লক্ষীছড়িতে সেনাবাহিনীর আয়োজনে দুই সপ্তাহব্যাপী প্রাথমিক চিকিৎসা ও নার্সিং প্রশিক্ষণ শুরু
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি জনপদে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এক ব্যতিক্রমী ও সময়োপযোগী উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। দুর্ঘটনা কিংবা আকস্মিক অসুস্থতার পর হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই যাতে প্রয়োজনীয় জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়, সে লক্ষ্যেই খাগড়াছড়ির লক্ষীছড়ি জোনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় শুরু হয়েছে দুই সপ্তাহব্যাপী বিশেষ প্রাথমিক চিকিৎসা ও নার্সিং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি।
রোববার (২ আগস্ট) সকালে লক্ষীছড়ি উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ে লক্ষীছড়ি জোনের দিকনির্দেশনায় এবং উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় আনুষ্ঠানিকভাবে এ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ও মেডিকেল ক্যাম্পের উদ্বোধন করা হয়।
পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম ভৌগোলিক বাস্তবতায় অনেক এলাকায় এখনো দ্রুত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া কঠিন। পাহাড়ি পাড়াগুলো থেকে রোগীকে হাসপাতালে নিতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসার অভাবেই জটিলতা বাড়ে, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে স্থানীয় জনগণকেই জরুরি চিকিৎসাসেবায় দক্ষ করে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সেনাবাহিনী।
এই কর্মসূচির আওতায় উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে ২০ জন উদ্যমী তরুণ-তরুণীকে বাছাই করা হয়েছে। তাদের এমনভাবে প্রশিক্ষিত করা হচ্ছে যাতে যেকোনো দুর্ঘটনা বা জরুরি পরিস্থিতিতে চিকিৎসক পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে আহত বা অসুস্থ ব্যক্তির জীবন রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।
সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞ চিকিৎসক এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণার্থীদের হাতে-কলমে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে তীব্র রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ, হাড় ভাঙা ও বিভিন্ন আঘাতের প্রাথমিক চিকিৎসা, সাপের কামড়ের জরুরি ব্যবস্থাপনা, অগ্নিদগ্ধ রোগীর প্রাথমিক সেবা, পানিতে ডুবে যাওয়া ব্যক্তিকে উদ্ধার-পরবর্তী চিকিৎসা এবং অচেতন রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাস সচল রেখে নিরাপদে হাসপাতালে স্থানান্তরের আধুনিক কৌশল।

লক্ষীছড়ি জোন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল খান সজিবুল ইসলাম বলেন, পার্বত্য এলাকার দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থার কারণে জরুরি মুহূর্তে তাৎক্ষণিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সবসময় সম্ভব হয় না। তাই স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক তৈরি করা অত্যন্ত প্রয়োজন। তারা ফার্স্ট রেসপন্ডার হিসেবে কাজ করলে দুর্ঘটনা ও জরুরি পরিস্থিতিতে অনেক প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শুধু দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষাই নয়, জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও সমানভাবে কাজ করে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং মানবিক সহায়তাসহ বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে সেনাবাহিনী সবসময় জনগণের পাশে রয়েছে। এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচিও সেই ধারাবাহিকতারই অংশ।
স্থানীয় বাসিন্দারা সেনাবাহিনীর এ উদ্যোগকে অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও বাস্তবসম্মত বলে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় চিকিৎসক বা অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগে। সেখানে স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক থাকলে দুর্ঘটনার পরপরই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে, যা অনেক ক্ষেত্রে জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সচেতন মহল মনে করছে, পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা আরও কার্যকর ও মানবিক করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। স্থানীয় তরুণদের দক্ষ করে তোলার মাধ্যমে শুধু তাৎক্ষণিক চিকিৎসাসেবাই নয়, ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যসচেতন সমাজ গঠনেও এই কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
মানবিক দায়িত্ববোধ, দূরদর্শিতা এবং জনসেবার প্রতিশ্রুতির আরেকটি উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে লক্ষীছড়িতে সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগ ইতোমধ্যেই স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের প্রশিক্ষণ পার্বত্য অঞ্চলের অন্যান্য দুর্গম এলাকাতেও সম্প্রসারণ করা গেলে জরুরি স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানি প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।