রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ শুরু, ভাসানচর থেকে ফিরে রোহিঙ্গা নেতাদের ভিন্নমত - Southeast Asia Journal

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ শুরু, ভাসানচর থেকে ফিরে রোহিঙ্গা নেতাদের ভিন্নমত

“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

২০১৭ সালের আগষ্টে দেশটির আরাকান রাজ্যে একটি পুলিশ পোস্টে হামলার অভিযোগে দেশটির সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে কক্সবাজারে আশ্রয় নেয় প্রায় সাড়ে ৭লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। এর আগেও মিয়ানমার থেকে বিভিন্ন সময়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিশাল এই জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধ দমন ও রোহিঙ্গাদের এক স্থানে সীমাবদ্ধ রাখতে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ শুরু করেছে সেনাবাহিনী। গত ৮ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার দুপুরে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে এ কার্যক্রম শুরু করতে দেখা গেছে সেনাবাহিনীকে।

কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে গিয়ে দেখা গেছে, ক্যাম্পের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ শুরু করে সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনী জানিয়েছে পর্যায়ক্রমে সবগুলো ক্যাম্পের চারপাশেই এসব কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হবে। সেনা সূত্র বলছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খুন, অপহরণ, মাদক ও মানবপাচারের ঘটনা অনেক পুরনো। এসব ঘটনা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছিল। এখন ক্যাম্পে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শুরু করেছে। এটা স্থানীয়দের মতো রোহিঙ্গাদের জন্যও ভালো হবে। এটা সবার জন্য নিরাপদ হবে।

রোহিঙ্গা মোহাম্মদ ফারুক আহমদ (৬৭) বলেন, ‘ক্যাম্পের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করায় নিরাপত্তা জোরদার হবে। ক্যাম্পে কিছু খারাপ লোক ঢুকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করছে। কাঁটাতারের বেড়া দিলে আগের মতো লোকজন চলাচল করতে পারবে না। এই উদ্যোগ আরও আগে নেওয়া প্রয়োজন ছিল। এজন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানাই।’ তিনি বলেন, ‘কিছু অসৎ মানুষ রয়েছে, তারা এই কাঁটাতারের বেড়া হওয়ায় নাখোশ। কেননা, তারা বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। এই বেড়া বসলে হয়তো আগের মতো তারা কাজ করতে পারবে না। তবে বেশিরভাগ রোহিঙ্গা এই কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে খুশি হয়েছে।’

অন্যদিকে নোয়াখালীর হাতিয়ার ভাসানচর বসবাসের উপযোগী কিনা, তা দেখে মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাতে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে পৌঁছে সুর পাল্টে তাদের কণ্ঠে অন্য সুর শোনা গেছে। এসব নেতা ভাসানচরে অবস্থানকালে সেখানকার অবকাঠামো নিয়ে প্রশংসা করলেও ক্যাম্পে ফেরার পর তারা বলছেন, ভাসানচর ভালো লেগেছে। তবে দীর্ঘ বসবাসের উপযোগী কিনা বিষয়টি ভেবে দেখতে হবে।

জানা গেছে, সরকার ঘিঞ্জি শরণার্থী শিবির থেকে কমপক্ষে এক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় জেগে ওঠা ওই দ্বীপে পাঠানোর অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ নেয়। এরই অংশ হিসেবে সেনাবাহিনীর মধ্যস্থতায় (৫ সেপ্টেম্বর) গত শনিবার টেকনাফ থেকে ভাসানচরে যান রোহিঙ্গাদের ৪০ জন প্রতিনিধি। তাদের জন্য বাংলাদেশ সরকার ভাসানচরে কী ধরনের ব্যবস্থা রেখেছে তা বর্ণনা করা হয়। এরপর তাদের (রবিবার ও সোমবার) দুই দিন পুরো আবাসন প্রকল্পের অবকাঠামো ঘুরিয়ে দেখানো হয়েছে। এ সময় তাদের সঙ্গে নৌবাহিনী, পুলিশসহ আরআরআরসি কার্যালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানকার খাদ্য গুদাম, থাকার ঘর, আশ্রয় সেন্টার, মসজিদ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্কুল, খেলার মাঠ ও কবরস্থানসহ মাছ চাষের পুকুর পরিদর্শন করেন রোহিঙ্গা নেতারা। এছাড়া সেখানে বিভিন্ন প্রকারের সবজির বাগান এবং সাগরের তীরে কেওড়া বাগান দেখে তারা মুগ্ধ হয়েছিলেন। ফেরার আগের দিন (সোমবার) সন্ধ্যায় তাদের ব্রিফিং করা হয়। যাতে ভাসানচরে যা যা দেখছেন তা যেন সঠিকভাবে ক্যাম্পে ফিরে অন্যদের জানাতে পারেন।

ভাসানচর দেখে মঙ্গলবার রাত ৭টার দিকে উখিয়া কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে পৌঁছান নারী নেত্রী জামালিদা বেগম। তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে লোকজন জানতে চেয়েছে ভাসানচর দেখতে কেমন? জবাবে ভাসানচরের অবকাঠামো এবং সুন্দর পরিবেশ সম্পর্কে তাদের জানিয়েছি। তবে তারা বারবার বিষয়টি পরিষ্কার করে জানতে চেয়েছিল। আমরা যা দেখেছি তা বলেছি। সেখানে শনিবারে পৌঁছালেও রবিবার ও সোমবার ঘুরে দেখেছি। একপর্যায়ে সেখানে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। এ সময় বেশিরভাগ রোহিঙ্গা নারী কান্নাকাটি করেছেন। তারা স্বজনদের জন্য কান্নাকাটি করছিল। সরকারের কাছে আমার দাবি থাকবে, সেখানে থাকা রোহিঙ্গাদের স্বজনদেরও যেন সেখানে পাঠানো হয়। মাত্র আমরা ক্যাম্পে পৌঁছেছি। বুধবার সকাল থেকে ভাসানচরের বিষয়ে ক্যাম্পে গুরুত্ব সহকারে প্রচারণা চালানো হবে।’

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভাসানচর ফেরা এক রোহিঙ্গা নেতা বলেন, ‘কক্সবাজারের ঘিঞ্জি শিবির ও পাহাড়ের পাদদেশে বসতির চেয়ে ভাসানচর উন্নত হবে, সেটি বলা মুশকিল। হয়তো বা এখানকার ঝুপড়ি ঘরের চেয়ে সেখানে গড়ে ওঠা থাকার ঘরসহ অন্যান্য অবকাঠামোগুলো মজবুত ও সুন্দর। সেই হিসাবে যদি বলি, ভাসানচর অনেক ভালো লেগেছে। তবে দীর্ঘ বসবাসের উপযোগী কিনা, বিষয়টি ভেবে দেখতে হবে। তাছাড়া সাগরের মাঝখানে জেগে ওঠা ভাসানচরে পৌঁছাতে দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয়।’

তবে এর আগে, পরিদর্শনে যাওয়া রোহিঙ্গা নেতারা ভাসানচর থেকে বলেছিলেন, ‘অবকাঠামো এবং সুন্দর পরিবেশ বিষয়ে ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের জানানো হবে। আমাদের চেষ্টা থাকবে, অন্তত প্রতিটি ক্যাম্প থেকে যেন স্বেচ্ছায় কিছু পরিবার ভাসানচরে যেতে রাজি হয়।’

অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ সামসুদ্দৌজা নয়ন বলেন, ‘ভাসানচর থেকে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধি দল ফিরে এসেছে। তারা নিজ নিজ ক্যাম্পে পৌঁছে ভাসানচরে যা দেখেছেন সেটি রোহিঙ্গাদের মধ্যে তুলে ধরবেন। ভাসানচর প্রতিনিধি দলের ভালো লেগেছে। আমাদের বিশ্বাস ভাসানচরে যেতে রাজি করাতে ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের তারা বোঝাতে সক্ষম হবে।’

প্রসঙ্গত, রোহিঙ্গা স্থানান্তরের জন্য নিজস্ব তহবিল থেকে দুই হাজার ৩১২ কোটি টাকা ব্যয়ে ভাসানচরে আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে সরকার। জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাস থেকে সেখানকার ৪০ বর্গকিলোমিটার এলাকা রক্ষা করতে ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ এবং এক লাখ রোহিঙ্গা বসবাসের উপযোগী ১২০টি গুচ্ছগ্রামের অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের এক সভায় ভাসানচরের জন্য নেওয়া প্রকল্পের খরচ ৭৮৩ কোটি টাকা বাড়িয়ে তিন হাজার ৯৫ কোটি টাকা করা হয়। বাড়তি টাকা বাঁধের উচ্চতা ১০ ফুট থেকে বাড়িয়ে ১৯ ফুট করা, অন্যান্য সুবিধা বৃদ্ধিসহ জাতিসংঘের প্রতিনিধিদের জন্য ভবন ও জেটি নির্মাণে খরচ হবে বলে জানা গেছে।