একঘরে নীতির অবসান: জান্তা সরকারের সঙ্গে সরাসরি সংলাপে যুক্তরাষ্ট্র

একঘরে নীতির অবসান: জান্তা সরকারের সঙ্গে সরাসরি সংলাপে যুক্তরাষ্ট্র

একঘরে নীতির অবসান: জান্তা সরকারের সঙ্গে সরাসরি সংলাপে যুক্তরাষ্ট্র
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারকে একঘরে করে রাখার যে কূটনৈতিক নীতি ওয়াশিংটন অনুসরণ করে আসছিল, তা থেকে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন এনেছে ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন নীতিতে এক নাটকীয় উল্টোরথ টেনে দেশটির সামরিক সরকারের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন কর্মকর্তা এবং বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৭ জন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার সূত্রে জানা গেছে, এই আকস্মিক পদক্ষেপে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের গোয়েন্দা ও গবেষণা সংক্রান্ত অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মাইকেল ভ্যান্স। ওয়াশিংটনের প্রাথমিক উদ্দেশ্য মার্কিন নাগরিকদের লক্ষ্য করে পরিচালিত সাইবার কেলেঙ্কারি ও স্ক্যাম সেন্টার বন্ধ করা হলেও, এই আলোচনার পথ ধরে মিয়ানমারের বিরল মৃত্তিকা খনিজ (রেয়ার-আর্থ মিনারেল) উত্তোলনের মতো বিস্তৃত খাতে যৌথ সহযোগিতার নতুন দুয়ার খুলতে পারে।

নেপিডোতে শীর্ষ বৈঠক ও একজন মার্কিন নাগরিকের মুক্তি

গত ১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে জান্তা প্রধান ও স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে অংশ নেন মাইকেল ভ্যান্স। চারজন কর্মকর্তার মতে, মিয়ানমারে আটক মার্কিন ব্যবসায়ী অ্যাডাম কাস্টিলোকে মুক্ত করাই ছিল ওই বৈঠকের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য, তবে এটি দুই দেশের মধ্যে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে যোগাযোগের পথ তৈরি করে দিয়েছে।

সামরিক অভ্যুত্থানের পর এটিই ছিল দুদেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগ। এর মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি যে গণতন্ত্র প্রচারের চেয়ে লেনদেনভিত্তিক ও স্বার্থকেন্দ্রিক আলোচনার দিকে ঝুঁকছে, তা পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। উল্লেখ্য, আগস্ট মাসে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান ভ্যান্স। মিয়ানমার নীতিতে তার এই অগ্রণী ভূমিকা ও উপস্থিতির কথা এর আগে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পায়নি।

নিষেধাজ্ঞায় জান্তা প্রধান, অব্যাহত বিমান হামলা

জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। এমন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি আলোচনায় বসার এই উদ্যোগ সামনে এলো। ২০১৭ সালে রাখাইনে অবস্থানরত শত শত হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম হত্যা ও গণহত্যার দায়ে ওয়াশিংটন এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।

ভ্যান্সের নেপিডো সফরের দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে রাখাইন রাজ্যের এক জনবহুল বাজারে সামরিক বাহিনী বিমান হামলা চালিয়ে অন্তত ৫০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করে এবং বহু মানুষকে আহত করে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কার্যালয়।

বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট এক বিবৃতিতে বলেন, ‘মার্কিন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট যেকোনো বিষয়ে আমরা মিয়ানমারের সব পক্ষের সঙ্গেই যুক্ত আছি। একই সঙ্গে সহিংসতা বন্ধ ও রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির বিষয়টিতে আমরা জোর দিচ্ছি।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘সমস্যাকে এড়িয়ে গিয়ে কোনো সমাধান সম্ভব নয়; সমস্যার মুখোমুখি হয়েই সমাধান করতে হয়।’

তবে সামরিক জান্তার এক মুখপাত্রের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। মিন অং হ্লাইং নির্বাচনের জালিয়াতির অজুহাতে অভ্যুত্থান ঘটানোকে সঠিক বলে দাবি করে আসছেন এবং তার বিরোধীদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের সরকারের বৈধতা পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মাইকেল ভ্যান্স মিয়ানমারের জটিল রাজনৈতিক ও সামরিক সংকটের সব পক্ষের সঙ্গেই দেখা করেছেন এবং নীতি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও নীতি বিশ্লেষকদের একাংশ এতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী, বিশ্লেষণের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে গোয়েন্দা প্রধানরা সরাসরি নীতি নির্ধারণে অংশ নেন না।

ব্যবসায়ী কাস্টিলোর আটক এবং নেপথ্যের কূটনৈতিক দুয়ার

মিয়ানমারে আমেরিকান চেম্বার অফ কমার্সের সাবেক প্রধান অ্যাডাম কাস্টিলোকে গত ১১ জুন ইয়াঙ্গুন বিমানবন্দর থেকে আটক করে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। তার সমর্থকদের দাবি, বানোয়াট অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছিল। কাস্টিলোকে বেআইনিভাবে আটক করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে মার্কিন সরকার কোনো মন্তব্য করেনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কাস্টিলোর মুক্তির জন্য হোয়াইট হাউস, জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তারা মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের সাথে গোপনে ও পর্দার আড়ালে আলোচনা চালান। এক কর্মকর্তা জানান, এর বিনিময়ে মিয়ানমার কেবল মার্কিন সরকারের সাথে ‘উপযুক্ত স্তরে প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক বৈঠকের’ দাবি জানিয়েছিল। মুক্তি পাওয়ার পর কাস্টিলো তার মুক্তির পুরো কৃতিত্ব প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেন।

নেপিডো বৈঠকের আগে গত জুন মাসে টোকিওতে মার্কিন ও মিয়ানমার কর্মকর্তাদের মধ্যে আরেকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে মাইকেল ভ্যান্স উপস্থিত ছিলেন। সেই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট, ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এবং পেন্টাগনের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন। এছাড়া এশীয় বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে ভ্যান্স মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি বিরোধী পক্ষ ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও ভার্চুয়ালি ও সরাসরি আলোচনা করেছেন।

সাইবার স্ক্যাম ও দুর্লভ খনিজ সম্পদ

যুক্তরাষ্ট্রের এই যোগাযোগের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হলো মিয়ানমারের ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত ডেটিং ও রোমান্স জালিয়াতি কেন্দ্রগুলো বন্ধ করা, যার ফাঁদে পড়ে আমেরিকানরা শত শত কোটি ডলার হারিয়েছেন। এফবিআই ইতোমধ্যে সরাসরি জান্তা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এসব সাইবার অপরাধ দমনে যোগাযোগ করেছে। তবে গবেষকরা বলছেন, এসব জালিয়াতি কেন্দ্র মূলত মিলিশিয়া নিয়ন্ত্রিত এলাকায় পরিচালিত হয় এবং লভ্যাংশের একটি অংশ সামরিক বাহিনীর কাছে যায়। ফলে জান্তা প্রধানরা এগুলো বন্ধে কতটা আন্তরিক তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

পাশাপাশি, ইলেকট্রিক যানবাহন ও উইন্ড টারবাইন তৈরির অন্যতম প্রধান উপাদান ‘হেভি রেয়ার-আর্থ’ খনিজের বিষয়েও নজর দিচ্ছে ওয়াশিংটন। চীন থেকে নিজেদের সরবরাহ ব্যবস্থা সরিয়ে আনার অংশ হিসেবে ওয়াশিংটন মিয়ানমারের খনিজের দিকে নজর রাখলেও এটি সহজ নয়। কারণ অধিকাংশ খনিজ এলাকা জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং প্রধান আমদানিকারক চীন ওয়াশিংটনের এই উপস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখতে পারে।

কঠোর নিষেধাজ্ঞা থেকে নমনীয় নীতি

২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর বাইডেন প্রশাসন নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা মিয়ানমারের সম্পত্তি ফ্রিজ করে এবং জান্তা কর্মকর্তা ও সামরিক সংস্থাসমূহের ওপর নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ২০২২ সালে মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন পেয়ে বিরোধীদের জন্য বিমান হামলার আগাম সতর্কবার্তা ও সামরিক কর্মকর্তাদের দলত্যাগে উৎসাহিত করতে অনুদান দেওয়া শুরু হয়েছিল।

তবে গত বছর ট্রাম্প প্রশাসনের বৈদেশিক সাহায্য পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় এসব সহায়তা প্রকল্পের বেশিরভাগই ছেঁটে ফেলা হয়। তবে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট দাবি করেছে, জান্তা সরকারের সাথে আলোচনা অন্য বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটাবে না এবং সামরিক নিয়ন্ত্রণের বাইরেও মার্কিন সহায়তা বজায় থাকবে।

ট্রাম্প প্রশাসনের এই নীতি বদলের তীব্র সমালোচনা করেছেন মার্কিন হাউজের ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য গ্রেগরি মিকস। তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এই পদক্ষেপ আমাদের নীতি ও মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থী। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কংগ্রেসে অনুমোদিত নিষেধাজ্ঞা ও গণতন্ত্র তহবিলের বরাদ্দ কার্যকর না করে এই খুনি শাসনব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক বৈধতা দিচ্ছেন।’

অন্যদিকে, ওয়াশিংটনে প্রভাব খাটাতে মিয়ানমার সরকার মোটা অঙ্কের লবিস্ট নিয়োগ করেছে। ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের উপদেষ্টা রজার স্টোন গত এপ্রিল মাসে মিয়ানমারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষে লবিং ফার্ম ডিসিআই গ্রুপের কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ শুরু করেছেন।

গত জুনে ডিচিআই তাদের একটি নিউজলেটারে সতর্ক করে জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র যদি মিয়ানমারের সাথে সম্পর্ক বজায় না রাখে, তবে তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই খনিজ সম্পদের বাজারে প্রবেশের অধিকার হারাবে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *