রাজস্থলীতে মা ও শিশুর গর্ভকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সেনাবাহিনীর উদ্যোগ, দুই সপ্তাহের প্রশিক্ষণ শুরু
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় সহায়তা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় রাঙামাটির রাজস্থলীতে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং প্রাথমিক চিকিৎসা বিষয়ে দুই সপ্তাহব্যাপী সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ শুরু করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। কাপ্তাই জোনের অধীন রাজস্থলী আর্মি ক্যাম্পের উদ্যোগে আয়োজিত এ প্রশিক্ষণকে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে সময়োপযোগী ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজস্থলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রশিক্ষণের উদ্বোধন করেন রাজস্থলী আর্মি ক্যাম্পের কমান্ডার মেজর হাফিজ আহমেদ।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নওশাদ খান, মেডিকেল অফিসার ডা. জিয়া উদ্দিনসহ স্থানীয় গর্ভবতী নারী ও মায়েরা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মেজর হাফিজ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং বিভিন্ন কল্যাণমূলক কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় রাজস্থলী উপজেলার গর্ভবতী নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং প্রাথমিক চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়াতে এই বিশেষ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, মা ও শিশুর সুস্বাস্থ্য একটি পরিবারের পাশাপাশি একটি সুস্থ ও সক্ষম সমাজের ভিত্তি। দুর্গম পার্বত্য এলাকার অনেক মানুষ ভৌগোলিক দূরত্ব ও যোগাযোগের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রয়োজনের সময় স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারেন না। এ কারণে স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা ও প্রাথমিক চিকিৎসার ধারণা তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেনাবাহিনীর এ ধরনের উদ্যোগ মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসচেতনতা পৌঁছে দিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
দুই সপ্তাহব্যাপী প্রশিক্ষণে গর্ভকালীন সময়ে মায়ের স্বাস্থ্য ও পরিচর্যা, প্রয়োজনীয় পুষ্টি, নিরাপদ মাতৃত্ব, মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা, সাধারণ রোগবালাই থেকে প্রতিরোধের উপায় এবং জরুরি পরিস্থিতিতে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানের বিষয়ে অংশগ্রহণকারীদের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হবে।

বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় কোন ধরনের শারীরিক পরিবর্তন স্বাভাবিক, কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিকভাবে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত—এসব বিষয়ে ব্যবহারিক জ্ঞান দেওয়া হবে প্রশিক্ষণে। একই সঙ্গে নবজাতক ও শিশুদের প্রাথমিক পরিচর্যা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে মায়েদের সচেতন করা হবে।
স্থানীয় চিকিৎসকদের মতে, পার্বত্য অঞ্চলে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসুরক্ষায় শুধু হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্রের ওপর নির্ভর না করে পরিবার ও স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে দুর্গম এলাকার নারীরা অনেক সময় সময়মতো চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেন না। ফলে গর্ভকালীন জটিলতা চিহ্নিত করা, শিশুর অসুস্থতার প্রাথমিক লক্ষণ বোঝা এবং জরুরি সময়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার মতো বিষয়ে প্রশিক্ষণ থাকলে স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রাজস্থলী আর্মি ক্যাম্পের এ উদ্যোগ শুধু একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নয়; বরং দুর্গম পার্বত্য জনপদে স্বাস্থ্যসচেতনতা তৈরির একটি কার্যকর সামাজিক বিনিয়োগ। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মায়েরা নিজেদের পাশাপাশি পরিবারের অন্য সদস্যদেরও স্বাস্থ্যবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানাতে পারবেন। এতে ধীরে ধীরে একটি পরিবার থেকে বৃহত্তর সমাজে স্বাস্থ্যসচেতনতার পরিধি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দায়িত্ব শুধু নিরাপত্তা কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্যোগকালীন সহায়তা এবং বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও সেনাবাহিনীর নিয়মিত অংশগ্রহণ রয়েছে। রাজস্থলীতে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই প্রশিক্ষণ সেই ধারাবাহিকতারই আরেকটি উদাহরণ।
স্থানীয় অংশগ্রহণকারীরা জানান, গর্ভকালীন পরিচর্যা ও শিশুদের স্বাস্থ্য বিষয়ে অনেক সময় প্রয়োজনীয় তথ্য জানা না থাকায় পরিবারগুলো নানা সমস্যার মুখোমুখি হয়। সেনাবাহিনীর উদ্যোগে এমন প্রশিক্ষণের সুযোগ পাওয়ায় তারা উপকৃত হবেন বলে আশা করছেন।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীরা গর্ভবতী মা ও শিশুদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা, পুষ্টি ও পরিচর্যার বিষয়ে আরও দক্ষ ও সচেতন হয়ে উঠবেন। একই সঙ্গে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রাথমিক ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতাও তৈরি হবে।
স্থানীয়দের মতে, নিরাপদ মাতৃত্ব ও সুস্থ শিশুর জন্য স্বাস্থ্যসেবা যেমন জরুরি, তেমনি স্বাস্থ্য বিষয়ে সঠিক জ্ঞান ও সচেতনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দুর্গম রাজস্থলীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এ ধরনের উদ্যোগ সেই প্রয়োজন পূরণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা ও সম্প্রীতির সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করবে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।