বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ

বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ

বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে জালিয়াতি ও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি বিধি ও আইন অমান্য করে জনপ্রতি ৭ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে ৪ শিক্ষককে নিয়োগ দেয় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ ইউনুস। এ নিয়ে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

জানা গেছে, ২০০৪ সালে মাইসছড়িতে ওয়াদুদ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে বিদ্যালয়টি নাম পরিবর্তন করে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ উচ্চ বিদ্যালয় রাখা হয়। ২০২২ সালের ৫ জুলাই বিদ্যালয়টি এমপিও তালিকাভুক্ত হয়। ২০১৭ সাল থেকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ করে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যায়ন কর্তৃপক্ষ বা এনটিআরসিএ। এনটিআরসিএ যাতে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ দিতে না পারে সে কারণে জালিয়াতির মাধ্যমে ২০ বছর আগে অর্থাৎ ২০০৪ সালের ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ৪ শিক্ষককে নিয়োগ দেখান প্রধান শিক্ষক।

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরিপত্র অনুযায়ী একটি বিদ্যালয় এমপিও তালিকা ভুক্তির পূর্বে কর্মরত শিক্ষকদের নিয়োগ দিতে হবে। কিন্তু তা মানা হয়নি। অবৈধ নিয়োগকে বৈধ করার জন্য একটি জাতীয় পত্রিকার বিজ্ঞাপনও জাল করে প্রধান শিক্ষক।

জেলা প্রশাসক বরাবর দেওয়া লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা সময় থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত যুক্ত নয় এমন সাতজনকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৪ জন শিক্ষক অন্য এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন এবং বেতন-বোনাস ভোগ করেছেন। জালিয়াতির মাধ্যমে তাঁদের বিদ্যালয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়। জালিয়াতির সকল নথি আসে এই প্রতিবেদকের হাতে আসে।

জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ প্রাপ্ত শিক্ষকদের একজন আব্দুল মালেক। প্রাপ্ত নথিতে দেখা যায়, আব্দুল মালেক ২০১৩ সালের ১৮ আগস্ট রাঙামাটির লংগদু উপজেলার রাবেতা মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু তাঁকে ভুয়া নিয়োগপত্রের মাধ্যমে ২০০৪ সালের ১০ আগস্ট তারিখে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ উচ্চ বিদ্যালয় নিয়োগ দেখানো হয়েছে।

অথচ মাসিক পে অর্ডার (এমপিও) তালিকায় দেখা যায়, তিনি ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাবেতা মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে বেতন উত্তোলন করেন। এ ছাড়া জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুইটি প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন উত্তোলন করেন যা সম্পূর্ণ অবৈধ। নিজের ইনডেক্স নম্বর পরিবর্তন করার জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রে নম্বর বদলে ফেলেন আব্দুল মালেক।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল মালেক বলেন, ‘বিদ্যালয় এমপিওকরণের জন্য বিভিন্ন সময় প্রধান শিক্ষককে নগদ অর্থ দিয়েছি।’

জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া আরেক শিক্ষক সঞ্চায়ন চাকমা। ২০০৯ সালের ১ ডিসেম্বর মহালছড়ি আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে যোগ দেন। মাসিক পে অর্ডার (এমপিও) তালিকায় দেখা যায় তিনি ২০২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মহালছড়ি আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে বেতন উত্তোলন করেন। তাকেও ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ২০০৪ সালের ১০ আগস্ট তারিখে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ উচ্চ বিদ্যালয়ে বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেখানো হয়। জালিয়াতির মাধ্যমে দুইটি প্রতিষ্ঠান থেকেই ১৭ মাসে ৫ লাখ টাকার বেশি বেতন উত্তোলন করেন।

এ বিষয়ে সঞ্চায়ন চাকমা বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক অনুমতি দিয়েছে বলেই আমি বেতন উত্তোলন করেছি। উনি অনুমতি না দিলে সম্ভব ছিল না।’

অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত আরেক শিক্ষক হেলাল উদ্দিন ২০০৩ সালে ২২ অক্টোবর দীঘিনালার দাখিল মাদ্রাসায় যোগ দেন। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি ওই মাদ্রাসা থেকে বেতন উত্তোলন করেন। অথচ সেই হেলাল উদ্দিনকে ২০০৪ সালের ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগ দেখানো হয়। নিজের ইনডেক্স নম্বর পরিবর্তনের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রের কয়েকটি নম্বর পরিবর্তন করেন তিনি। তিনিও ২০২২ সালে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাস দুই প্রতিষ্ঠানটি থেকে বেতন উত্তোলন করেন।

অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইল হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমাকে কীভাবে নিয়োগ দিয়েছে আপনি সেটা প্রধান শিক্ষককে জিজ্ঞেস করেন।’

দুর্নীতির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক মো.ইব্রাহিম রবি। গুইমারা উপজেলার শহীদ লে. মুশফিক উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০২২ সালের ৩ আগস্ট সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অথচ তাঁকে ২০১৭ সালের ৪ জানুয়ারির ভুয়া বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগ দেখানো হয়।

এ ছাড়া বিদ্যালয়ে গ্রন্থগারিক কোনো পদ না থাকলেও মো. হযরত আলী নামে একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত মিজানুর রহমান, গিয়াস উদ্দিন ও ছাদিকুন নাহার বিদ্যালয় এমপিওভুক্তির আগে বিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন না।

এসব অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ ইউনুসের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে কল করা হয়। কল রিসিভ করে প্রথমে দাবি করেন জানান, তিনি বিধি মোতাবেক নিয়োগ দিয়েছেন। অন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের পুরোনো তারিখে (ব্যাক ডেটে) নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তড়িঘড়ি করে কল কেটে দেন। পরে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. সহিদুজ্জামান বলেন, ‘বিষয়টি আমরা শুনেছি। এরই মধ্যে তদন্তের জন্য জেলা শিক্ষা অফিসারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।