পর্যটকদের ভিড়ে মুখর রাঙামাটি, বিনোদনহীনতায় ছুটির বিকেল কাটছে শহরবাসীর

পর্যটকদের ভিড়ে মুখর রাঙামাটি, বিনোদনহীনতায় ছুটির বিকেল কাটছে শহরবাসীর

পর্যটকদের ভিড়ে মুখর রাঙামাটি, বিনোদনহীনতায় ছুটির বিকেল কাটছে শহরবাসীর
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

পাহাড় আর কাপ্তাই লেকের অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে বছরজুড়েই রাঙামাটিতে ভিড় জমান হাজারো পর্যটক। দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীদের হাঁকডাক ও কলরবে মুখর থাকে পর্যটন শহরের অলিগলি। পর্যটকদের পদচারণায় যেখানে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে শহরের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রগুলো, সেখানে অন্যদের আনন্দের খোরাক জোগানো এই শহরের স্থায়ী বাসিন্দাদের ছুটির বিকেলগুলো কাটছে চরম একঘেয়েমি ও বিনোদনহীনতায়।

৬ হাজার ১১৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের রাঙামাটিতে প্রায় সাত লাখ মানুষের বসবাস। জেলার বিভিন্ন প্রান্তে রয়েছে শতাধিক পর্যটনকেন্দ্র। তবে এসব পর্যটনকেন্দ্রের বড় একটি অংশ মূলত বাইরের দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করার বিষয়টিকে সামনে রেখে পরিচালিত হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য উন্মুক্ত ও স্বস্তিদায়ক বিনোদনের সুযোগ দিন দিন সীমিত হয়ে আসছে বলে অভিযোগ শহরবাসীর।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শহরের মূল পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ছুটির দিনসহ প্রায় প্রতিদিনই পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাণিজ্যিক পরিবেশ ও টিকিটনির্ভর বিনোদনব্যবস্থা। ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সেখানে গিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে সময় কাটানোর সুযোগ কম। বাধ্য হয়ে বিকেল হলে অনেকেই লেক ভিউ গার্ডেন, পলওয়েল পার্ক কিংবা আসামবস্তি-কাপ্তাই সড়ক ধরে কাপ্তাই লেকের পাড়ের কোনো খোলা জায়গায় গিয়ে বসেন। তবে বিশাল এই পর্যটন আয়োজনের মধ্যে স্থানীয় অধিবাসীদের কথা বিবেচনা করে সুনির্দিষ্ট সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দাবি তাদের।

নগরের বয়োজ্যেষ্ঠ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাঙামাটিতে সাধারণ মানুষের জন্য মুক্ত বিনোদনের স্থান সংকুচিত হয়ে আসছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিশু ও তরুণদের ওপর। পর্যাপ্ত মাঠ, খেলার জায়গা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ না থাকায় শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে তরুণদের একটি অংশ অবসর কাটাতে অতিরিক্ত সময় মোবাইল গেমে ব্যয় করছে এবং কেউ কেউ নানা সামাজিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা সীমা ত্রিপুরা বলেন, ‘বাসায় থাকতে থাকতে মন খারাপ হয়ে যায়। তখন বাইরে বের হতে ইচ্ছে করলেও কোথায় যাব, সেটি চিন্তা করতে করতেই আর বের হওয়া হয় না। স্থানীয়দের ঘুরে বেড়ানোর জন্য কিংবা শিশুদের জন্য তেমন কোনো জায়গা নেই। যা আছে, সেখানেও আবার উপযুক্ত পরিবেশ নেই।’

পর্যটকদের ভিড়ে মুখর রাঙামাটি, বিনোদনহীনতায় ছুটির বিকেল কাটছে শহরবাসীর

স্থানীয় আরেক অভিভাবক মো. ইসহাস হোসেন বলেন, ‘শহরে উন্মুক্ত খোলা জায়গা নেই। সবগুলো টিকিট করে ফেলার কারণে বসে সময় কাটানোর মতো জায়গাও নেই। আবার আসামবস্তি-কাপ্তাই সড়কে কিছুটা নিরিবিলি পরিবেশ থাকলেও সন্ধ্যার পর সেখানে বেশিক্ষণ থাকা যায় না। আমাদের শহরবাসীর জন্য জেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসন কিছু একটা করুক—তাদের কাছে এটাই কামনা।’

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, কেবল পর্যটককেন্দ্রিক উন্নয়ন কোনো শহরকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করে তুলতে পারে না। একটি পর্যটন শহরের উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা, মানসিক সুস্থতা, শিশুদের বেড়ে ওঠা এবং নাগরিকদের বিনোদনের অধিকারকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। পর্যটন শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য উন্মুক্ত পার্ক, খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও কমিউনিটি স্পেস নিশ্চিত করা গেলে রাঙামাটি আরও পরিপূর্ণ ও আধুনিক পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে উঠবে বলে মনে করছেন তারা।

রাঙামাটি প্রেসক্লাবের সভাপতি আনোয়ারুল হক বলেন, একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন নগরী গড়ে তুলতে হলে পর্যটকদের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ও বিনোদনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তাদের জন্য আলাদা পার্ক, গণপাঠাগার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং উন্মুক্ত কমিউনিটি স্পেস তৈরি করা জরুরি। স্থানীয় মানুষ যদি নিজের শহরেই স্বাচ্ছন্দ্যে সময় কাটানোর সুযোগ না পান, তাহলে সেই শহরের পর্যটন উন্নয়নও পূর্ণাঙ্গ বলা যায় না।

স্থানীয়দের অভিযোগ ও নাগরিক সমাজের দাবির বিষয়ে রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, জেলা প্রশাসনের আওতাধীন পার্ক ও বিনোদনকেন্দ্রগুলোকে আরও আধুনিক করার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার সরাসরি এসবের দায়িত্ব নিলে পর্যটন ব্যবস্থার পাশাপাশি স্থানীয়দের সুযোগ-সুবিধাও বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব হবে।

অন্যদিকে, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দীপন তালুকদার স্থানীয়দের জন্য বিনোদনের সুযোগ বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘রাঙামাটিকে শুধু পর্যটকদের কেন্দ্র নয়, বরং স্থানীয় অধিবাসীদের বসবাসের উপযোগী ও আনন্দদায়ক শহর হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা পরিষদ বেশ কিছু নতুন বিনোদনমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিচ্ছে। আশা করছি, খুব দ্রুতই শহরবাসী এর সুবিধা ভোগ করতে পারবে।’

পাহাড়, লেক আর সবুজের অপূর্ব সমন্বয়ে রাঙামাটি দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য হলেও শহরটির প্রকৃত সৌন্দর্য ও সাফল্য শুধু পর্যটকের সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। পর্যটনের অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের অবসর, বিনোদন ও স্বস্তির জায়গা নিশ্চিত করা গেলে তবেই রাঙামাটি একটি সত্যিকারের বাসযোগ্য পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।