মিয়ানমার সীমান্তে কৌশলগত রেলপথ নির্মাণে গতি বাড়াচ্ছে চীন

মিয়ানমার সীমান্তে কৌশলগত রেলপথ নির্মাণে গতি বাড়াচ্ছে চীন

মিয়ানমার সীমান্তে কৌশলগত রেলপথ নির্মাণে গতি বাড়াচ্ছে চীন
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

চীনের ইউনান প্রদেশের পশ্চিমাঞ্চলে কৌশলগত দালি–রুইলি রেলপথ নির্মাণে গতি বাড়িয়েছে বেইজিং। ভবিষ্যতে এই রেললাইনটি মিয়ানমারের পরিকল্পিত মান্দালয়–মিউজ রেলপথের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।

৩৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ Dali–Ruili Railway-কে চীনা প্রকৌশলীরা বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বর্তমানে এটি সবচেয়ে জটিল ও চূড়ান্ত ধাপে প্রবেশ করেছে।

রেলপথটি ইউনানের দালি থেকে রুইলি হয়ে মিয়ানমার সীমান্ত পর্যন্ত যাবে। তবে আপাতত রুইলিতেই এর সমাপ্তি ঘটবে। কারণ সীমান্তের অপর পাশে উত্তর শান রাজ্যে কিয়িন সান কিয়াউত সীমান্ত ফটক ও ১০৫-মাইল বাণিজ্য অঞ্চল বর্তমানে প্রতিরোধ জোট ‘ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স’-এর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, ফলে সীমান্ত অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণে বড় পরিবর্তন এসেছে।

দুই ধাপে নির্মাণাধীন প্রকল্পের প্রথম অংশ—দালি থেকে বাওশান—১৪ বছর নির্মাণকাজ শেষে ২০২২ সালে চালু হয়। দ্বিতীয় অংশ বাওশান থেকে রুইলি পর্যন্ত, যার কাজ শুরু হয় ২০১৫ সালে; এটি ২০২৮ সালে শেষ হওয়ার কথা।

বর্তমানে প্রকৌশলীরা ৩৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ গাওলিগং পর্বত সুড়ঙ্গ নির্মাণে কাজ করছেন, যা সম্পন্ন হলে এশিয়ার দীর্ঘতম রেল টানেল হবে। প্রকল্পের অর্ধেক কাজ শেষ হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

রেললাইনটি চালু হলে কুনমিং থেকে রুইলি পর্যন্ত যাত্রাসময় ৯ ঘণ্টা থেকে কমে সাড়ে ৪ ঘণ্টায় নামবে। এটি চীন–মিয়ানমার আন্তর্জাতিক রেল করিডরের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে, যা বেইজিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর অন্যতম কৌশলগত রুট।

বিশ্লেষকদের মতে, রেলপথটি মিয়ানমারের মান্দালয়–মিউজ লাইনের সঙ্গে যুক্ত হলে চীন সরাসরি ভারত মহাসাগরে স্থলপথে প্রবেশাধিকার পাবে। এতে মালাক্কা প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমবে এবং স্থলবেষ্টিত ইউনান প্রদেশকে পশ্চিমাঞ্চলীয় অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।

অনিশ্চয়তায় মিয়ানমার অংশ

গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ইয়াঙ্গুনে চীনা নববর্ষ উদ্‌যাপনে জান্তা সরকারের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা সোয়ে উইন দাবি করেন, মিউজ–মান্দালয় রেলপথের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। তিনি এটিকে চীন–মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের (সিএমইসি) অংশ হিসেবে কুনমিং–কিয়াউকফিউ সংযোগের প্রথম ধাপ হিসেবে তুলে ধরেন।

তবে পর্যবেক্ষকরা এ দাবি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। প্রস্তাবিত রুটের বড় অংশ বর্তমানে জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহর জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর দখলে এবং ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে এ অঞ্চলগুলোতে তীব্র সংঘাত চলছে। ফলে নিরাপত্তা, ভূমি অধিগ্রহণ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় ১,৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ করিডরটি কুনমিং থেকে মান্দালয় হয়ে পূর্বে ইয়াঙ্গুন এবং পশ্চিমে রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকফিউ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে যুক্ত হবে। কিয়াউকফিউতে ইতোমধ্যে চীনের তেল ও গ্যাস পাইপলাইনের শেষপ্রান্ত রয়েছে এবং সেখানে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

৪১০ কিলোমিটার দীর্ঘ মান্দালয়–মিউজ রেললাইনটি ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার গতির জন্য নকশা করা হয়েছে। এটি চালু হলে মান্দালয় থেকে সীমান্ত পর্যন্ত যাত্রাসময় সড়কপথে ৮ ঘণ্টা থেকে কমে ৩ ঘণ্টায় নেমে আসবে। মিউজ হলো চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার, আর মান্দালয় দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র।

তবে প্রস্তাবিত রুটের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বর্তমানে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, প্রায় ৯০০ কোটি ডলার ব্যয়ে নির্মাণাধীন মিউজ–মান্দালয় রেললাইন একাই মিয়ানমারকে অস্থিতিশীল ঋণের বোঝায় ফেলতে পারে—বিশেষত এমন সময়ে যখন দেশটির অর্থনীতি গভীর সংকটে রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের জন্য প্রকল্পটির কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। তবে মিয়ানমারের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি আর্থিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকিও ক্রমেই বাড়ছে। শেষ পর্যন্ত রেললাইনটি মান্দালয় বা কিয়াউকফিউ পর্যন্ত পৌঁছাবে কি না, তা নির্ভর করবে মিয়ানমারের চলমান রাজনৈতিক সংকট কতটা দ্রুত সমাধান হয় তার ওপর।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *