও মাদক সরবরাহের নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকায় শুধু চালান জব্দ ও বাহক আটকের মাধ্যমে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান কঠিন হয়ে পড়ছে।
সীমান্তের মাদক পাচার নিয়ে আলোচনায় উঠে এসেছে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) নাম। বিভিন্ন নিরাপত্তা বিশ্লেষণ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তথ্যের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, রাখাইন রাজ্য এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের কিছু মাদক পাচারপথে গোষ্ঠীটির প্রভাব রয়েছে। তবে মাদক সাম্রাজ্যের প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে আরাকান আর্মির ভূমিকা, পাচারপথে তাদের নিয়ন্ত্রণের বিস্তার এবং অর্থ আদায়ের ধরন সম্পর্কে যেসব দাবি প্রচারিত হচ্ছে, সেগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বা আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের বিস্তারিত এখানে পাওয়া যায়নি।
মিয়ানমারের শান রাজ্য দীর্ঘদিন ধরে সিনথেটিক মাদক উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। সেখান থেকে উৎপাদিত ইয়াবা ও আইস বিভিন্ন পাচারপথে রাখাইন রাজ্য হয়ে বাংলাদেশসহ আশপাশের দেশগুলোতে প্রবেশ করে বলে বিভিন্ন সময়ে মাদকবিরোধী কার্যক্রম ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। নাফ নদী ও কক্সবাজারের সীমান্তসংলগ্ন রাখাইন অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান এ পথে পাচারের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকায় আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব থাকায় সীমান্তের অপর পাশে মাদক পাচার প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
মাদক পাচার থেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অর্থ সংগ্রহের বিষয়টিও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের উদ্বেগের একটি দিক। অভিযোগ রয়েছে, পাচারকারীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী নিজেদের সামরিক কার্যক্রম ও প্রশাসনিক কাঠামোর ব্যয় নির্বাহ করে। প্রতি লাখ ইয়াবা পাচারের বিপরীতে আরাকান আর্মি দুই থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করে বলে কিছু সূত্রের দাবি। তবে এই অর্থের পরিমাণ ও আদায়ের পদ্ধতি সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে মিয়ানমারের মাদক উৎপাদক গোষ্ঠী, বিশেষ করে ওয়াশাসিত অঞ্চলের অপরাধী নেটওয়ার্ক থেকে মাদক এনে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী পাচারকারীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে আরাকান আর্মির ভূমিকা কতটা বিস্তৃত, তা নিশ্চিত করতে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।
উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোকে ঘিরেও মাদক পাচারের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ক্যাম্পের ভেতরে সক্রিয় কিছু অপরাধী চক্র সীমান্ত থেকে মাদক সংগ্রহ, সাময়িকভাবে গোপন স্থানে মজুত এবং পরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহের কাজে যুক্ত। অভিযোগ রয়েছে, এসব চক্রের সঙ্গে সীমান্তের ওপারের পাচারকারীদের যোগাযোগ রয়েছে এবং নাফ নদী পার করে আনা মাদকের একটি অংশ ক্যাম্পকেন্দ্রিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে। তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা প্রমাণ ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে ক্যাম্প ও সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি, তথ্য যাচাই এবং আইনানুগ তদন্ত জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়ায় পাচারকারীরা পরিবহন ও সরবরাহের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। আগে বড় ট্রলারে করে মাদকের চালান আনার প্রবণতা থাকলেও এখন ছোট নৌকা, জেলেদের ছদ্মবেশ এবং পাহাড়ি ছড়া ও দুর্গম জঙ্গলের পায়ে চলা পথ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। দিনের তুলনায় গভীর রাত ও ভোরের দিকে পাচারের চেষ্টা বাড়ানোর কথাও বলছেন সংশ্লিষ্টরা। ইয়াবার পাশাপাশি আইস পাচারের প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। তুলনামূলক কম জায়গায় বেশি মূল্যমানের মাদক বহন করা সম্ভব হওয়ায় পাচারকারীদের কাছে আইস আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা।
বিজিবি, কোস্টগার্ড ও পুলিশ সীমান্তে নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে। এসব অভিযানে ইয়াবা, আইস ও অন্যান্য অবৈধ সামগ্রী উদ্ধারের পাশাপাশি সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আটক করা হচ্ছে। কিন্তু মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান সংঘাত, সীমান্তের দুর্গম ভূপ্রকৃতি এবং একাধিক পথে পাচারের সুযোগ থাকায় সরবরাহব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া কঠিন হচ্ছে। শুধু বাহক আটক বা চালান জব্দের বদলে মাদক সরবরাহের অর্থায়ন, মূল হোতা, পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং দেশের ভেতরের বিতরণব্যবস্থা শনাক্ত করাও তাই গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতা সীমান্তের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এ পরিস্থিতিতে মাদক পাচারের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হলে তা বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে মাদকের বিস্তার, অপরাধী চক্রের আর্থিক শক্তি বৃদ্ধি এবং সীমান্ত এলাকায় অবৈধ অর্থনীতির বিস্তার রোধে সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি।
সচেতন মহলের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি ও কোস্টগার্ডের অভিযান আরও কার্যকর করার পাশাপাশি সীমান্তে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং মাদক পাচারের আর্থিক লেনদেন অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে মিয়ানমার সীমান্তের ওপারে সক্রিয় পাচারকারী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, দেশের অভ্যন্তরে মাদক সরবরাহকারীদের শনাক্ত এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে অপরাধী চক্রের তৎপরতা প্রতিরোধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বয় ও সহযোগিতাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গত পাঁচ দিনে প্রায় ২০ লাখ ইয়াবা উদ্ধারের তথ্য সীমান্তে মাদক পাচারের ব্যাপকতা সম্পর্কে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। তবে উদ্ধার করা চালানের পরিমাণ দিয়ে মোট পাচারের কত অংশ ধরা পড়ছে, তা নির্ভরযোগ্য উপাত্ত ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি পাচারের মূল উৎস, অর্থের জোগানদাতা, সীমান্তের দুই পাশের যোগাযোগব্যবস্থা এবং দেশের ভেতরের বিতরণ নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে এ অবৈধ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি সম্ভব। উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তকে মাদক পাচারের নিরাপদ করিডোরে পরিণত হতে না দিতে এখন প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক তদন্ত, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত তৎপরতা।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।