পাহাড়ের প্রত্যন্ত পাড়ায় স্বাস্থ্যসেবায় নতুন ভরসা, ২১ জনকে প্রশিক্ষণ দিল সেনাবাহিনী
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
দুর্গম পাহাড়ি পাড়ায় চিকিৎসাকেন্দ্র অনেক দূরে। যোগাযোগব্যবস্থাও সব সময় সহজ নয়। বিশেষ করে গর্ভবতী মা, নবজাতক ও শিশুদের ক্ষেত্রে হঠাৎ কোনো শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানোর আগের সময়টুকু হয়ে ওঠে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্গম এলাকার মানুষের এমন বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় পর্যায়েই প্রাথমিক স্বাস্থ্য সহায়তার সক্ষমতা তৈরিতে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দীঘিনালা জোন। গর্ভকালীন স্বাস্থ্য, নিরাপদ প্রসব, নবজাতক ও শিশুর পরিচর্যা এবং প্রাথমিক চিকিৎসাবিষয়ক তিন সপ্তাহের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ২১ জনকে তৈরি করা হয়েছে স্থানীয় স্বাস্থ্য সহায়তাকারী হিসেবে।
প্রশিক্ষণ শেষে রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকালে দীঘিনালা জোন সদরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রশিক্ষণার্থীদের হাতে যোগ্যতার সনদপত্র তুলে দেওয়া হয়।
সনদ বিতরণ করেন দীঘিনালা জোনের মেডিকেল অফিসার ক্যাপ্টেন শায়খউদ্দীন সাকলাইন। দীঘিনালা জোনের তত্ত্বাবধানে এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সহযোগিতায় গত ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীদের শুধু শ্রেণিকক্ষভিত্তিক তাত্ত্বিক ধারণা দেওয়া হয়নি; বরং বাস্তব পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রাথমিক সহায়তা দিতে হবে, সে বিষয়েও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। গর্ভবতী মায়ের শারীরিক যত্ন, গর্ভকালীন বিভিন্ন ঝুঁকির লক্ষণ শনাক্ত করা, প্রসবকালীন করণীয়, প্রসব-পরবর্তী পরিচর্যা, নবজাতকের যত্ন, শিশুর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং দুর্ঘটনা কিংবা আকস্মিক অসুস্থতার সময় ফার্স্ট এইড দেওয়ার বিভিন্ন কৌশল শেখানো হয় তাদের।
দুর্গম পাহাড়ে এ ধরনের প্রশিক্ষণের গুরুত্ব শুধু স্বাস্থ্যসচেতনতা তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রত্যন্ত কোনো পাড়ায় হঠাৎ কোনো গর্ভবতী নারী অসুস্থ হয়ে পড়লে কিংবা কোনো শিশু দুর্ঘটনা বা আকস্মিক অসুস্থতার শিকার হলে চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার আগ পর্যন্ত পাশে থাকা প্রশিক্ষিত একজন ব্যক্তি অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বুঝতে, প্রয়োজনীয় প্রাথমিক সহায়তা দিতে এবং দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। একই সঙ্গে বিপজ্জনক কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে রোগীকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়াও সহজ হয়।
দীঘিনালার মতো বিস্তৃত ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগের সীমাবদ্ধতার কারণে স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে স্থানীয় সক্ষমতা তৈরি করা তাই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সেনাবাহিনীর এ উদ্যোগ সেই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি কার্যক্রম হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকেই ২১ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ফলে ভবিষ্যতে তাদের নিজ নিজ এলাকায় স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি জরুরি মুহূর্তে প্রাথমিক সহায়তার একটি স্থানীয় বলয় গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রশিক্ষণার্থী তিলক্ষ চাকমা বলেন, “প্রশিক্ষণের আগে গর্ভকালীন স্বাস্থ্য ও প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে আমাদের ধারণা সীমিত ছিল। এখন আমরা গর্ভবতী মা ও শিশুদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি জরুরি সময়ে প্রাথমিক সহযোগিতা করতে পারব।”
আরেক প্রশিক্ষণার্থী বিউটি মুৎসুদ্দি বলেন, “তিন সপ্তাহের প্রশিক্ষণে আমরা হাতে-কলমে অনেক কিছু শিখেছি। বিশেষ করে গর্ভকালীন পরিচর্যা, শিশুস্বাস্থ্য ও প্রাথমিক চিকিৎসার বিষয়গুলো আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিজ নিজ এলাকায় মানুষের প্রয়োজনে এই জ্ঞান কাজে লাগাতে চাই।”
দীঘিনালা জোনের মেডিকেল অফিসার ক্যাপ্টেন শায়খউদ্দীন সাকলাইন বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের কাছে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে। প্রশিক্ষণার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজনে প্রাথমিক সহায়তা দিতে পারবেন। তবে গুরুতর অবস্থায় রোগীকে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পাহাড়ি জনপদে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন মানবিক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রিক এ উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দুর্গম এলাকায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিকল্প তৈরি করা নয়, বরং চিকিৎসাসেবা পাওয়ার আগের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মানুষকে সচেতন ও প্রাথমিক সহায়তা দেওয়ার মতো সক্ষমতা তৈরি করাই এ প্রশিক্ষণের মূল শক্তি। বিশেষ করে মা ও শিশুর মতো ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই সক্ষমতা স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে উঠলে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
সনদপত্র বিতরণের মধ্য দিয়ে তিন সপ্তাহব্যাপী প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হলেও প্রশিক্ষণার্থীদের প্রকৃত দায়িত্ব এখন শুরু। নিজ নিজ পাড়া-মহল্লায় অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে গর্ভবতী মায়ের নিয়মিত স্বাস্থ্যপরামর্শ, নবজাতক ও শিশুর পরিচর্যা বিষয়ে সচেতনতা এবং জরুরি সময়ে প্রাথমিক সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে তারা দুর্গম জনপদে স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারবেন। সেনাবাহিনীর উদ্যোগে স্থানীয় মানুষের মধ্য থেকেই এমন সক্ষমতা তৈরি হওয়ায় দুর্গম পাহাড়ের স্বাস্থ্যসেবায় এটি দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।