সেনাবাহিনীর জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন, মাইকেল চাকমাকে রিজিয়ন কমান্ডারের পাল্টা প্রশ্ন
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
রাঙামাটিতে সেনাবাহিনীর জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে ইউপিডিএফ সন্ত্রাসী মাইকেল চাকমার প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন ৩০৫ পদাতিক ব্রিগেড ও রাঙামাটি রিজিয়নের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ নাজমুল হক। তিনি বলেছেন, পাহাড়ে সেনাবাহিনীর কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করা। জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে এসব কার্যক্রমের বাস্তব সুফল আড়াল করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অতি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় ইউপিডিএফ নেতা মাইকেল চাকমা পাহাড়ে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার দুপুরে রাঙামাটির মারী স্টেডিয়ামে রাঙামাটি রিজিয়নের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় এবং রাঙামাটি পার্বত্য জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহযোগিতায় রাঙামাটি চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ফুটবল টুর্নামেন্টের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে বক্তব্যে রিজিয়ন কমান্ডার বলেন, সেনাবাহিনী পাহাড়ের মানুষের জন্য কী করছে—তার উত্তর মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমেই রয়েছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, পাহাড়ের দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকায় মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী নিয়মিত বিনামূল্যে মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করছে। পাশাপাশি পাহাড়ি যুবক-যুবতীদের প্যারামেডিক প্রশিক্ষণ, ফার্স্ট এইড ক্যাডার প্রশিক্ষণ, নারীদের সেলাই প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন ধরনের কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘‘আমরা পাহাড়ি যুবক-যুবতীদের প্যারামেডিক ট্রেনিং দিচ্ছি, যাতে প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলের মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারে। আমরা ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প করছি। মহিলারা যেন স্বাবলম্বী হতে পারে, সেজন্য সেলাই প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। ফার্স্ট এইড ক্যাডার করাচ্ছি, চোখের ছানি অপারেশন করছি, মেকানিক্যাল ট্রেনিং করাচ্ছি, যাতে সবাই স্বাবলম্বী হয়ে নিজেরাই উপার্জন করতে পারে।’’
রিজিয়ন কমান্ডার বলেন, এসব কার্যক্রম কোনো প্রচারণামূলক উদ্যোগ নয়; বরং দুর্গম পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বাস্তব প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, সেনাবাহিনী এই দেশ ও পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে।
তিনি বলেন, ‘‘সেনাবাহিনী এই দেশকে ভালোবাসে, এই অঞ্চলকে ভালোবাসে। সেনাবাহিনী এই অঞ্চলের মানুষকে ভালোবাসে। সুতরাং আপনারা (সশস্ত্র সন্ত্রাসীগোষ্ঠী) যারা জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চাচ্ছেন, সেই সুযোগ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। জনগণ কিন্তু সবকিছু বুঝতে পারে।’’
মাইকেল চাকমার বক্তব্যের জবাবে রিজিয়ন কমান্ডার পাহাড়ের সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। অতিবৃষ্টি, পাহাড়ধস ও নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতার সময় পাহাড়ের মানুষের পাশে কারা দাঁড়িয়েছে—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, ‘‘সম্প্রতি পাহাড়ে যে অতিবৃষ্টি হলো, ভূমিধস হলো, নিম্নাঞ্চলের মানুষ পানিবন্দি ছিল—আপনারা তখন কোথায় ছিলেন? মানুষের দুর্দিনে আপনাদের ভূমিকা কী ছিল?’’
তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, ‘আপনাতো প্রতিমাসে শুধু রাঙামাটি এরিয়া থেকেই ১৫-২০ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করেন। চাঁদাবাজির মাধ্যমে বিপুল অর্থ আদায়ের পরও সাধারণ মানুষের দুর্দশার সময়ে আপনারা কই ছিলেন, আপনাদের তো মানুষকে সহায়তা করতে দেখা যায় নি।’
রিজিয়ন কমান্ডার বলেন, ‘‘আমি আপনাদের ফ্রিতে একটা উপদেশ দেই, পাহাড়বাসীকে এতটা বোকা মনে করবেন না। জনগণ বোঝে কারা সঠিক আর কারা সুযোগসন্ধানী। জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা না করে মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত।’’
মাইকেল চাকমার রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পরিচয় প্রসঙ্গে রিজিয়ন কমান্ডার তাকে ইউপিডিএফের সঙ্গে যুক্ত একজন নেতা হিসেবে উল্লেখ করে সংগঠনটির বিরুদ্ধে সশস্ত্র কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, একদিকে সেনাবাহিনী যখন পাহাড়ের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছে, অন্যদিকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় ও ভয়ভীতির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মাইকেল চাকমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে দায়েরকৃত একাধিক মামলা রয়েছে। ২০০৭ সালের একটি চাঁদাবাজির মামলায় ২০২৫ সালের অক্টোবরে রাঙামাটির আদালত তাকে আট বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। মামলাটি ২০০৭ সালের লংগদু থানার একটি চাঁদাবাজির ঘটনায় দায়ের হয়েছিল। আদালতের রায়ের সময় তিনি অনুপস্থিত ছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০১৮ সালের নানিয়ারচরের উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমা হত্যা এবং পরদিন প্রতিপক্ষ সংগঠনের সভাপতি তপনজ্যোতি চাকমা বর্মাসহ কয়েকজন নিহত হওয়ার ঘটনায় করা মামলাগুলোতেও মাইকেল চাকমার নাম আসামি হিসেবে এসেছে।
এর বিপরীতে পাহাড়ের নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলার পাশাপাশি সেনাবাহিনীর জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমকে রিজিয়ন কমান্ডার দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উন্নয়নের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, চোখের ছানি অপারেশন, প্যারামেডিক ও ফার্স্ট এইড প্রশিক্ষণ, নারীদের সেলাই প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা দেওয়া নয়, বরং তাদের নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা তৈরি করা হচ্ছে।
বিশেষ করে কারিগরি ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক তরুণ-তরুণীর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক চাকরির সুযোগ সীমিত। এ অবস্থায় মোবাইল সার্ভিসিং, মেশিন বা মোটরযান মেরামত, প্যারামেডিক সেবা কিংবা সেলাইয়ের মতো দক্ষতা অর্জন স্থানীয় পর্যায়ে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
রিজিয়ন কমান্ডার বলেন, পাহাড়ের মানুষকে উন্নয়নের মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হলে তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। সেনাবাহিনী নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সেই জায়গাতেও কাজ করছে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘‘আমার মনে হয়, আপনাদের মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে মোকাবেলা করার জন্য সেনাবাহিনীর দরকার নেই। পাহাড়ের মানুষই যা করার দরকার তা করবে এবং আপনাদের যেখানে পাঠানোর দরকার, সেখানে পাঠিয়ে দেবে।’’
সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড়ে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সংকটের পাশাপাশি উন্নয়ন ও জনসেবার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যন্ত এলাকায় চিকিৎসা, নিরাপদ যোগাযোগ, শিক্ষা এবং কর্মমুখী দক্ষতা তৈরির সুযোগ বাড়লে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা হ্রাস পাবে। এ কারণে নিরাপত্তা কার্যক্রমের সঙ্গে জনকল্যাণ ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক কর্মসূচির সমন্বয়কে পার্বত্য অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।