মিয়ানমারে ই-পাসপোর্ট আইন নিয়ে উদ্বেগ: নজরদারি ও চলাচলের স্বাধীনতা সীমিত করার অভিযোগ

মিয়ানমারে ই-পাসপোর্ট আইন নিয়ে উদ্বেগ: নজরদারি ও চলাচলের স্বাধীনতা সীমিত করার অভিযোগ

মিয়ানমারে ই-পাসপোর্ট আইন নিয়ে উদ্বেগ: নজরদারি ও চলাচলের স্বাধীনতা সীমিত করার অভিযোগ
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

মিয়ানমারের সামরিক জান্তা মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন ই-পাসপোর্ট চালুর একটি আইন পাস করেছে। তবে বিরোধী গোষ্ঠীগুলো সতর্ক করে বলেছে, এটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ, যার মাধ্যমে মানুষের চলাচলের স্বাধীনতা সীমিত করা এবং নজরদারি বাড়ানো হতে পারে।

আইন অনুযায়ী, আগামী বছর থেকেই বিদ্যমান সব পাসপোর্টকে বায়োমেট্রিক বা ই-পাসপোর্টে রূপান্তর করা হবে। এই প্রক্রিয়া ২০২৪ সালে চালু হওয়া ডিজিটাল পরিচয়পত্রের ওপর ভিত্তি করে হবে, যেখানে আঙুলের ছাপ, মুখের স্বীকৃতি (ফেসিয়াল রিকগনিশন)সহ বিভিন্ন তথ্য সংরক্ষিত থাকে।

এতে ১০ সদস্যের একটি কেন্দ্রীয় ইস্যু বোর্ড গঠনের কথাও বলা হয়েছে, যার চেয়ারম্যান থাকবেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী। এই বোর্ডের হাতে পাসপোর্ট অনুমোদন বা বাতিল করার চূড়ান্ত ক্ষমতা থাকবে।

সমালোচকদের মতে, এই আইনে দুটি বড় ঝুঁকি রয়েছে। প্রথমত, কার্যকর তথ্য সুরক্ষা আইন না থাকায় এটি নজরদারির পরিধি বাড়াতে পারে। দ্বিতীয়ত, কর্মকর্তাদের—বিশেষ করে কেন্দ্রীয় বোর্ডের—হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা হয়রানি ও অপব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

মিয়ানমার ইন্টারনেট প্রজেক্টের ডিজিটাল স্বাধীনতা বিশ্লেষক থিত নিয়ান দ্য ইরাবতীকে বলেন, “ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষায় জান্তার ওপর আস্থা রাখা যায় না। অন্যান্য দেশে ই-পাসপোর্ট ইতিবাচক হতে পারে, কিন্তু মিয়ানমারে এটি ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করবে, কারণ এখানে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার কোনো আইনি নিশ্চয়তা নেই।”

আইনের ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের ভিত্তিতে ইস্যু বোর্ড বিদ্যমান পাসপোর্ট বাতিল করতে এবং আবেদনকারীদের কালো তালিকাভুক্ত করতে পারবে।

এছাড়া ২৯ নম্বর ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, “জাতীয় নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত” মনে করা হলে যে কাউকে পাসপোর্ট দেওয়া নাও হতে পারে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অস্পষ্ট ভাষা শুধু পরিচিত ভিন্নমতাবলম্বীদের লক্ষ্য করে না, বরং কর্মকর্তাদের হাতে এমন ক্ষমতা দেয় যাতে তারা যেকোনো ব্যক্তিকে রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করতে পারেন।

একজন আইনজীবী দ্য ইরাবতীকে বলেন, “এটি প্রশাসনিকভাবে আইনের অপব্যবহার করে রাজনৈতিক ভিন্নমত দমন করার একটি কৌশল।” তিনি বলেন, “কে ‘মনে করা হচ্ছে’—এই বাক্যাংশটি অস্পষ্টতার এমন এক ক্ষেত্র তৈরি করে, যা সহজেই অপব্যবহারযোগ্য।”

বিশেষ করে ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর সিভিল ডিসওবিডিয়েন্স মুভমেন্ট (সিডিএম)-এ অংশ নেওয়া হাজারো মানুষের জন্য এই আইন উদ্বেগজনক। ওই আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই এখন কালো তালিকাভুক্ত হিসেবে বিবেচিত।

জান্তা আন্দোলনের জবাবে অনেককে আটক ও হত্যা করেছে, যার ফলে অনেকেই দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।

সমালোচকদের মতে, যদি কোনো সরকারবিরোধী ব্যক্তি বৈধভাবে বিদেশে যান কিন্তু তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভিন্নমতাবলম্বী হিসেবে চিহ্নিত করা না হয়, তবে তার পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হলে কী হবে—এ প্রশ্ন এখন বড় হয়ে উঠছে। নতুন আইনের অধীনে দূতাবাস কর্মকর্তারা শুধু সন্দেহের ভিত্তিতেই পাসপোর্ট নবায়ন না করে দিতে পারেন, এমনকি তাকে কালো তালিকাভুক্তও করতে পারেন।

অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার্স-এর তথ্য অনুযায়ী, এখনো ২২ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ আটক রয়েছেন, এবং প্রায় ৮ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। গত বছর জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এক যুব প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৪০ শতাংশ তরুণ সুযোগ পেলে দেশ ছাড়ার কথা বিবেচনা করছেন—এবং সমালোচকদের অভিযোগ, নতুন পাসপোর্ট আইন মূলত এই শ্রেণিকেই লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।