আন্তঃকোন্দলে চার ইউপিডিএফ কর্মী খুন: বাজার বর্জনে বিপাকে পানছড়ির ব্যবসায়ীরা - Southeast Asia Journal

আন্তঃকোন্দলে চার ইউপিডিএফ কর্মী খুন: বাজার বর্জনে বিপাকে পানছড়ির ব্যবসায়ীরা

“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির অর্থ ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে গোলাগুলির ঘটনায় চার কর্মী খুনে জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন পাহাড়ের আঞ্চলিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী দল ইউপিডিএফের ডাকা টানা এক মাস খাগড়াছড়ির পানছড়ি বাজার বর্জন কর্মসূচির কারণে ক্রেতা না থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে শুক্রবার নতুন করে আরও এক মাস খাগড়াছড়ি জেলার উপজেলা সদরের এ বাজার বর্জনের ডাক দিয়েছে পাহাড়ের এই আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন।

উপজেলার প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র পানছড়ি বাজারে ছোট-বড় মিলিয়ে পাঁচ শতাধিক দোকানের ওপর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল প্রায় ৩০ হাজার মানুষ। বিগত এক মাসের আর্থিক ক্ষতি কীভাবে কাটিয়ে উঠবেন এ দুঃশ্চিন্তার মধ্যে নতুন করে আগামী আরও এক মাস ফের ‘বাজার বর্জনের’ ডাক অনেকটাই ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ বলে মন্তব্য করছেন ব্যবসায়ীরা।

প্রায় তিন দশক ধরে পানছড়ির বাজারের প্রাণকেন্দ্রে ব্যবসা করছেন হোটেল ব্যবসায়ী সুকুমার দত্ত। তিনি বলছিলেন, “এ অবস্থার মধ্যে কোনোদিন পড়ি নাই। এক মাস কোনো বেচাকেনা নাই। পাহাড়িরা বাজারে আসতেছে না। কর্মচারীদের বেতনও দিতে পারছি না।

“আমরা দোকান না খুলে পারছি না; আবার খুললেও সমস্যা হচ্ছে। দোকান খুললেই আট হাজার টাকা কর্মচারীদের বেতন দিতে হয়। কিন্ত বিক্রি তো নেই। এর মধ্যে আবার বাজার বর্জনের কর্মসূচি আসছে।”

পাহাড়ের নৃগোষ্ঠীর বাসিন্দারা তো বটেই; বাঙালিরাও খুব একটা বাজারে আসেন না বলে জানিয়ে একজন ব্যবসায়ী বলছিলেন, “এখানে ইউপিডিএফের ব্যাপক প্রভাব। তাই ভয়ে কেউ বাজারে আসেন না।”

তবে এ সমস্যা সমাধানে সমন্বিতভাবে কাজ করার কথা বলছেন খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার মুক্তা ধর। তিনি বলেন, “বাজার বয়কটের কারণে সাধারণ মানুষের ক্ষতি হচ্ছে এটা সত্য। আমরা তো চাইব না জনসাধারণের ক্ষতি হোক। সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”

গত ১১ ডিসেম্বর গভীর রাতে পানছড়ির লোগাং ইউনিয়নের দুর্গম অনিল পাড়ায় গোলাগুলিতে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ পিসিপির সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক বিপুল চাকমা, পিসিপির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি সুনীল ত্রিপুরা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম লিটন চাকমা ও ইউপিডিএফ সদস্য রুহিন বিকাশ ত্রিপুরা নিহত হন।

এ ঘটনার জন্য গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফকে দায়ী করা হলেও তারা তা অস্বীকার করে আসছে। ঘটনার পর হরতাল, সড়ক অবরোধের পাশাপাশি ১২ ডিসেম্বর থেকে এক মাসের জন্য পানছড়ি বাজার বর্জনের ঘোষণা দেয় ইউপিডিএফ।

হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অজ্ঞাত ১৫-২০ জনকে আসামি করে মামলা হলেও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। ‘এক মাস পরও খুনিদের গ্রেপ্তার না করায়’ বাজার বয়কট ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাড়িয়েছে ইউপিডিএফ। অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার না করলে এ কর্মসূচির মেয়াদ আরও বাড়ানো হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংগঠনটি।

হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার না করায় বাজার বয়কটের কর্মসূচি বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইউপিডিএফের জেলা সংগঠক অংগ্য মারমা। তিনি বলেন, “এত বড় একটা হত্যাকাণ্ডের ঘটনা হল অথচ কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তাই আমরা বাজার বয়কটের কর্মসূচি বাড়িয়েছি।”

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, এর আগেও তারা এমন সমস্যার মুখে পড়েছিলেন। ২০১৮ সালের ২০ মে থেকে ২০১৯ সালের ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত টানা ১১ মাস পানছড়ি বাজার দুই আঞ্চলিক সংগঠনের দ্বন্দ্বের কারণে বন্ধ ছিল। সেসময় ব্যবসায়ী ও সাধারণ কৃষকদের বাজারে আসতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল পাহাড়ের এই আঞ্চলিক সংগঠনের বিরুদ্ধে।

এবার ইউপিডিএফের টানা কর্মসূচিতে বাজারের ব্যবসায়ীরা পড়েছেন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে। তারা বলছেন, রোববার হাটের দিন তো বটেই; সাধারণ দিনেও বাজারে ক্রেতারা আসছেন না।

হাটের দিন আশপাশ থেকে পাহাড়ি-বাঙালিরা তাদের উৎপাদিত ফসল নিয়ে বাজারে আসেন। পাইকাররা সেই ফসল কিনে নেন। কিন্তু এখন হাট জমছে না। ফলে বাজারে ফসল আসা কমে গেছে; বাইরের পাইকাররা নেই। এতে বাজারের স্থায়ী ব্যবসায়ীরাও মার খাচ্ছেন। বাজারে দোকানপাট খোলা থাকলেও ব্যবসায়ীরা বসে থেকে অলস সময় কাটাচ্ছেন। যারা ছোটখাট ব্যবসা করে পরিবার চালান, তারা সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন।

তবে এসব বিষয় নিয়ে কেউ প্রকাশ্যে খুব বেশি একটা কথা বলতে চান না। তারা আকারে-ইঙ্গিতে ভয় আর আতঙ্কের কথা জানান। পানছড়ি বাজারের জননী স্টোর নামে একটি মুদি দোকানের মালিক অমর চন্দ্র দে বলেন, “এই বাজারের পরিস্থিতি খুব খারাপ। ব্যবসা-বাণিজ্য নাই। এমন পরিস্থিতি যে কর্মচারী আর দোকানের ভাড়া দিতেই কষ্ট হচ্ছে। “স্থানীয় উপজাতিরা তো বাজারে আসতেছে না। এ ধরনের পরিস্থিতি হলে আমরা কোথায় যাব? সমিতি থেকে ঋণ নিয়েছি সেগুলো কীভাবে পরিশোধ করব? আগে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা বিক্রি হত। এখন পাঁচ-ছয় হাজার টাকা হয়।”

কেন লোকজন বাজারে আসছে না জানতে চাইলে এই দোকানি সরাসরি উত্তর না দিয়ে তিনি বলেন, “সমস্যা সমাধানে আমরা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চাই।”

মা ফার্মেসির মালিক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম বলছিলেন, গত এক মাসে তার ব্যবসা মন্দা গেছে। আগে প্রতিদিন তিন থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করতে পারতেন। “অথচ আজকে হাটে দিন এখনও ৩০০ টাকাও বিক্রি করতে পারি নাই। আমরা তো পরিকল্পনা করছি বাজারের দোকান-পাট বন্ধ করে দেব। ব্যবসা না থাকলে দোকান খোলা রেখে কী লাভ।”

ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাজার বয়কটের কর্মসূচি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছিলেন, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব অন্য কোনো পন্থায় সমাধান করা হোক। সবাই বাজারে আসুক। অন্তত বাজারটা ভালভাবে চলুক।

পানছড়ি বাজার পরিচালনা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জয়প্রসাদ দেব বলেন, গত এক মাস বাজার বর্জনের ডাক দিয়েছিল ইউপিডিএফ। এখন আবার আরও একমাস বর্জনের সময় সীমা বাড়িয়েছে। এটা সবার জন্যই বিপদের। “আমরা ব্যাংক ও বিভিন্ন এনজিও থেকে টাকা নিয়ে ব্যবসা করছি। ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছি না। আগে এক-একটা হাটের দিন ৯-১০ কোটি টাকার মত লেনদেন হত। আর এখন এক কোটি টাকাও হয় না।”