স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর দুর্গম পাহাড়ে শিক্ষার আলো, স্বেচ্ছাশ্রমে চলছে পাঠদান

স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর দুর্গম পাহাড়ে শিক্ষার আলো, স্বেচ্ছাশ্রমে চলছে পাঠদান

স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর দুর্গম পাহাড়ে শিক্ষার আলো, স্বেচ্ছাশ্রমে চলছে পাঠদান
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

রাঙামাটির কাপ্তাই, বিলাইছড়ি ও রাজস্থলী উপজেলার সীমান্তবর্তী দুর্গম পাহাড়ি জনপদ ১৩০ নম্বর বারুদগোলা মৌজা। চারদিকে উঁচু পাহাড় আর ঘন অরণ্য। কাপ্তাই জেটিঘাট থেকে প্রায় দুই ঘণ্টার নৌপথ পেরিয়ে আরও দুই ঘণ্টা পায়ে হাঁটতে হয় দুর্গম পাহাড়ি পথ। এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েই পৌঁছাতে হয় এই জনপদে। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরও যেখানে পৌঁছেনি বিদ্যুতের আলো, গড়ে ওঠেনি কোনো সরকারি বিদ্যালয়, সেখানে শিক্ষার আলো ছড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন স্থানীয়রা।

দুর্গমতা, যোগাযোগ সংকট ও আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে এ এলাকার শিশুদের বড় একটি অংশ এতদিন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। দূরের বিদ্যালয়ে যাতায়াতের সুযোগ না থাকায় অনেক শিশুর শিক্ষাজীবন শুরু হওয়ার আগেই থেমে যেত। এমন বাস্তবতায় ২০২৩ সালে স্থানীয়দের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘শুভধন পাড়া সংঘরাজ শীলালংকার মহাথের বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিদ্যালয়টিতে এখন প্রায় ৭০ জন শিশু পড়াশোনা করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আশপাশের পাড়াগুলোর সব শিশুকে বিদ্যালয়ের আওতায় আনা সম্ভব হলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে যাবে।

বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল উদ্যোক্তা ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে রয়েছেন ভদন্ত বুদ্ধজ্যোতি ভিক্ষু (ভাগ্যজিৎ তঞ্চঙ্গ্যা)। তাঁর সঙ্গে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করছেন কানাডাপ্রবাসী প্রজ্ঞাশ্রী ভিক্ষু, শ্রীলঙ্কাপ্রবাসী বিপসসি ভান্তে, কলেজ শিক্ষক অমর বিকাশসহ কয়েকজন শিক্ষানুরাগী।

স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর দুর্গম পাহাড়ে শিক্ষার আলো, স্বেচ্ছাশ্রমে চলছে পাঠদান

ভদন্ত বুদ্ধজ্যোতি ভিক্ষু বলেন, শুধু দুর্গমতার কারণে এ এলাকার শিশুরা শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে—এটি মেনে নেওয়া যায় না। সেই তাগিদ থেকেই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিশুরা অনেক কষ্ট করে বিদ্যালয়ে আসে। এলাকার প্রতিটি শিশুকে শিক্ষার আওতায় আনার স্বপ্ন রয়েছে তাঁদের।

স্থানীয় অভিভাবকদের কাছেও পাড়ার কাছাকাছি বিদ্যালয়টি আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। তাঁদের ভাষ্য, আগে সন্তানদের দূরের বিদ্যালয়ে পাঠাতে হলে দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হতো। অনেক পরিবারের পক্ষেই সেটি সম্ভব ছিল না। এখন বাড়ির কাছেই বিদ্যালয় হওয়ায় শিশুরা নিয়মিত পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি বিদ্যালয়টি নানা সংকটের মধ্য দিয়ে চলছে। শিক্ষকরা কোনো বেতন ছাড়াই স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে পাঠদান করছেন। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও কোনো বেতন নেওয়া হয় না। ফলে সীমিত সামর্থ্য দিয়ে দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো বেতন নেওয়া হয় না। নিজেদের সীমিত সামর্থ্য নিয়ে শিক্ষকরা কাজ করছেন। তবে এভাবে দীর্ঘদিন বিদ্যালয় পরিচালনা করা সম্ভব নয়। সরকারি সহযোগিতা ও একটি স্থায়ী ব্যবস্থা এখন জরুরি।

স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর দুর্গম পাহাড়ে শিক্ষার আলো, স্বেচ্ছাশ্রমে চলছে পাঠদান

বিদ্যালয়ে রয়েছে শ্রেণিকক্ষ ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের ঘাটতিও। বিদ্যুৎ না থাকায় সন্ধ্যার পর পড়াশোনার সুযোগ সীমিত। অবকাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও প্রতিদিন বই-খাতা হাতে বিদ্যালয়ে ছুটে আসছে পাহাড়ের শিশুরা। তাদের চোখে রয়েছে পড়াশোনা করে নিজেদের ও পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার স্বপ্ন।

স্থানীয়দের দাবি, বিদ্যালয়টি দ্রুত সরকারি স্বীকৃতি দিয়ে জাতীয়করণের উদ্যোগ নেওয়া হোক। তাঁদের মতে, সরকারি ব্যবস্থাপনায় এলে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে স্বেচ্ছাশ্রমে পাঠদান করা শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এতে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার কমানোর পাশাপাশি দুর্গম পাহাড়ি এলাকার আরও বেশি শিশুকে শিক্ষার আওতায় আনা যাবে।

ভদন্ত বুদ্ধজ্যোতি ভিক্ষু বলেন, বিদ্যালয়টির সরকারি স্বীকৃতি হলে দুর্গম এলাকার দরিদ্র শিশুদের জন্য একটি স্থায়ী ও মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠবে। পাশাপাশি শিক্ষকরা আর্থিক নিরাপত্তা পাবেন, যা বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে।

দুর্গম পাহাড়ের প্রতিকূলতা পেরিয়ে শুভধন পাড়ার এই ছোট বিদ্যালয়টি এখন স্থানীয় মানুষের কাছে শিক্ষার পাশাপাশি সম্ভাবনার প্রতীক। দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থার সুযোগ থেকে দূরে থাকা এই জনপদের মানুষের প্রত্যাশা, সরকারি উদ্যোগে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ হলে পাহাড়ের আরও বহু শিশুর কাছে পৌঁছাবে শিক্ষার আলো।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।