হারানো সম্প্রদায়: মণিপুরের জঙ্গল ছেড়ে ইসরায়েলের পথে ইহুদি ‘বিনেই মেনাশে’রা
ভারতের মণিপুর রাজ্যের চুরচাদপুরের কাছের কিবুতজের একটি সিনাগগে বিনেই মেনাশে গোত্রের লোকজন প্রার্থনা করছেন। ছবি: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
![]()
নিউজ ডেস্ক
ভারতের একেবারে উত্তর-পূর্ব কোণে মিয়ানমার ঘেঁষা পাহাড়ি এলাকায় ‘বিনেই মেনাশে’ সম্প্রদায়ের কয়েক হাজার মানুষের বাস। মণিপুরের একটি কিবুতজ বা কৃষিভিত্তিক গ্রামে বাস করেন এই সম্প্রদায়ের শিমন গ্যামথেনলাল।
সম্প্রতি তার বাঁশের তৈরি কুঁড়েঘরে গিয়ে দেখা যায়, ইংরেজি ও হিব্রু ভাষায় ছাপা ইহুদি ধর্মের নানা লেখা গুছিয়ে রাখছেন তিনি। পাশেই মোড়ায় বসে তার পরিবারের নারীরা দুপুরের খাবারের জন্য জঙ্গল থেকে কুড়িয়ে আনা শাকসবজি কাটছিলেন। খাবারগুলো দেখতে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় ঘরানার, কিন্তু ইহুদিদের ‘কোশার’ বা হালাল নিয়ম মেনেই তৈরি।

মণিপুরের এই বিচ্ছিন্ন জনপদের মানুষগুলো বিশ্বাস করে, তারা ইসরায়েলের ‘হারানো ১০ সম্প্রদায়ের’ একটি। তারা নিজেদের জুডাহর রাজা মানাসের বংশধর বলে দাবি করেন, যাকে প্রায় ২ হাজার ৮০০ বছর আগে নির্বাসিত করা হয়েছিল। ভারতের মণিপুর ও মিজোরাম রাজ্যে এই বিনেই মেনাশেদের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। তবে এখন তাদের অনেকেই ইসরায়েলে পাড়ি জমাচ্ছেন।
বংশপরম্পরায় তারা তাদের সন্তানদের শিখিয়ে আসছেন, কীভাবে তাদের পূর্বপুরুষেরা প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়া পেরিয়ে এই জঙ্গলে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। নিজেদের ঐতিহাসিক উৎস প্রমাণের চেয়ে তারা নিজেদের ধর্ম পালন নিয়েই বেশি আগ্রহী।


নব্বইয়ের দশক থেকেই এই সম্প্রদায়ের প্রায় অর্ধেক মানুষ ধাপে ধাপে ইসরায়েলে চলে গেছে। বৃহস্পতিবার ‘অপারেশন উইংস অব ডন’-এর আওতায় ইসরায়েল সরকার আরও প্রায় ২৫০ জন মেনাশিকে বিমানে করে তেল আবিবে নিয়ে যাবে। বাকিদেরও শীঘ্রই নিয়ে যাওয়া হবে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই অর্থায়নকে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ জায়নবাদী সিদ্ধান্ত’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, এটি ইসরায়েলের উত্তরের গালিল অঞ্চলকে আরও শক্তিশালী করবে। লেবাননে হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধে সম্প্রতি এই অঞ্চলগু বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ধর্ম নাকি অর্থনীতি?
তবে মেনাশিরা বলছেন, তারা ধর্মের টানেই ইসরায়েলে যেতে চান। মণিপুরের কিবুতজে বসবাসকারী বেঞ্জামিন হাওকিপ বলেন, ‘আমরা ইহুদি ধর্ম অনুসরণ করি, কিন্তু এখানে আমরা আমাদের সব রীতিনীতি পালন করতে পারি না। আমাদের কিছু প্রার্থনার জন্য মিনিয়ান বা নির্দিষ্টসংখ্যক মানুষের প্রয়োজন হয়, যা এই পাহাড়ে মেলা ভার। তাই আমরা ধর্মের জন্যই ইসরায়েলে যেতে চাই।’

হিব্রু ভাষার শিক্ষক গ্যামথেনলাল বলেন, ‘আমরা ইসরায়েলে যেতে চাই। এর ৯০ শতাংশ কারণ হলো আমাদের ধর্ম। তবে হ্যাঁ, সেখানকার শিক্ষা ও অন্যান্য সুবিধাও এখানকার চেয়ে অনেক ভালো।’

তবে ইসরায়েলে বসবাসকারী জেসিকা থাংজমের মতে, এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো বেশ কঠিন। তিনি বলেন, কৃষিভিত্তিক জীবন থেকে হঠাৎ একটি ‘উচ্চ প্রযুক্তিভিত্তিক পরিবেশে’ গিয়ে মানিয়ে নেওয়া সহজ নয়।
শিকড়ের সন্ধান ও ইহুদি পরিচয়
মণিপুরে মেনাশিদের কুকি সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। তারা যে ভাষায় কথা বলে, তা তিব্বতি-বর্মি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। নৃবিজ্ঞানীদের মতে, তাদের আদি শিকড় বর্তমান চীনের ভূখণ্ডে ছিল। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে মার্কিন মিশনারিদের প্রভাবে বেশির ভাগ কুকি খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়।

ভারতের বিনেই মেনাশে কাউন্সিলের সভাপতি ডব্লিউ এল হাংশিং বলেন, ‘আমাদের বলা হয় হারানো সম্প্রদায়, আর হারানো মানে হারানোই! এত প্রাচীন একটি ঘটনার কোনো ডিএনএ প্রমাণ এখন খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।’ তিনি মনে করেন, বিজ্ঞানীরা যারা জৈবিক প্রমাণের খোঁজ করছেন, তারা ভুল পথে হাঁটছেন। তার মতে, ‘এটা কেবল ঈশ্বরই করতে পারেন।’

মণিপুরের কিবুতজ থেকে প্রায় চার ঘণ্টার দূরত্বে কাংপোকপি শহরে মেনাশিদের আরেকটি বসতি রয়েছে। কিন্তু ২০২৩ সালের মে মাসে কুকি এবং সমতলে বসবাসকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেইদের মধ্যে ভয়াবহ জাতিগত দাঙ্গা শুরু হয়, যা মণিপুরকে কার্যত দুই ভাগ করে ফেলে। এই সহিংসতা এখনো পুরোপুরি থামেনি।
দাঙ্গার কারণে ঘরবাড়ি ছেড়ে কিবুতজে আশ্রয় নেওয়া হাওকিপ বলেন, ‘কুকি-মেইতেই সহিংসতার পর জীবন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।’

- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।
হাংশিংদের মতো পরিবারগুলো দাঙ্গাবিধ্বস্ত মণিপুর ছেড়ে আরেকটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ইসরায়েলে পাড়ি জমাচ্ছে। ড্যানিয়েল হাংশিং বলেন, ‘আমরা জানি ইসরায়েলে অস্থিরতা চলছে, কিন্তু আমাদের সেখানেই যেতে হবে এবং সেখানেই মরতে হবে। আমরা যুদ্ধ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না।’
‘ভারত আমাদের জন্মভূমি, কিন্তু ইসরায়েল আমাদের নিয়তি। ওই ভূখণ্ডটি আমাদের জন্য প্রতিশ্রুত। আমাদের সেখানে যেতেই হবে’, ড্যানিয়েল হাংশিং বলেন।
-টিবিএস।