খ্রিস্টান ধর্মযাজকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞাসংবলিত হোর্ডিংয়ের আবেদন খারিজ করল ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

খ্রিস্টান ধর্মযাজকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞাসংবলিত হোর্ডিংয়ের আবেদন খারিজ করল ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

খ্রিস্টান ধর্মযাজকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞাসংবলিত হোর্ডিংয়ের আবেদন খারিজ করল ভারতের সুপ্রিম কোর্ট
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ছত্তিশগড় হাইকোর্টের একটি রায় চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা আবেদন খারিজ করেছে। ওই রায়ে কিছু গ্রামসভা এলাকায় খ্রিস্টান ‘পাদ্রি ও পুরোহিতদের’ প্রবেশে নিষেধাজ্ঞাসংবলিত হোর্ডিংয়ের বৈধতা নিয়ে আপত্তি জানানো আবেদনকারীদের সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের কাছে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

বিচারপতি বিক্রম নাথ ও বিচারপতি সন্দীপ মেহতার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ সোমবার জানায়, ছত্তিশগড় হাইকোর্ট ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবরের রায়ে আবেদনকারীদের পঞ্চায়েত (তফসিলি এলাকায় সম্প্রসারণ) আইন, ১৯৯৬–সংক্রান্ত রাজ্যীয় বিধিমালা (পেসা রুলস) অনুযায়ী উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে যাওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছিল।

রাজ্যের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতে বলেন, হাইকোর্টে দায়ের করা আবেদনে সীমিত দাবি ছিল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টে করা আপিলে নতুন তথ্য, নথি ও বিভিন্ন মাত্রা যুক্ত করা হয়েছে।

অন্যদিকে আবেদনকারীদের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কলিন গনসালভেস যুক্তি দেন, অবৈধ ধর্মান্তর রোধে সতর্কতামূলক সাধারণ হোর্ডিং টানানোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অসাংবিধানিক বলা যায় না। তিনি অভিযোগ করেন, হাইকোর্ট ধর্মান্তর প্রসঙ্গে পর্যাপ্ত উপাত্ত ছাড়াই নানা মন্তব্য করেছে।

বিচারপতি বিক্রম নাথ বলেন, আবেদনকারীদের প্রথমেই সংশ্লিষ্ট বিধিমালার অধীনে নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের কাছে যাওয়া উচিত ছিল, যারা উপাত্তের ভিত্তিতে বিষয়টি পরীক্ষা করতেন।

হাইকোর্টে কী বলা হয়েছিল

হাইকোর্টে আবেদনকারীরা দাবি করেন, পেসা কাঠামোর আওতায় সংশ্লিষ্ট গ্রামসভাগুলো তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ করেই এসব হোর্ডিং স্থাপন করেছে। তারা জানান, ২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট পঞ্চায়েত পরিচালক একটি সার্কুলারে তফসিলি এলাকায় প্রযোজ্য পেসা আইনের অধীন জেলাপরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের গ্রামসভার সদস্যদের ‘জল, জঙ্গল, জমিন’ রক্ষার শপথসংবলিত প্রস্তাব প্রচারের নির্দেশ দেন।

তবে আবেদনকারীদের অভিযোগ, ওই সার্কুলারের আগেই ক্ষমতাসীন দলের কিছু সদস্য উপজাতি গ্রামবাসীদের উসকে দিয়ে পেসা আইনের অপব্যবহার করে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর উদ্দেশ্যে এ ধরনের হোর্ডিং স্থাপন করান।

ধর্মান্তর নিয়ে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

ছত্তিশগড় হাইকোর্ট রায়ে ধর্মান্তর প্রসঙ্গেও বিস্তারিত মন্তব্য করে। আদালত উল্লেখ করে, ভারতে ধর্মান্তর দীর্ঘদিন ধরেই সংবেদনশীল সামাজিক-রাজনৈতিক ইস্যু। বিশেষত দরিদ্র ও অশিক্ষিত উপজাতি জনগোষ্ঠীর মধ্যে খ্রিস্টান মিশনারিদের মাধ্যমে ধর্মান্তরের অভিযোগ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

রায়ে বলা হয়, সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিক ধর্ম পালনের, প্রচারের ও চর্চার স্বাধীনতা ভোগ করেন। তবে প্রলোভন, জোরপূর্বক বা প্রতারণার মাধ্যমে ধর্মান্তর সেই স্বাধীনতার অপব্যবহার।

আদালত ১৯৭৭ সালের ‘রেভারেন্ড স্টেইনিসলস বনাম মধ্যপ্রদেশ রাজ্য’ মামলার সাংবিধানিক বেঞ্চের রায়ের প্রতি ইঙ্গিত করে, যেখানে বলা হয়েছিল—ধর্ম প্রচারের অধিকার অন্য কাউকে প্রলোভন, জোর বা প্রতারণার মাধ্যমে ধর্মান্তর করার অধিকার নয়।

হাইকোর্ট আরও মন্তব্য করে, ধর্মান্তর যখন ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় না হয়ে প্রলোভন বা দুর্বলতার সুযোগ নেওয়ার মাধ্যমে ঘটে, তখন তা সামাজিক বিভাজন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। রায়ে বলা হয়, উপজাতি সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে ধর্ম তাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জীবনদর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত; ফলে ধর্মান্তর সামাজিক টানাপোড়েন সৃষ্টি করতে পারে।

তবে আদালত স্পষ্ট করে জানায়, স্বেচ্ছায় ও আত্মিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে ধর্মান্তর সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু দাতব্য কাজের আড়ালে যদি তা প্রভাবিত বা প্ররোচিত হয়, তাহলে তা সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী হতে পারে।

সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে হাইকোর্টের রায় বহাল থাকায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে এখন পেসা বিধিমালার আওতায় নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের কাছেই প্রতিকার চাইতে হবে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।