নির্বাচন, পাহাড় ও আন্তর্জাতিক সতর্কতা: কাকতাল নয়, বরং পুনরাবৃত্ত ঝুঁকির ইঙ্গিত
![]()
মোঃ সাইফুল ইসলাম
গত বছরের আগস্ট–সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র যখন পার্বত্য চট্টগ্রাম ভ্রমণে তাদের নাগরিকদের জন্য সতর্কতা জারি করেছিল, তখন অনেকেই এটিকে নিয়মিত কনসুলার অ্যাডভাইসরি হিসেবেই দেখেছিলেন। কিন্তু ১১ সেপ্টেম্বর ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ স্টেট–ব্যুরো অফ কনসুলার অ্যাফেয়ার্সের সেই বিবৃতির কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পার্বত্য চট্টগ্রাম কার্যত অস্থিরতার আগুনে জড়িয়ে পড়ে। আজ নির্বাচন সামনে রেখে যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এফসিডিও) একই অঞ্চলে ভ্রমণ নিরুৎসাহিত করে নতুন নির্দেশনা জারি করায় সেই ‘কাকতালীয়তা’ প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
মার্কিন সতর্কতার পর খাগড়াছড়ি জেলা সদরে তথাকথিত একটি ধর্ষণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে সহিংসতার বিস্তার ঘটে, সেটি ছিল সুপরিকল্পিত ও সংগঠিত। পার্বত্য চুক্তিবিরোধী প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন ইউপিডিএফের ইন্ধনে অবরোধ, ১৪৪ ধারা ও নিরাপত্তা বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নেওয়া হয়। সেনাবাহিনীর গাড়িতে হামলা, গুইমারার রামসু বাজারে সশস্ত্র সহিংসতা, ইউপিডিএফ সদস্যদের গুলিতে তিনজন পাহাড়ির নিহত হওয়া, বাঙ্গালি ও পাহাড়ি উভয় সম্প্রদায়ের দোকানপাটে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ—সব মিলিয়ে এটি কোনো স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষ ছিল না; ছিল পরিকল্পিত বিশৃঙ্খলা।
এই অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপটে এখন যুক্তরাজ্যের সতর্কতাকে আলাদা করে দেখা যায় না। এফসিডিও স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, নির্বাচন উপলক্ষে ২২ জানুয়ারি থেকে প্রচারণা শুরুর পরবর্তী সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণ না করতে। কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেছে সহিংসতা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ‘নিয়মিত খবর’। কূটনৈতিক ভাষায় বলা এই বাক্যটির অর্থ বাস্তবে আরও গভীর।
পার্বত্য চট্টগ্রামে নির্বাচন মানেই শুধু ভোটগ্রহণ নয়; এটি দীর্ঘদিনের অস্ত্র, চাঁদাবাজি, আধিপত্য ও পরিচয় রাজনীতির একটি সংবেদনশীল মুহূর্ত। নির্বাচন সামনে এলে একটি নির্দিষ্ট মহল সবসময় ‘ভিক্টিম ন্যারেটিভ’ তৈরির চেষ্টা করে; যেখানে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো অঞ্চলকে অশান্ত করার চেষ্টা হয়। গতবার যেমন তথাকথিত ধর্ষণের ঘটনাকে ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানো হয়েছিল, তেমনি এবারও নতুন কোনো ট্রিগার ইস্যু তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
নির্বাচনের আগে পার্বত্য তিন জেলায় না যাওয়ার পরামর্শ যুক্তরাজ্যের
এবারের নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো: পার্বত্য চুক্তির অন্যতম স্বাক্ষরকারী সংগঠন সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন আরেক আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন জেএসএস নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না, আবার একইসঙ্গে পার্বত্য চুক্তিবিরোধী সংগঠন ইউপিডিএফও এককভাবে নিজস্ব কোনো প্রার্থী দেয়নি। প্রথম দৃষ্টিতে এটি রাজনৈতিক নিস্ক্রিয়তা বা কৌশলগত বিরতির মতো মনে হলেও, বাস্তবে এই অনুপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে। কারণ অতীতে দেখা গেছে, সরাসরি নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় না থেকেও কিছু সংগঠন পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করার জন্য বিকল্প পথ বেছে নেয়, যেখানে ভোটের মাঠ নয়, বরং রাজপথ, সামাজিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিই হয়ে ওঠে প্রধান চাপ তৈরির উপকরণ। নির্বাচনী অংশগ্রহণের দায় থেকে মুক্ত থেকেও একটি গোষ্ঠী যদি অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে, তাহলে সেটি রাজনৈতিকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু প্রভাব বিস্তারে কার্যকর কৌশল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই বাস্তবতায় জেএসএসের নির্বাচন বর্জন এবং ইউপিডিএফের প্রার্থীহীন অবস্থান; দুটিই পার্বত্য চট্টগ্রামে নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
নির্বাচনপূর্ব সময়ে সম্ভাব্য থ্রেট বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি ঝুঁকি স্পষ্টভাবে সামনে আসে।
- প্রথমত, বিচ্ছিন্ন অপরাধ বা সামাজিক ঘটনার অতিরঞ্জিত উপস্থাপন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে খুব দ্রুত একটি ঘটনাকে ‘জাতিগত নিপীড়ন’ বা ‘রাষ্ট্রীয় দমন’ হিসেবে ফ্রেম করার চেষ্টা হতে পারে।
- দ্বিতীয়ত, সশস্ত্র উপস্থিতি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ভোটকেন্দ্র ও জনসাধারণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি। এতে ভোটার উপস্থিতি কমানো এবং প্রশাসনের সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ করাই মূল লক্ষ্য থাকে।
- তৃতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের নজরে বাংলাদেশকে একটি ‘অস্থিতিশীল নির্বাচনকারী রাষ্ট্র’ হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়—যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য উভয়ের সতর্কতাতেই ‘সন্ত্রাস, অপহরণ ও সহিংসতা’র কথা এসেছে। অর্থাৎ সমস্যাটিকে তারা শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি হিসেবেই দেখছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামে অতীত অভিজ্ঞতা বলে, নির্বাচন বা বড় রাজনৈতিক ইভেন্টকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা জাহির করার সুযোগ খোঁজে।
তবে এটাও সত্য, প্রতিটি সতর্কতার অর্থ এই নয় যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। বরং এসব সতর্কতা প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকদের জন্য আগাম সংকেত হিসেবে কাজ করতে পারে। আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি গোয়েন্দা নজরদারি, স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয় এবং তথ্যভিত্তিক প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করা যায়, তাহলে সম্ভাব্য ষড়যন্ত্র অনেকাংশেই ভেস্তে দেওয়া সম্ভব।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পাহাড়ে বাঙ্গালি ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে কৃত্রিম বিভাজন তৈরির চেষ্টা। অতীতের সহিংসতায় দেখা গেছে, ক্ষতির শিকার হয়েছে উভয় পক্ষই, অথচ ফায়দা লুটেছে একটি সশস্ত্র স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী। নির্বাচন সামনে রেখে সেই পুরোনো কৌশল নতুন মোড়কে ফিরে আসার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সবশেষ, আন্তর্জাতিক ভ্রমণ সতর্কতা কেবল বিদেশিদের জন্য নির্দেশনা নয়; এটি সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের ভেতরের বাস্তবতাকেও ইঙ্গিত করে। পার্বত্য চট্টগ্রামে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ রাখতে হলে অতীতের ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন অধ্যায় হিসেবে না দেখে একটি ধারাবাহিক প্যাটার্ন হিসেবে মূল্যায়ন করাই হবে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ও দায়িত্বশীল অবস্থান।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।