লোডশেডিং ও বৈরী আবহাওয়ায় কক্সবাজার পর্যটনে ৫ কোটি টাকার আয় হ্রাসের আশঙ্কা
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”
![]()
তারেকুর রহমান, কক্সবাজার
দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজারে বৈরী আবহাওয়া ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে পর্যটন খাতে দেখা দিয়েছে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। নির্ধারিত সময়ের আগেই কক্সবাজার ছেড়ে যাচ্ছেন অনেক পর্যটক। কেউ কেউ আবার ভ্রমণ পরিকল্পনা স্থগিত করে বুকিং বাতিল করছেন। এর ফলে আবাসন, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, বিনোদন এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ পুরো পর্যটন অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, চলমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে পর্যটন খাতে প্রায় ৫ কোটি টাকার সম্ভাব্য আয় হারাতে পারে কক্সবাজার।
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল-গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম শিকদার বলেন, “বৈরী আবহাওয়া ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে গত কয়েক দিনে আনুমানিক ৫ থেকে ১০ হাজার পর্যটক তাদের নির্ধারিত সফর সংক্ষিপ্ত করেছেন কিংবা পূর্বনির্ধারিত বুকিং বাতিল করেছেন। সাধারণভাবে একজন পর্যটক কক্সবাজারে দুই থেকে তিন দিনের সফরে গড়ে প্রায় ১০ হাজার টাকা ব্যয় করেন। সে হিসেবে সফর বাতিল বা সংক্ষিপ্ত হওয়ার কারণে জনপ্রতি গড়ে ৫ হাজার টাকা ব্যয় কমে গেছে বলে ধরে নিলে পর্যটন সংশ্লিষ্ট খাতে আনুমানিক ২ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৫ কোটি টাকার সম্ভাব্য আয় হ্রাস পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এটি প্রাথমিক হিসাব এবং প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি বা কম হতে পারে।”
পর্যটন বিশ্লেষক আইয়ুব আলী জানান, সাধারণ ছুটির দিনে কক্সবাজারের হোটেল-মোটেলগুলোর গড় কক্ষ যেখানে ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ বুকিং থাকে, বর্তমানে তা নেমে এসেছে অর্ধেকের চেয়ে কম শতাংশে। একই সঙ্গে বেশ কয়েকটি হোটেলে অগ্রিম বুকিং বাতিল হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
পর্যটন ব্যবসায়ী করিম উল্লাহ বলেন , “পর্যটন মৌসুমে কক্সবাজারে আনুমানিক ৫০০ কোটির বেশি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, বিনোদন, কেনাকাটা ও ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতে এই অর্থ প্রবাহিত হয়। তবে গত কয়েকদিনের বৈরী পরিস্থিতির কারণে সেই লেনদেন উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।”
সরেজমিনে লাবণী, সুগন্ধা, কলাতলী ও ইনানী সৈকত এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও পর্যটকদের উপস্থিতি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কম। অনেক পর্যটক সৈকতে কিছু সময় কাটিয়ে দ্রুত হোটেলে ফিরে যাচ্ছেন। টানা বৃষ্টি ও মেঘলা আবহাওয়ার কারণে সমুদ্রস্নান, বিচ বাইক, ঘোড়ায় চড়া, প্যারাসেইলিং এবং অন্যান্য বিনোদন কার্যক্রমেও ভাটা পড়েছে।
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা পর্যটক সুব্রত দেব বলেন, “আমরা তিন দিনের পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু টানা বৃষ্টি ও বিদ্যুতের সমস্যার কারণে একদিন আগেই ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। শিশুদের নিয়ে বাইরে ঘোরাফেরা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।”
কুমিল্লার বুড়িচং থেকে আসা বেসরকারি কলেজের শিক্ষক হাবিবুর রহমান বলেন, “কক্সবাজার সব সময়ই আমাদের প্রিয় জায়গা। কিন্তু এবার এসে বেশিরভাগ সময় হোটেলেই থাকতে হয়েছে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। আবহাওয়াও অনুকূলে ছিল না।”
শরীয়তপুর থেকে আসা পর্যটক বেগম সামিরা হোসাইন বলেন, “সৈকতের সৌন্দর্য বর্ষাকালেও উপভোগ্য। তবে পর্যটকদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতি আরও ভালো হতো।”
পর্যটক কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সৈকতকেন্দ্রিক শ্রমজীবী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর। সৈকতের ফটোগ্রাফার, ঘোড়া ব্যবসায়ী, বিচ বাইক চালক, ভ্যানচালক, নারকেল বিক্রেতা, ঝিনুকপণ্যের ব্যবসায়ী ও অস্থায়ী দোকানিরা আয় কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
সৈকতের ঘোড়া ব্যবসায়ী সাদ্দাম হোসেন বলেন, “সাধারণ সময়ে দিনে প্রায় ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকা আয় হয়। বর্তমানে দিনে ৫০০ টাকা আয় করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।”
বিচ ফটোগ্রাফার ইয়াসিন উদ্দিন বলেন, “ছুটির দিনে যেখানে প্রচুর গ্রাহক পাওয়া যেত, এখন সারাদিন দাঁড়িয়ে থেকেও ৫ থেকে ৬ জনের বেশি পাওয়া যাচ্ছে না।”
ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী সৈয়দ আজম বলেন, “সাধারণ সময়ে দিনে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকার বিক্রি হয়। এখন অনেক দিন ১ হাজার ৫০০ টাকাও হয় না। পর্যটক কম থাকলে আমাদের আয়ও কমে যায়।”
কলাতলী এলাকার হোটেল ব্যবসায়ী মোহাম্মদ রফিক বলেন, “গত কয়েক দিনে অনেক অতিথি বুকিং বাতিল করেছেন। কেউ কেউ দুই রাতের পরিবর্তে এক রাত অবস্থান করে চলে যাচ্ছেন। ফলে প্রত্যাশিত আয় হচ্ছে না।”
ফ্রেশ সীফুড রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক নুরুল মোস্তফা সজীব বলেন, “পর্যটক কম থাকলে খাবারের বিক্রিও কমে যায়। বিশেষ করে রাতের বেলায় ব্যবসা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।”
পরিবহন খাতেও এর প্রভাব পড়েছে। কক্সবাজার-ঢাকা ও কক্সবাজার-চট্টগ্রাম রুটে যাত্রী চলাচল কমেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। এতে বাস, মাইক্রোবাস, রেন্ট-এ-কার ও স্থানীয় পরিবহনসেবার আয়ও কমে গেছে।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, “পর্যটন শিল্প কেবল হোটেল-মোটেল নির্ভর নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার মানুষের জীবিকা। পর্যটকের সংখ্যা কমে গেলে তার প্রভাব রিকশাচালক থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র দোকানি পর্যন্ত সবার ওপর পড়ে।”
তিনি বলেন, “একজন পর্যটকের ব্যয় শুধু হোটেলেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন, খাবার, কেনাকাটা, বিনোদন ও বিভিন্ন সেবাখাত মিলিয়ে একটি বড় অর্থনৈতিক চক্র তৈরি হয়। ফলে পর্যটক কমে যাওয়া মানে পুরো স্থানীয় অর্থনীতির গতি মন্থর হয়ে যাওয়া।”
এদিকে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় গভীর সঞ্চারণশীল মেঘমালা সৃষ্টি হওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চল কক্সবাজারের জন্য ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত জারি করেছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর।
কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান বলেন, “সোমবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে মোট ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আকাশে সঞ্চারণশীল মেঘের সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে আগামী সময়ে আরও বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।”
তিনি উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দা ও পর্যটকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে বলেন, “বজ্রপাতের সময় খোলা স্থান, সমুদ্রসৈকত ও উঁচু জায়গায় অবস্থান না করাই নিরাপদ।”
কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ.ন.ম. হেলাল উদ্দিন বলেন, “বর্ষাকালে কক্সবাজারে পর্যটকের সংখ্যা কিছুটা কমে যাওয়া স্বাভাবিক। তবে এবার লোডশেডিং পরিস্থিতি সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা গেলে এবং পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা গেলে বর্তমান পরিস্থিতির প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।”
পর্যটনসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আবহাওয়ার বৈরিতা সাময়িক হলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে আসন্ন ছুটির দিনগুলোতে পর্যটকের আগমন প্রত্যাশিত মাত্রায় না হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।