পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩ আসনের প্রার্থীদের ইশতেহারে কি কি বিষয় অবশ্যই থাকা উচিত?
![]()
আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনকে ঘীরে পাহাড়েও জমে উঠেছে প্রার্থীদের প্রচারণা। প্রার্থীরা ভোটারদের দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতিও।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, যে ব্যক্তিই এমপি নির্বাচিত হোক কিংবা যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন পাহাড়ী-বাঙালি কারোরই ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি কখনো। শোষণ, নিপীড়ন, চাঁদাবাজি, বৈষম্য ও সন্ত্রাসবাদের যাতাকলে পিষ্ট হয়েছে পার্বত্যবাসী।
তাই ৫ আগষ্ট স্বৈরাচার হাসিনার পতনের পর নতুন বাংলাদেশে পার্বত্যবাসী নতুন কিছুর স্বপ্ন বুনেছিলো। তাও দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। তাই এবারের নির্বাচনই পাহাড়ের মানুষের শেষ আশা ভরসার আশ্রয়স্থল।
প্রার্থীরা কি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন কিংবা তাদের ইশতেহারে কি কি বিষয় থাকতে তাই এখন জনমনে আলোচনার বিষয়। আদৌ কি প্রার্থীরা পাহাড়ী বাঙালির প্রকৃত সমস্যা সমাধানে সময়োপযোগী কোনো ইশতেহার বা প্রতিশ্রুতিতিশ্রুতি দিচ্ছে নাকি আগের মতোই?
পাহাড়ের সাধারণ মানুষের মতামত, চাওয়া পাওয়া, প্রকৃত সমস্যাবলী ও বাস্তবতার উপর ভিত্তি করে প্রার্থীদের ইশতেহারে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অবশ্যই থাকতে হবে। না হয় পাহাড়ের ভোটাররা ঐ প্রার্থীকে বেচে নিবেন না।
* এরমধ্যে অন্যতম হলো ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনো ধরনের জাতিগত বৈষম্য থাকবে না’। পাহাড়ি–বাঙালি নির্বিশেষে সকল জনগোষ্ঠীর সমান মর্যাদা, সমান সাংবিধানিক অধিকার ও পূর্ণ নিরাপত্তা রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে।
জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক বৈষম্যেই পাহাড়ের অন্যতম মূল সমস্যা। একচেটিয়া একটি গোষ্ঠীর সমস্ত সুযোগ সুবিধা গ্রহণ এবং কর্তৃত্ব পাহাড়ের অন্যান্য পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীদের সাথে ব্যাপক বৈষম্য করা হচ্ছে। যে প্রার্থী এই বৈষম্য দূর করতে পারবে পার্বত্যবাসী তাদেরই বেচে নিবে।
* দ্বিতীয় যে বিষয়টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, ‘পাহাড়ের নাগরিকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা’। পাহাড়ী সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য এই পার্বত্য চট্টগ্রাম। যার ফলে এখানে নিরাপত্তা ও নিরাপদ জীবনই এখন মূখ্য বিষয়।
পর্যটন খাতকে এগিয়ে নিয়ে যেতে নিরাপত্তাই মূখ্য বিষয়। দেশি-বিদেশি পর্যটক সবাই যেন নির্বিঘ্নে ভ্রমণ করতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। এই বিষয়টা যেন প্রার্থীদের ইশতেহারে অবশ্যই থাকে এবং জয়ী হলে তা যেন বাস্তবায়ন করে।
* তৃতীয় যে বিষয় পাহাড়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষার প্রাসরের জন্য আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা পরিবেশ, শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করা’। শিক্ষাক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়াই পাহাড়ের নাগরিকদের অন্যতম সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
* চতুর্থত যে বিষয়টি প্রার্থীদের কাছে অবশ্যই গুরুত্ব পাওয়া উচিত তা হলো, ‘পাহাড়ের পর্যটন ও শিল্পখাতের উপর অত্যাধিক গুরুত্ব দেওয়া’। পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের অন্যতম পর্যটন সমৃদ্ধ অঞ্চল হলেও নিরাপত্তা ও সরকারের সদিচ্ছার অভাবে তা পিছিয়ে রয়েছে।
* শিল্পখাতে পাহাড়ের অবস্থা আরো নাজুক। দেশের এক-দশমাংশ এই অঞ্চলে কোনোও বৃহৎ কিংবা মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান নেই। যার কারণে পাহাড়ে কর্মসংস্থানের কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই এই ২ খাতে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ অত্যন্ত জরুরী।
* যে বিষয়টি শুধু পাহাড় নয় সারাদেশ সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অন্যতম বাধা সেটা হলো ‘দূর্নীতি’। পাহাড় সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি ‘দূর্নীতি’র অভয়ারণ্য। সীমাহীন দূর্নীতি, অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্য পার্বত্য চট্টগ্রামকে পিছিয়ে রেখেছে।
* পার্বত্য মন্ত্রণালয়, আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদসহ অন্যান্য সমস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানে দূর্নীতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে গেঁথে আছে। যার কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলের পাহাড়ি বাঙালিরা সরকারি কোনো সুযোগ সুবিধা যথেষ্ট পরিমাণে পায় না। এবিষয়ে প্রার্থীদের সুদৃষ্টি দিতে হবে।
* পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি বৈচিত্র্যময় অঞ্চল। এখানে বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি ১২টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বাস। তাই দুর্গম অঞ্চলে পিছিয়ে পড়া নৃগোষ্ঠীদের সর্বক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিয়ে তাদের জীবনমান উন্নত করতে হবে। একচেটিয়া কোনো নৃগোষ্ঠীদের সুবিধা প্রদান করে বৈষম্য তৈরীর বিষয়টি চিরতরে বাদ দিতে হবে।
তাছাড়া পাহাড়ী জনগোষ্ঠীদের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পুরাণ সমগ্র বিশেষভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিস্তার করতে হবে। তবে এক্ষেত্রেও শুধু নির্দিষ্ট একটি নৃগোষ্ঠীর পরিবর্তে ১২টি নৃগোষ্ঠীর প্রতি সুবিচার করতে হবে।
* পাহাড়ের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো ‘সশস্ত্র সন্ত্রাসীগোষ্ঠী’। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও সম্প্রীতির পার্বত্য চট্টগ্রাম গড়তে হলে সমস্ত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করে সন্ত্রাসীদের সমূলে উৎখাত করতে হবে।
* সন্ত্রাসীরা চাঁদাবাজি, গুম, খুন ও নানা দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পাহাড়কে অস্থিতিশীল করে রেখেছে। তাই তাদের নির্মূল করে নিরাপদ পাহাড় গড়ার প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তবায়ন যিনি করতে পারবেন পার্বত্যবাসী সেই প্রার্থীকেই বেচে নিবেন।
* দেশের মোট বনাঞ্চল এবং পাহাড়ের সিংহভাগই পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যমান। তাই এই বন-পাহাড়ই দেশের ‘ফুসফুস’। এই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল রক্ষা করতে বৃক্ষ নিধন, মাটি ও পাহাড় কাটা এবং পাথর উত্তোলন চিরতরে বন্ধ করতে প্রয়োজনে নতুন আইন সৃষ্টি করেও তা রোধ করতে হবে।
* দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ে এনজিও কার্যক্রমের আড়ালে চলে আসছে ‘খ্রিষ্টানাইজেশন’ প্রক্রিয়া। এনজিও গুলো পাহাড়ে ঋণদান কর্মসূচির আড়ালে অর্থবিত্তের লোভে নিরীহ পাহাড়ীদের খ্রিস্টান বানাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
* অদূর ভবিষ্যতে পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি খ্রিস্টান রাষ্ট্র বানানোর ষড়যন্ত্র রুখে দিতে এনজিও গুলোর কার্যক্রমের জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং বাঙালি জনগোষ্ঠীর মাঝেও তাদের সেবা প্রদান করে বৈষম্য দূর করতে যিনি নজর দিবেন পাহাড়ের জনগণ সেই প্রার্থীকেই ভোট দিবেন।
* সর্বশেষ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিসহ পাহাড় নিয়ে যেসমস্ত লিখিত ও অলিখিত সমঝোতা কিংবা বিধান রয়েছে তাতে বিদ্যমান জাতিগত বৈষম্য দূর করে সমানুপাতে পাহাড়ী বাঙালি উভয়কেই সম্পৃক্ত করতে হবে এবং চুক্তিসহ সর্বক্ষেত্রে বিদ্যমান অসাংবিধানিক ও দেশবিরোধী ধারা বিধান ইত্যাদি বাতিল করতে হবে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।
* সমস্ত অসাংবিধানিক ও দেশের সার্বভৌমত্ব বিরোধী ধারা ও বিধাব বাতিল করে প্রতি ক্ষেত্রে পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর একচেটিয়া প্রাধান্যের পরিবর্তে বাঙালিসহ পিছিয়ে পড়া ম্রো, বম, খুমী, লুসাই ও খেয়াং জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
* তাছাড়া পাহাড়ের সমস্ত অনিয়ম ও অসাংবিধানিক কার্যক্রম যেমন রাজার সনদ, হেডম্যান সনদ, ভুমি আইন, শরণার্থী সমস্যা ইত্যাদির নায্য সমাধান যিনি দিতে পারবেন তাকেই পার্বত্যবাসী নির্বাচিত করবেন।
অতএব পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩ সংসদীয় আসনের প্রার্থীদের উল্লেখিত বিষয়গুলো অবশ্যই তাদের প্রতিশ্রুতি কিংবা ইশতেহারে গুরুত্ব সহকারে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং জয়ী হলে তা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবতায়ন করতে হবে। তবেই পাহাড়ের জনগণ তাদের বেছে নিবেন।
-পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদের ফেসবুক পেজ থেকে নেয়া।