মেঘ-কুয়াশার আড়ালে কির্সতং, যেখানে প্রতিটি বাঁকে পাহাড়ের হাতছানি

মেঘ-কুয়াশার আড়ালে কির্সতং, যেখানে প্রতিটি বাঁকে পাহাড়ের হাতছানি

মেঘ-কুয়াশার আড়ালে কির্সতং, যেখানে প্রতিটি বাঁকে পাহাড়ের হাতছানি
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

মেঘে ঢাকা পাহাড়চূড়া। চারপাশে গহিন অরণ্য। কখনো কুয়াশার চাদরে হারিয়ে যায় পুরো পাহাড়, আবার কখনো মেঘ সরতেই চোখের সামনে খুলে যায় সবুজের বিস্তীর্ণ রাজ্য। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ ধরে যতই এগিয়ে যাওয়া যায়, ততই বদলে যেতে থাকে চারপাশের দৃশ্যপট। কোথাও শতবর্ষী গাছের সারি, কোথাও ঝিরির স্বচ্ছ জল, আবার কোথাও নীরব জঙ্গলের ভেতর হঠাৎ পাখির ডাকে ভেঙে যায় নিস্তব্ধতা। এই দুর্গম, অথচ অপার সৌন্দর্যের নাম কির্সতং পাহাড়।

বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দুর্গম এই পাহাড় এখন ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠছে পাহাড়প্রেমী ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের কাছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার ৯০০ ফুট উচ্চতায় চিম্বুক রেঞ্জের সর্বোচ্চ চূড়ায় কির্সতংয়ের অবস্থান। এখানে পৌঁছানোর পথ যেমন দুর্গম, তেমনি পথজুড়ে প্রকৃতির বৈচিত্র্যও কম নয়। ফলে কির্সতংয়ে যাওয়ার আকর্ষণ শুধু চূড়ায় দাঁড়িয়ে পাহাড় দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সেখানে পৌঁছানোর প্রতিটি ধাপই যেন আলাদা এক অভিযানের গল্প।

স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে, ‘কির্সতং’ নামটি এসেছে মারমা ভাষা থেকে। ‘কির্স’ বলতে একটি বিলুপ্তপ্রায় পাখি এবং ‘তং’ বলতে পাহাড় বোঝানো হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় পাহাড়ের চূড়ায় ওই বিরল পাখির দেখা মিলত। ধনেশ পাখির আবাসস্থল হিসেবেও কির্সতং একসময় পরিচিত ছিল। এখনো পাহাড়ের পথে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও বন্যপ্রাণীর দেখা মেলে বলে জানান স্থানীয়রা।

কির্সতংয়ের প্রকৃত আকর্ষণ লুকিয়ে আছে এর গহিন অরণ্যে। বিশাল গাছপালা, পাহাড়ি ঝিরি, কুয়াশায় ঢাকা বন আর প্রায় অক্ষত প্রাকৃতিক পরিবেশ মিলে এখানে তৈরি হয়েছে এক ভিন্ন জগৎ। শহুরে জীবনের কোলাহল থেকে অনেক দূরে এই পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে কখনো মনে হবে মেঘ যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়। আবার কখনো ঘন কুয়াশার কারণে কয়েক হাত দূরের পথও অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রকৃতির এই অনিশ্চয়তাই অভিযাত্রীদের কাছে কির্সতংয়ের রোমাঞ্চ আরও বাড়িয়ে দেয়।

কির্সতংয়ের চূড়ায় যেতে হলে অবশ্য শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি থাকা জরুরি। আলীকদম থেকে পানবাজার হয়ে মোটরসাইকেলে প্রায় ২১ কিলো এলাকায় পৌঁছানোর পর শুরু হয় মূল ট্রেকিং। সেখান থেকে তিন্দুর রাস্তা ধরে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতে হয় খেমচং পাড়ায়। সাধারণত এখানেই অভিযাত্রীরা রাতযাপন করে পরদিন ভোরে চূড়ার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন।

মেঘ-কুয়াশার আড়ালে কির্সতং, যেখানে প্রতিটি বাঁকে পাহাড়ের হাতছানি

খেমচং পাড়া থেকে কির্সতংয়ের চূড়ায় পৌঁছাতে আরও প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা ট্রেকিং করতে হয়। এই পথের বড় একটি অংশ গহিন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে। কখনো খাড়া পাহাড়ি পথ, কখনো পাথুরে ঢাল, আবার কখনো ঝিরিপথ পেরিয়ে এগোতে হয়। বিশেষ করে ভোরের কুয়াশায় জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাঁটার অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই হয়ে ওঠে পুরো অভিযানের সবচেয়ে স্মরণীয় অংশ। দুর্গমতার কারণে কির্সতং জয় করতে ধৈর্য, শারীরিক সক্ষমতা এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতি প্রয়োজন।

কির্সতং ভ্রমণের আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ ম্রো জনগোষ্ঠীর জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে কাছ থেকে পরিচিত হওয়ার সুযোগ। পাহাড়ের ছোট ছোট পাড়ায় তাদের ঐতিহ্যবাহী ঘরবাড়ি, জীবনযাপন ও সংস্কৃতি ভ্রমণকারীদের সামনে খুলে দেয় এক ভিন্ন বাস্তবতা। প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা এই জনপদে কিছু সময় কাটানো কির্সতং অভিযানের অভিজ্ঞতাকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তোলে।

খেমচং পাড়ায় পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা সাধারণত স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘরেই করা হয়। বাঁশ ও কাঠের তৈরি মাচাংঘরে রাত কাটানো, চারপাশের পাহাড়ি নীরবতা আর ভোরে পাখির ডাকে ঘুম ভাঙার অভিজ্ঞতা শহুরে পর্যটনের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে তাদের ঘরেই খাবারের ব্যবস্থাও করা যায়। সাধারণত ভাত, পাহাড়ি মুরগি, ডাল ও আলু ভর্তার মতো খাবার পাওয়া যায়। তবে আগে থেকেই গাইড বা স্থানীয় বাসিন্দাদের জানিয়ে রাখলে খাবারের ব্যবস্থা করা সহজ হয়। দীর্ঘ ট্রেকিংয়ের কথা মাথায় রেখে সঙ্গে শুকনা খাবার ও পর্যাপ্ত পানি রাখার পরামর্শ দেন অভিজ্ঞরা।

কির্সতং ভ্রমণের জন্য নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়কে তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক মনে করা হয়। এ সময় পাহাড়ি পথ সাধারণত অপেক্ষাকৃত শুষ্ক থাকায় ট্রেকিং কিছুটা সহজ হয়। তবে বর্ষার শেষদিকে কির্সতংয়ের সৌন্দর্য যেন অন্য রূপ নেয়। চারপাশের সবুজ আরও ঘন হয়ে ওঠে, পাহাড়ের গায়ে মেঘ-কুয়াশা জমে থাকে দীর্ঘ সময়। তবে একই সঙ্গে বাড়ে ঝুঁকিও। বৃষ্টিতে পাহাড়ি পথ পিচ্ছিল হয়ে যায়, ঝিরিতে পানি বাড়ে এবং জোঁকের উপদ্রবও দেখা দিতে পারে। তাই বর্ষাকালে কির্সতং অভিযানে বাড়তি প্রস্তুতি প্রয়োজন।

মেঘ-কুয়াশার আড়ালে কির্সতং, যেখানে প্রতিটি বাঁকে পাহাড়ের হাতছানি

কির্সতং যেতে হলে প্রথমে বান্দরবানের আলীকদমে পৌঁছাতে হবে। ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে আলীকদম যাওয়া যায়। বিকল্প হিসেবে ঢাকা থেকে চকরিয়া গিয়ে সেখান থেকে স্থানীয় পরিবহনে আলীকদম পৌঁছানো যায়। আলীকদম বাসস্ট্যান্ড থেকে অটোরিকশায় পানবাজার এবং সেখান থেকে মোটরসাইকেল বা জিপে ২১ কিলো এলাকায় যেতে হয়। এরপর শুরু হবে দীর্ঘ পাহাড়ি পদযাত্রা। দুর্গম ও অপরিচিত পথ হওয়ায় স্থানীয় গাইড সঙ্গে নেওয়াকে গুরুত্ব দেন অভিজ্ঞরা।

তবে কির্সতংয়ের মতো দুর্গম এলাকায় ভ্রমণের আগে স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা, নিরাপত্তাবিধি এবং ওই এলাকার সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে পাহাড়ি পরিবেশে ভ্রমণের সময় প্লাস্টিক বা অপচনশীল বর্জ্য না ফেলা, বনজ সম্পদের ক্ষতি না করা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনধারা ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখানোও জরুরি।

কির্সতংয়ের আসল সৌন্দর্য হয়তো চূড়ায় দাঁড়িয়ে দেখা কোনো একটি দৃশ্যের মধ্যে আটকে নেই। এর সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে পুরো পথজুড়ে—কুয়াশায় হারিয়ে যাওয়া বনপথে, পাহাড়ি ঝিরির শব্দে, মাচাংঘরের রাতের নীরবতায়, ম্রো পাড়ার সহজ জীবনযাপনে কিংবা ভোরের মেঘ সরার মুহূর্তে হঠাৎ দৃশ্যমান হয়ে ওঠা পাহাড়চূড়ায়। তাই কির্সতং কেবল একটি পাহাড়ের নাম নয়; প্রকৃতির আরও কাছে যাওয়ার, নিজের সীমা পরীক্ষা করার এবং পাহাড়ের ভিন্ন এক জীবনকে কাছ থেকে অনুভব করার একটি দীর্ঘ অভিযানের নাম।

তবে এই সৌন্দর্য টিকিয়ে রাখার দায়িত্বও ভ্রমণকারীদের। কির্সতংকে যদি দায়িত্বহীন পর্যটনের চাপে নষ্ট না করে প্রকৃতি ও স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পর্যটন বিকশিত করা যায়, তাহলে মেঘ-কুয়াশায় ঢাকা এই দুর্গম পাহাড় ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের জন্য আরও আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *