পরমানু দিয়ে অস্ত্র নয়, হবে বিদ্যুৎ উৎপাদন- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
![]()
নিউজ ডেস্ক
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করা হয়েছে। পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন প্রকল্পের এ কার্যক্রম বেলা ১২টার দিকে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, “পরমানু দিয়ে অস্ত্র নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায় বাংলাদেশ”। দক্ষিণাঞ্চলে আরো একটি পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা আছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি আরো বলেন, “সরাসরি উপস্থিত থাকতে পারলে অনেক ভালো লাগতো। কিন্তু সেটা সম্ভব হলো না। আমি এই রিয়্যাক্টর প্রেসার ভেসেল স্থাপনের অনুমতি দিচ্ছি। এরপরই রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হয়”।
ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার কারণে ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠানে যোগদান করতে পেরেছেন- এমন মন্তব্য করে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “পাকিস্তান শুধু জমি দিয়েছে, কিন্তু রূপপুরে বরাদ্দ টাকা তারা নিয়ে যায় পশ্চিম পাকিস্তানে”।
তিনি বলেন, “৭০ এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের দাবি তোলেন৷ স্বাধীনতার পর তিনি আইএর সঙ্গে চুক্তি করেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সব থেমে যায়। এরপরের শাসকরা এ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার যোগ্য ছিলো না, নিতেও চায়নি”।
শেখ হাসিনা বলেন, “২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে আবার এ প্রকল্প এগিয়ে নেয়। ২০০৯ সালে আবার ক্ষমতায় এসে তার সরকার রাশিয়ার সহযোগিতায় রূপপুর প্রকল্পকে চূড়ান্ত রূপ দেয়”।
আজ স্থাপন করা হলো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের হৃৎপিণ্ড হিসেবে পরিচিত রিঅ্যাক্টর প্রেশার ভেসেল বা পরমাণু চুল্লিপাত্র। এটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল যন্ত্র। এর মধ্যেই শক্তি উৎপাদন হবে, যা কাজে লাগিয়ে তৈরি করা হবে বিদ্যুৎ।
এর আগে শনিবার প্রকল্প এলাকা ঘুরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।
ইয়াফেস ওসমান জানিয়েছিলেন, করোনা মহামারির মধ্যেও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকাজের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। সেজন্য যথাসময়ে নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর প্রেশার ভেসেল স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের পাশাপাশি দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও এগিয়ে চলছে। মহামারিতে একদিনের জন্যও কাজে কোনো বিঘ্ন ঘটেনি।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. শৌকত আকবর জানিয়েছিলেন, নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর প্রেশার ভেসেল স্থাপনের মাধ্যমে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে প্রকল্পের কাজ। শিডিউল অনুযায়ী নির্ধারিত সময়েই কাজ শেষ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন তিনি।
প্রকল্প সংশ্নিষ্টরা জানান, সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিয়ে রুশ নকশায় রূপপুরে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার ভিভিআর-প্রযুক্তির রিঅ্যাক্টরের দুটি ইউনিট তৈরি হবে। শিডিউল অনুসারে ২০২৩ সালে ইউনিট-১ ও ২০২৪ সালের ইউনিট-২ চালুর কথা রয়েছে।
২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রোসাটম রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পের প্রাথমিক চুক্তিটি ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে স্বাক্ষরিত হয়।
প্রকল্প সূত্র জানায়, এই রিঅ্যাক্টর প্রেশার ভেসেলটি রাশিয়া থেকে জলপথে ১৪ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে গত বছরের অক্টোবরে বাংলাদেশে পৌঁছে। সেটি স্থাপন করার জন্য গত এক বছর প্রয়োজনীয় বিভিন্ন অবকাঠামো প্রস্তুত করা হয় প্রকল্প এলাকায়।
জানা যায়, রূপপুর প্রকল্প এলাকায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় আয়োজিত উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রী। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রসাটমের প্রধান নির্বাহী আলেপি লিখাচোভ ও এটমস্ট্রয় এপপোর্ট গ্রুপ অব কোম্পানিজের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লকসিন।
রূপপুর কর্তৃপক্ষ বলছে, রাশিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি তৈরি হচ্ছে। এগুলো সময়মতো প্রকল্প এলাকায় পৌঁছানো হচ্ছে। আগামী বছরের জুনের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সব যন্ত্রপাতি দেশে চলে আসবে। দেশেও প্রতিটি কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক। দিনে সর্বোচ্চ ১৮ হাজার লোক কাজ করার কথা থাকলেও রূপপুরে ২৫ থেকে ২৬ হাজার কর্মী কাজ করছেন প্রতিদিন।
২০২৩ সালের এপ্রিলে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে চায় রূপপুর কর্তৃপক্ষ। আর ২০২৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে।