রোহিঙ্গা হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বাধা দেওয়া আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা এখন মিয়ানমারের সংসদ সদস্য
![]()
নিউজ ডেস্ক
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ইন দিন গ্রামে ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা হত্যাকাণ্ড নিয়ে অনুসন্ধানকারী দুই রয়টার্স সাংবাদিককে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়ে আলোচনায় আসা এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা এবার ম্যাগওয়ে অঞ্চলের পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
সাবেক মেজর জেনারেল টিন কো কো গত বছরের সেপ্টেম্বরে উপ-পুলিশপ্রধানের পদ থেকে অবসর নিয়ে জান্তা-সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি)-এর প্রার্থী হিসেবে ডিসেম্বর-জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেন। আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে তিনি ম্যাগওয়ে অঞ্চলের ৩ নম্বর আসন থেকে নির্বাচিত হন। এ আসনের অন্তর্ভুক্ত ম্যাগওয়ে, তাউংদ্বিংগি, মিয়োথিত ও নাটমাউক টাউনশিপ।
পিআর পদ্ধতিতে এ আসন থেকে চারজন আইনপ্রণেতা নির্বাচিত হন। এর মধ্যে দুটি আসন পায় ইউএসডিপি—টিন কো কো ও কিই তুন। বাকি দুটি আসন পায় ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টি ও পিপলস পার্টি।
পুলিশ বাহিনী ছাড়ার পর টিন কো কো ইউএসডিপির ম্যাগওয়ে অঞ্চলের প্রচার কমিটির চেয়ারম্যান হন। নতুন আঞ্চলিক প্রশাসনে তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে দেখা যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি একই আঞ্চলিক পার্লামেন্টে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী টিন্ট লুইন ও ইউএসডিপির আঞ্চলিক চেয়ারম্যান ডা. মাউং মাউং হতেইয়ের সঙ্গে বসবেন।
টিন কো কো ২০১৪ সালে গঠিত বর্ডার গার্ড পুলিশ ইউনিটের কমান্ডার হিসেবে মংডু এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে আলোচনায় আসেন। ইউনিটটি উত্তর রাখাইনে নিরাপত্তা তদারকির দায়িত্বে ছিল। পরে তিনি নেপিদো ও ইয়াঙ্গুনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন, যার মধ্যে ইয়াঙ্গুন সিকিউরিটি পুলিশ ব্যাটালিয়ন-২–এর কমান্ডার পদও ছিল।
ইয়াঙ্গুনে দায়িত্ব পালনকালে তিনি রয়টার্স সাংবাদিক ওয়া লোন ও কিয়াও সোয়ে উ–কে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন। ওই দুই সাংবাদিক ২০১৭ সালে মংডু টাউনশিপের ইন দিন গ্রামে ১০ রোহিঙ্গা পুরুষকে সেনাবাহিনীর হাতে হত্যার প্রমাণ সংগ্রহ করছিলেন—ঘটনাটি টিন কো কো’র দায়িত্বকালেই ঘটে।

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা আইনে মামলা করা হয়, যা তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ ঠেকানোর চেষ্টা হিসেবে দেখা হয়। তবে গ্রেপ্তারের পরও রয়টার্স ছবি-সহ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
মামলার এক সাক্ষী পুলিশ ক্যাপ্টেন মো ইয়ান নায়িং আদালতে জানান, টিন কো কো তার অধীনস্থদের সাংবাদিক দু’জনকে ফাঁদে ফেলতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরে দুই সাংবাদিককে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলেও ২০১৯ সালের মে মাসে রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমায় তারা মুক্তি পান।
টিন কো কো’র বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হয়নি। বরং তথ্য ফাঁসের অভিযোগে মো ইয়ান নায়িংকে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
সেনাবাহিনী ও পুলিশ ইন দিন হত্যাকাণ্ড গোপন করার চেষ্টা করলেও ঘটনাটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার দায়ের করা গণহত্যা মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পরে সেনাবাহিনী স্বীকার করে যে তাদের সদস্যরাই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল। সাত সৈন্যকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলেও সামরিক প্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের নির্দেশে এক বছরের কম সময়ের মধ্যেই তাদের মুক্তি দেওয়া হয়।
টিন কো কো এ সময়ের মধ্যেই পদোন্নতি পেতে থাকেন। তিনি শান রাজ্যের পুলিশপ্রধান, কেন্দ্রীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কমিটির উপ-সচিব এবং অ্যান্টি-নারকোটিক্স পুলিশ ফোর্সের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি উপ-পুলিশপ্রধান পদে উন্নীত হন। শান রাজ্যে দায়িত্বকালে মাদক উৎপাদন, মানবপাচার ও অনলাইন প্রতারণা চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সর্বশেষ বিতর্কিত নির্বাচনে পিআর পদ্ধতিতে ভোটারদের সরাসরি মোকাবিলা ছাড়াই তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এপ্রিল মাসে জান্তা নতুন সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে প্রেক্ষাপটে টিন কো কো ম্যাগওয়ের মুখ্যমন্ত্রী কিংবা সামরিক নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনের অন্য কোনো উচ্চপদে আসীন হন কিনা, তা এখন দেখার বিষয়।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।