রুজভেল্ট হোটেল: নিউইয়র্কের কেন্দ্রে ১০০ কোটি ডলারের সম্পদ পাকিস্তানের হাতে এল কীভাবে?

রুজভেল্ট হোটেল: নিউইয়র্কের কেন্দ্রে ১০০ কোটি ডলারের সম্পদ পাকিস্তানের হাতে এল কীভাবে?

রুজভেল্ট হোটেল: নিউইয়র্কের কেন্দ্রে ১০০ কোটি ডলারের সম্পদ পাকিস্তানের হাতে এল কীভাবে?
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

নিউইয়র্কের ব্যস্ততম ম্যানহাটন এলাকা। রাজকীয় দালানকোঠা আর আধুনিকতার ভিড়ে আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষী এক স্থাপত্য, যার নাম ‘রুজভেল্ট হোটেল’। তবে এই ভবনটি কেবল একটি ইট-পাথরের কাঠামো নয়, বরং বিদেশের মাটিতে পাকিস্তানের সবচেয়ে দামি সম্পদ এবং আভিজাত্যের প্রতীক। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এই হোটেলটি নিয়ে আবারও বিশ্বজুড়ে শোরগোল শুরু হয়েছে। আর এর কারণ হলো, শতবর্ষী পুরোনো এই হোটেলটি নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে পাকিস্তান। এর পুনর্উন্নয়নের জন্য অংশীদার খুঁজছে তারা। আর এর জন্য মূল্য নির্ধারণ করেছে ১০০ কোটি ডলার বা ১ বিলিয়ন!

রুজভেল্ট হোটেল নিউইয়র্কের এমন এক জায়গায়, যাকে রিয়েল এস্টেটের ভাষায় ‘প্রাইম লোকেশন’ বলা হয়। গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল টার্মিনাল আর টাইমস স্কয়ারের একদম কাছে ম্যাডিসন অ্যাভিনিউয়ের কোণে এই হোটেলের অবস্থান। ৪৫ ইস্ট ৪৫ তম স্ট্রিট—গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল টার্মিনাল, ফিফথ অ্যাভিনিউ আর টাইমস স্কয়ারের মাঝখানে এমন অবস্থান নিউইয়র্কে হাতে গোনা।

১৯২৪ সালে যখন এটি চালু হয়, তখন এটি আধুনিক বিলাসিতার প্রতীক হয়ে ওঠে। বিউ-আর্টস ধাঁচের রুজভেল্ট হোটেলে ছিল এক হাজারেরও বেশি কামরা। ছিল বেবিদের ডেকেয়ার, এমনকি ইন-হাউস ডাক্তারও। সব মিলিয়ে সে সময়কার যেন বেশ বিস্ময়কর। তার চেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এটিই বিশ্বের প্রথম হোটেল যেখানে প্রতিটি ঘরে টেলিভিশনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

১৯৪০–এর দশকে হোটেল ব্যবসায়ী কনরাড হিলটনের অধীনে রুজভেল্ট হয়ে ওঠে হিলটন হোটেল করপোরেশনের ফ্ল্যাগশিপ সম্পত্তি। হিলটন নিজেও হোটেলের প্রেসিডেনশিয়াল স্যুইটে থাকতেন।

যেভাবে পাকিস্তানের হলো এই মার্কিন ল্যান্ডমার্ক

সত্তরের দশকে পাকিস্তান যখন আজকের মতো অর্থনৈতিক সংকটে ছিল না, তখন তারা এই সম্পদে হাত দেয়। ১৯৭৮ সালে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনস (পিআইএ) লিজের মাধ্যমে রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগকারী পল মিলস্টাইনের থেকে এর নিয়ন্ত্রণ নেয়। চুক্তিতে পরবর্তীতে একটি নির্দিষ্ট দামে সম্পত্তিটি কিনে নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল। এই চুক্তিতে অংশীদার হিসেবে ছিলেন সৌদি রাজপুত্র ফয়সাল বিন খালিদ বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ।

১৯৯৮ সালে পিআইএ মাত্র ৩ কোটি ৬৫ লাখ ডলারে হোটেলটি কিনে নেওয়ার সুযোগ কাজে লাগায়। এবং ২০০০ সালে দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে মাত্র ৩ কোটি ৬৫ লাখ ডলারে পূর্ণ মালিকানা পায়। ম্যানহাটনের মতো জায়গায় এমন একটি সম্পত্তি ওই দামে পাওয়া অনেকটা লটারি জেতার মতোই। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ২০০০ সালে পিআইএ হোটেলের পূর্ণ মালিকানা পায়।

তবে শুরুতে এই বিনিয়োগ লাভজনক ছিল না। হোটেলের বয়স বৃদ্ধি, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ এবং লোকসানের কারণে সংকট তৈরি হয়েছিল। তবে সংস্কারের পর আয় বাড়তে শুরু করে।

বিউ-আর্টস ধাঁচের রুজভেল্ট হোটেলে ছিল এক হাজারেরও বেশি কামরা। ছবি: রুজভেল্ট হোটেলের ওয়েবসাইট।
বিউ-আর্টস ধাঁচের রুজভেল্ট হোটেলে ছিল এক হাজারেরও বেশি কামরা। ছবি: রুজভেল্ট হোটেলের ওয়েবসাইট।

গ্ল্যামার, ইতিহাস আর মহামারির থাবা

চার তারকা হোটেল রুজভেল্ট কেবল ব্যবসায়ীদের আস্তানা ছিল না, এটি ছিল পর্যটন ও সংস্কৃতির কেন্দ্রও। ওয়াল স্ট্রিট, দ্য ফ্রেঞ্চ কানেকশন এবং মেইড ইন ম্যানহাটনের মতো সিনেমার জন্য মাইকেল ডগলাস, আল পাচিনো এবং জেনিফার লোপেজ এখানে শুটিং করেছেন। জনপ্রিয় সিরিজ ‘ম্যাড মেন’-এও হোটেলটি দেখা গেছে।

এখানে গাই লোমবার্ডো এবং তাঁর ‘রয়্যাল কানাডিয়ানস’ প্রায় ৩০ বছর পারফর্ম করেছেন, যা হোটেলটিকে নিউ ইয়ার ইভ-এর একটি ঐতিহ্যে পরিণত করেছিল। এছাড়া লরেন্স ওয়েল্ক-এর অর্কেস্ট্রা এবং ৯০-এর দশকে পাকিস্তানের ব্যান্ড ‘জুনুন’ এখানে পারফর্ম করেছে।

নিউ ইয়র্ক গভর্নর থমাস ই. ডিউই হোটেলটিকে নির্বাচনের রাতের সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহার করতেন।

অভিজাত শ্রেণী, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের পছন্দের জায়গা হওয়ায় এটি ‘ম্যাডিসন অ্যাভিনিউয়ের গ্র্যান্ড ডেম’ হিসেবে খ্যাতি পায় এবং মিডটাউন ম্যানহাটনের উচ্চবিত্তদের অনুষ্ঠান ও উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

তবে ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে বিশ্বব্যাপী ভ্রমণ ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়লে পরিস্থিতি বদলে যায়। ক্রমবর্ধমান লোকসানের মুখে ওই বছরের শেষ দিকে হোটেলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

চার তারকা হোটেল রুজভেল্ট কেবল ব্যবসায়ীদের আস্তানা ছিল না, এটি ছিল পর্যটন ও সংস্কৃতির কেন্দ্রও। ছবি: রুজভেল্ট হোটেলের ওয়েবসাইট।
চার তারকা হোটেল রুজভেল্ট কেবল ব্যবসায়ীদের আস্তানা ছিল না, এটি ছিল পর্যটন ও সংস্কৃতির কেন্দ্রও। ছবি: রুজভেল্ট হোটেলের ওয়েবসাইট।

পরবর্তীতে ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে নিউ ইয়র্ক সিটি কর্তৃপক্ষ হোটেলটিকে অভিবাসীদের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে লিজ নেয়। স্বল্পমেয়াদে আয় হলেও এ নিয়ে বিতর্কের জন্ম হয়। পরে চলতি বছরের শুরুর দিকে আশ্রয়কেন্দ্রের কার্যক্রম শেষ হলে খালি ভবনটি পুনরায় পিআইএ-র নিয়ন্ত্রণে আসে।

হোটেল হিসেবে ফিরছে না রুজভেল্ট, কিন্তু কেন

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, পাকিস্তান কেন এটি সংস্কার করে আবার হোটেল হিসেবে চালু করছে না? উত্তরটা সহজ, লাভজনক নয়। শত বছরের পুরনো এই বিশাল কাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ করা এখন বড্ড ব্যয়বহুল। আধুনিক লাক্সারি হোটেলগুলোর সঙ্গে পাল্লা দেওয়া কঠিন। তাই পাকিস্তান এখন ভিন্ন পথে হাঁটছে। তারা এই ৪২ হাজার বর্গফুটের জমিতে ৫০ থেকে ৬০ তলার একটি বিশাল আধুনিক টাওয়ার বানাতে চায়, যেখানে অফিস আর বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট থাকবে।

আইএমএফ এবং অর্থনীতির সমীকরণ

বর্তমানে পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তলানিতে। সঙ্গে উচ্চ বৈদেশিক ঋণ এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন ব্যবস্থা তো আছেই। দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক ক্ষোভ তৈরি না করে তহবিল সংগ্রহের একটি প্রধান কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদেশের মাটিতে থাকা উচ্চমূল্যের রাষ্ট্রীয় সম্পদগুলো কাজে লাগানো।

তবে বিদেশের মাটিতে থাকা এই ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’ বিক্রি করতে নারাজ। তারা চায় এর মালিকানা নিজেদের কাছে রেখে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে বড় বিনিয়োগ আনতে। এতে করে প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট আয় নিশ্চিত হবে।

আইএমএফ সমর্থিত বেসরকারিকরণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে সরকার রুজভেল্ট হোটেলের জন্য এমন একটি লেনদেন কাঠামো অনুমোদন করেছে যেখানে এটি সরাসরি বিক্রি করা হবে না। এটি পরিচালিত হবে একটি যৌথ বিনিয়োগ (জয়েন্ট ভেঞ্চার) মডেলের অধীনে।

২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে হোটেলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ছবি: রুজভেল্ট হোটেলের ওয়েবসাইট।
২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে হোটেলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ছবি: রুজভেল্ট হোটেলের ওয়েবসাইট।

রয়টার্সের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাষ্ট্র ইক্যুইটি পার্টনারশিপের মাধ্যমে যুক্ত থাকবে, যদিও অফার করা শেয়ারের পরিমাণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। এই প্রক্রিয়াটি পরিচালনার জন্য ‘জোনস ল্যাং লাসালে’ (জেএলএল)-কে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।

পাকিস্তানের একজন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, শতবর্ষী এই স্থাপনাটি দেশটির মালিকানাধীন বিদেশের মাটিতে থাকা রিয়েল এস্টেটগুলোর মধ্যে অন্যতম মূল্যবান এবং এটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে বড় বড় ডেভেলপারদের মধ্যে ‘প্রবল আগ্রহ’ দেখা গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা জানান, সরকার আশা করছে এই পুনর্উন্নয়নের মাধ্যমে হোটেলের মূল্য ১০০ কোটি ডলারের অনেক উপরে পৌঁছে যাবে। পুরো প্রকল্পটি সম্পন্ন করতে চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে পাকিস্তান ১০ কোটি ডলারের একটি প্রাথমিক কিস্তি প্রত্যাশা করছে।

১০০ কোটি ডলার কি খুব বেশি?

প্রথমে শুনলে মনে হতে পারে, একটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা শতবর্ষী হোটেলের দাম ১০০ কোটি ডলার! কিন্তু ম্যানহাটনের রিয়েল এস্টেট বাজারে জমির দামই সব। রুজভেল্ট যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন টাওয়ার হলে এর বাজারমূল্য ৩ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

তাই পাকিস্তানের কাছে রুজভেল্ট এখন আর কেবল আবেগের কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নয়, বরং ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিকে টেনে তোলার এক বড় অস্ত্র। আগামী কয়েক বছরে এই আইকনিক ল্যান্ডমার্কের চেহারা বদলে যাবে ঠিকই, কিন্তু এর আভিজাত্য আর মূল্য পাকিস্তানের জন্য চিরকালই বিশেষ কিছু হয়ে থাকবে।

পাকিস্তানের জন্য এখন এটি এমন একটি কৌশলগত সম্পদ, যা নিয়ে চলবে সর্বোচ্চ মূল্য তুলে নেওয়ার লড়াই। আর সেই লড়াইয়ের বাজি, ১০০ কোটি ডলার।

-আজকের পত্রিকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed