ভারতে বিক্ষোভ দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ, উদ্বিগ্ন জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
ভারতে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে চলা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দমনে পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, নির্বিচার আটক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা। তারা অবিলম্বে বলপ্রয়োগ বন্ধ, সমাবেশে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) জেনেভা থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বিশেষজ্ঞরা বলেন, গত তিন মাসে নয়াদিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে তরুণদের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে পুলিশের কঠোর পদক্ষেপ উদ্বেগজনক। শান্তিপূর্ণ সমাবেশে অযৌক্তিক বিধিনিষেধ, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, নির্বিচারে আটক, গুম এবং শিক্ষার্থী অধিকারকর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়ে ভারত সরকারকে আগেও সতর্ক করা হয়েছে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলেন, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার সম্মান করা, সুরক্ষা দেওয়া এবং তা নিশ্চিত করা ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
বিবৃতিতে বলা হয়, গত কয়েক মাসে ভারতের বিভিন্ন স্থানে লাখো শিক্ষার্থী ও তাদের সমর্থকেরা সরকারের শিক্ষা ব্যবস্থাসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করেছেন।
সম্প্রতি ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এ প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের মধ্যে মুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং তফসিলি জাতি ও উপজাতিভুক্ত মানুষ রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিপেটাসহ বিভিন্নভাবে বলপ্রয়োগ করেছে।
একই সঙ্গে হাজারো মানুষকে বিক্ষোভে যোগ দিতে বাধা দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে সাত হাজারের বেশি তরুণ, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও রাজনৈতিক দলের সদস্যকে নির্বিচারে আটক করে দূরবর্তী আটককেন্দ্রে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের মুঠোফোন জব্দ করা এবং বিক্ষোভ-সংশ্লিষ্ট তথ্য মুছে ফেলার অভিযোগও রয়েছে। বিক্ষোভের নেতাদেরসহ অধিকাংশ আটক ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টা পর ছেড়ে দেওয়া হয়।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের অনেকে আহত হয়েছেন এবং কেউ কেউ আটকের সময় দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিক্ষোভ ও সংশ্লিষ্ট আটকপ্রক্রিয়ায় যৌন সহিংসতা এবং অন্যান্য ধরনের লিঙ্গভিত্তিক নির্যাতনের অভিযোগ নিয়েও তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
চলতি বছরের মার্চে নয়াদিল্লিতে ১০ জন শিক্ষার্থী ও শ্রমিক অধিকারকর্মীকে সাদাপোশাকের পুলিশ আটক করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি। এ সময় তাদের ওপর দুর্ব্যবহার, হুমকি ও চাপ প্রয়োগ এবং জোর করে বক্তব্য আদায়ের অভিযোগও ওঠে। পরে হেবিয়াস করপাস-সংক্রান্ত আইনি পদক্ষেপের পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
ভারতের ফৌজদারি কার্যবিধির সমতুল্য ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা প্রয়োগ করে জনসমাবেশে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা, গণপরিবহন চলাচল বন্ধ এবং ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, এসব পদক্ষেপ শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অধিকার এবং মানবাধিকার রক্ষার অধিকারের মতো মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। শান্তিপূর্ণ সমাবেশে যেকোনো বিধিনিষেধ অবশ্যই আইনের ভিত্তিতে আরোপ করতে হবে এবং তা বৈধ উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক হতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ অবিলম্বে বন্ধ, ব্যাপক সমাবেশ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বায়োমেট্রিক তথ্যসহ ডিজিটাল নজরদারির অপব্যবহার ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
এ ছাড়া বিক্ষোভ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তাদের সহযোগী বাহিনীগুলোর ভূমিকা তদন্তে দ্রুত স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরুর দাবি জানিয়েছেন তারা। দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার ও যথাযথ প্রতিকার দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিবৃতিতে তারা বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সরকারকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষার্থীসহ সব নাগরিকের শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়া এবং নিজেদের অভিযোগ ও দাবি প্রকাশ করার গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করাও জরুরি।
জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ নিযুক্ত স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন মানবাধিকার বিষয় নিয়ে কাজ করেন। তাদের দেওয়া মতামত তাদের নিজস্ব। এসব মতামত জাতিসংঘ বা সংস্থাটির মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের আনুষ্ঠানিক অবস্থানকে সব সময় তুলে ধরে না।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।