সিবিআই’র চার্জশিট: গরু পাচারে যুক্ত বিএসএফ, পায় বখরাও - Southeast Asia Journal

সিবিআই’র চার্জশিট: গরু পাচারে যুক্ত বিএসএফ, পায় বখরাও

“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

ভারত থেকে বাংলাদেশে গরু পাচারের ক্ষেত্রে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ যে সক্রিয়ভাবে যুক্ত এবং এই বাহিনীর সদস্য ও কর্মকর্তারা পাচারের বখরা বা ভাগ পেয়ে থাকেন–ভারত সরকারেরই সর্বোচ্চ তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই’র চার্জশিটে সে কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হলো।

গত শনিবার (৮ অক্টোবর) পশ্চিমবঙ্গের আসানসোল আদালতে গরু পাচারে অভিযুক্ত তৃণমূল নেতা অনুব্রত মণ্ডলের বিরুদ্ধে সিবিআই যে চার্জশিট জমা দিয়েছে, তাতেই বিএসএফের এই ভূমিকার কথা বর্ণনা করা হয়েছে।

ভারত সরকারেরই একটি সংস্থা যেখানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন বিএসএফের বিরুদ্ধে এ ধরনের বক্তব্য পেশ করছে, তা বিএসএফকে যথারীতি প্রবল অস্বস্তিতে ফেলেছে।

বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের হাতে যেসব হত্যার ঘটনা ঘটে থাকে, তার সাফাই দিতে গিয়ে বিএসএফ সবসময়ই বলে থাকে, পাচার রুখতে গিয়ে চোরাকারবারিদের হাতে আক্রান্ত হলে তাদের জওয়ানরা বাধ্য হয়ে আত্মরক্ষার্থে গুলি চালায়। কিন্তু সিবিআইয়ের সর্বশেষ চার্জশিট এটাই প্রমাণ করে দিচ্ছে, বিএসএফ পাচার রোখার চেয়ে স্মাগলিংয়ের বখরা পেতেই অনেক বেশি উৎসাহী!

বস্তুত ২০২০ সালের নভেম্বরে পশ্চিমবঙ্গে মোতায়েন বিএসএফ কমান্ড্যান্ট সতীশ কুমার যখন গরু পাচারে যুক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিলেন, তখন থেকেই এটা স্পষ্ট যে বাহিনীর কর্মকর্তাদের একাংশের সঙ্গে চোরাকারবারিদের যোগাযোগ ছিল।

কিন্তু তখন বিএসএফের পক্ষ থেকে সেটাকে একটা ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলেই দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু সেই গ্রেফতারের দু’বছরের মাথায় সিবিআইয়ের চার্জশিটই ফাঁস করে দিলো যে বিএসএফের ভেতরে স্মাগলারদের সঙ্গে যোগসাজশ কার্যত ‘প্রাতিষ্ঠানিক রূপ’ নিয়েছে।

আসানসোল আদালতে পেশ করা ওই চার্জশিটের একটি প্রতিলিপি গণমাধ্যমের হাতেও এসেছে। বিএসএফের বিরুদ্ধে সেখানে যে নির্দিষ্ট অভিযোগগুলো আনা হয়েছে তা এরকম—

১) মুর্শিদাবাদ জেলার ব্যবসায়ী এনামুল হককে এই গরু পাচারের ‘কিংপিন’ বা মূলহোতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিবিআই– যার সঙ্গে বিএসএফ কর্মকর্তাদের খুবই ঘনিষ্ঠতা ছিল। এনামুল হকের আনা গরুবোঝাই ট্রাক যখন সীমান্তে পৌঁছাতো, তখন বিএসএফ টানা কয়েক ঘণ্টার জন্য সাগরিদিঘি সীমান্ত পুরোপুরি খুলে দিতো। সে সময় অবাধে গরু অন্য পারে পাঠানো হতো, বিএসএফ জওয়ানরা চোখ বুজে থাকতেন।

২) প্রতিটি পাচার হওয়া গরুর জন্য বিএসএফ অন্তত ২০০০ টাকা করে ও শুল্ক বিভাগ ৫০০ টাকা করে পেতো। বাংলাদেশ থেকে বিএসএফ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এই অর্থ পাঠানো হতো হাওয়ালার মাধ্যমে– যার ব্যবস্থা করতেন এনামুল হকের ঘনিষ্ঠ মনোজ সানা নামে এক ব্যক্তি। তার ডায়েরি থেকে এসব লেনদেনের বিস্তারিত হিসাব পাওয়া গেছে। হাওয়ালার টাকার ভাগ পেতেন স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিকরাও।

৩) এনামুল হকের সঙ্গে বিএসএফ কর্মকর্তাদের এতটাই দহরম-মহরম ছিল যে একজন সিনিয়র কমান্ড্যান্টের ছেলেকে তিনি নিজের কোম্পানিতে মাসিক প্রায় চল্লিশ হাজার টাকার বেতনে চাকরিও দিয়েছিলেন।

৪) বিএসএফ কি তাহলে সীমান্তে কোনও গরুই আটকাতো না? হ্যাঁ, অবশ্যই আটকাতো– পাচারকারীদের সঙ্গে আর্থিক বনিবনা না হলেই আটকাতো। কিন্তু সেখানেও ছিল জালিয়াতি। কারণ, আটক করা গরুগুলো পশুর হাটে নিলামের জন্য পাঠানোর কথা। আর বিএসএফ সেখানেও বড় সাইজের গরুগুলোকে ‘বাছুর’ হিসেবে দেখিয়ে পাঠাতো, যাতে এনামুল হকের মতো তাদের ঘনিষ্ঠ স্মাগলাররা সেগুলো অনেক সস্তায় কিনে নিতে পারেন। যথারীতি সেই বাড়তি মুনাফার হিসসাও পৌঁছে যেতো বিএসএফের কাছে।

৫) আটক করা গরুগুলোর সব যেতো বীরভূম জেলার দুটো পশুহাটে, একটা ইলামবাজার জেলার সুখবাজারে আর দ্বিতীয়টা মুরারই ব্লকের হিয়াতনগরে। জেলার দাপুটে তৃণমূল নেতা অনুব্রত মণ্ডলের সুবাদে সেখানেও একচেটিয়া প্রাধান্য বিস্তার করেছিলেন মুর্শিদাবাদের এনামুল হক– তিনি বা তার লোকেরা একাই পশুহাটের প্রায় সব গরু কিনে নিতেন, আর সেটাও বাজার দরের চেয়ে অনেক সস্তায়। তারপর সেসব ‘এনামুল-মার্কা’ গরু আবার বিএসএফের বদান্যতায় অনায়াসে সীমান্ত পেরিয়ে পাচার হয়ে যেতো বাংলাদেশে।

বস্তুত সিবিআই চার্জশিটের ছত্রে ছত্রে গরু পাচারের র‍্যাকেটের সঙ্গে বিএসএফের যে ধরনের যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেনের কথা সামনে এসেছে, যা দিল্লিতেও অনেকের চোখ কপালে তুলেছে! আর যেহেতু কেন্দ্রীয় সরকারেরই সর্বোচ্চ তদন্তকারী সংস্থা এই চার্জশিট প্রস্তুত করেছে, ফলে এটি অস্বীকার করাও বিএসএফের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

এই চার্জশিটের বক্তব্য নিয়ে দিল্লিতে বিএসএফ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

তবে বাহিনীর একজন সিনিয়র পদাধিকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ‘মুর্শিদাবাদে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তটি যে একটি প্রবলেমেটিক এরিয়া (সমস্যাসংকুল অঞ্চল) তা আমরা জানি, সেগুলো অ্যাড্রেস করার জন্য ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। আর প্রতিটি বাহিনীতেই কিছু না কিছু ‘ব্ল্যাক শিপ’ থাকে, যারা পুরো ফোর্সের নাম ডোবায়, কিন্তু বিএসএফ এখন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং ধীরে ধীরে সীমান্তেও তার সুফল দেখতে পাওয়া যাবে বলে আমরা নিশ্চিত।’

ভারতে নরেন্দ্র মোদি সরকারের ঘোষিত নীতিই হলো, বাংলাদেশ সীমান্তে গরুর পাচার শূন্যে নামিয়ে আনা। সেখানে তাদের অধীন সিবিআইও যখন বলছে—দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীই সেই চোরাকারবারে সক্রিয়ভাবে যুক্ত, তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্যও বিষয়টি ‘ডিফেন্ড’ করা কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠছে।