এক কলসি ঘামের দামে এক কলসি পানি সংগ্রহ পাহাড়ি গ্রামবাসীর

এক কলসি ঘামের দামে এক কলসি পানি সংগ্রহ পাহাড়ি গ্রামবাসীর

এক কলসি ঘামের দামে এক কলসি পানি সংগ্রহ পাহাড়ি গ্রামবাসীর
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

৭২৫ বর্গকিলোমিটারের বিশাল কৃত্রিম জলাধার কাপ্তাই হ্রদ থাকলেও গ্রীষ্ম মৌসুমে শুকিয়ে যায় হ্রদের পানি। শুকনো মৌসুমে পানির স্তর একেবারে নিম্নস্তরে নেমে আসে। এসময় শুকিয়ে যায় পাহাড়ি ঝিড়ি-ঝর্নাগুলোও। ফলে রাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ি গ্রামগুলোতে সুপেয় পানির জন্য কয়েক কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হয় গ্রামবাসীকে। তখন যেন এক কলসি ঘামের দামে এক কলসি পানি সংগ্রহ করতে হয় পাহাড়ের মানুষকে। সংকট তীব্র আকার ধারণ করায় দুর্গম এলাকায় কয়েক লাখ মানুষ ভুগছেন সুপেয় পানির অভাবে। তবে সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

পাহাড়ি জেলা রাঙামাটি সদরের সাপছড়ি ইউনিয়নের দুর্গম নারাইছড়ি গ্রাম। রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কের সাপছড়ি স্কুল এলাকা থেকে প্রায় আধাঘণ্টা পাহাড়ি পথে হেঁটে যেতে হয় এই গ্রামে। উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ হওয়ায় সেখানে কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারে না। প্রায় পাঁচশ মানুষের বসবাস এই গ্রামে। পুরো গ্রামের ১১৩টি পরিবার নির্ভরশীল একটি ছড়ার পানির ওপর। কিন্তু শুকনো মৌসুমে ছড়াটি শুকিয়ে গেলে খাবার পানিসহ ব্যবহার্য পানির তীব্র সংকটে পড়েন গ্রামবাসী।

এক কলসি ঘামের দামে এক কলসি পানি সংগ্রহ পাহাড়ি গ্রামবাসীর

তবে এই চিত্র শুধু নারাইছড়ি গ্রামের নয়। রাঙামাটি জেলার সদর, বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি ও বিলাইছড়ির প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রামগুলোতেও পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।

এদিকে কাপ্তাই হ্রদেও পানি কমে যাওয়ায় সুপেয় পানির সংকট আরও প্রকট হয়েছে। এক কলসি বিশুদ্ধ পানির জন্য পাড়ি দিতে হচ্ছে মাইলের পর মাইল পথ। প্রত্যন্ত এলাকার বেশিরভাগ মানুষ পাহাড়ের ওপর বসবাস করায় সেখানে গভীর নলকূপ স্থাপনও সম্ভব হয় না।

এক কলসি ঘামের দামে এক কলসি পানি সংগ্রহ পাহাড়ি গ্রামবাসীর

নারাইছড়ি গ্রামের বাসিন্দারা জানান, ঝিড়ি-ঝর্না শুকিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন তারা। পানির চাহিদা মেটাতে ছড়ার বুকে গর্ত খুঁড়ে বিশেষ বাঁশের বেড়া দিয়ে মাটি আটকিয়ে কুয়া তৈরি করা হয়েছে। সেই কুয়ায় জমে থাকা পানিই এখন তাদের একমাত্র ভরসা। কোথাও কোথাও সেই কুয়াগুলোও শুকিয়ে যাচ্ছে। বছরের প্রায় ছয় মাস সুপেয় পানির জন্য সংগ্রাম করতে হয় এসব এলাকার মানুষকে।

বাঘাইছড়ির কচুছড়ি গ্রামের বাসিন্দা রাহুল চাকমা বলেন, শুষ্ক মৌসুমে কুয়ার মাধ্যমে কোনোভাবে খাবার পানি সংগ্রহ করা গেলেও বর্ষাকালে সংকট আরও তীব্র হয়। বর্ষায় জমে থাকা পানি ঘোলা হয়ে যাওয়ায় তা পান করা যায় না। সরকার কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই কষ্ট দূর হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এক কলসি ঘামের দামে এক কলসি পানি সংগ্রহ পাহাড়ি গ্রামবাসীর

স্থানীয়দের মতে, নভেম্বরের পর থেকে এখন পর্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় উল্লেখযোগ্য বৃষ্টি না হওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকট আরও বেড়েছে। গ্রীষ্মের দাবদাহে আধাঘণ্টা হেঁটে পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে অনেকে কাপ্তাই হ্রদ থেকে পানি সংগ্রহ করছেন। আবার কেউ কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে পাশের গ্রাম কিংবা হ্রদ থেকে পানি আনছেন। হ্রদের পানি ফুটিয়ে পান করা গেলেও শুকনো মৌসুমে হ্রদের পানিও অনেক কমে গেছে।

সরকারি হিসেবে জেলায় প্রায় ৫৮ শতাংশ মানুষ সুপেয় পানির আওতায় এসেছে বলে দাবি করা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। বিশেষ করে বছরের অর্ধেক সময়, শুকনো মৌসুমে জেলার প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ পানির সংকটে ভোগেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

এক কলসি ঘামের দামে এক কলসি পানি সংগ্রহ পাহাড়ি গ্রামবাসীর

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাওয়া এবং বন উজাড়ের কারণে দিন দিন পানি সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।

নারাইছড়ি গ্রামের বাসিন্দা মঙ্গল কুমার চাকমা বলেন, শীতের পর থেকেই গ্রামে পানির কষ্ট বাড়তে থাকে। অন্য সময় পাশের ঝিরি থেকে পানি পাওয়া গেলেও শুকনো মৌসুমে সেটিও শুকিয়ে যায়। ছড়াগুলো তখন সড়কের মতো হয়ে পড়ে। ফলে ঘণ্টাখানেক পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে পাশের গ্রাম থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। প্রতিদিন গোসল করাও সম্ভব হয় না বলে জানান তিনি।

এক কলসি ঘামের দামে এক কলসি পানি সংগ্রহ পাহাড়ি গ্রামবাসীর

১০৯ নম্বর সাপছড়ি মৌজার নারাইছড়ি গ্রামের কার্বারি খুলমোহন কার্বারি বলেন, প্রতিবছর গ্রীষ্ম মৌসুমে পানির জন্য পুরো গ্রামে হাহাকার সৃষ্টি হয়। কৃষিকাজ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। ছড়ার পানি পান করে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান তিনি।

রাঙামাটি জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী পরাগ বড়ুয়া বলেন, বর্তমানে জেলার ৫৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ মানুষ সুপেয় পানি সরবরাহ নেটওয়ার্কের আওতায় এসেছে। বাকি এলাকাগুলোতেও পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

এক কলসি ঘামের দামে এক কলসি পানি সংগ্রহ পাহাড়ি গ্রামবাসীর

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কৃষিবিদ কাজল তালুকদার বলেন, সমস্যা সমাধানে ঝর্ণাভিত্তিক জিএফএস (গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম), সোলার পাম্প এবং রুরাল পাইপ নেটওয়ার্ক সাপ্লাই স্কিমের মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি বনায়ন এবং ছড়ায় বাঁশ লাগানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের তথ্যমতে, রাঙামাটি জেলায় এখনো প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ সুপেয় পানি সরবরাহ ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে।

উল্লেখ্য, প্রতিবছর গ্রীষ্ম মৌসুমে পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম গ্রামগুলোতে পানির সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করে। জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে এই সংকট ক্রমেই বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed