আইনি জটিলতা ও শ্রমিক অসন্তোষের মুখে অন্তর্বর্তী সরকারের চট্টগ্রাম বন্দরের চুক্তির উদ্যোগ
![]()
নিউজ ডেস্ক
বাংলাদেশের সবচেয়ে লাভজনক নৌবাণিজ্য সম্পদ একটি বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার উচ্চ ঝুঁকির উদ্যোগ ঘিরে তৈরি হয়েছে আইনি চ্যালেঞ্জ, শ্রমিক ধর্মঘট ও ব্যাপক আর্থিক অবমূল্যায়নের অভিযোগের তীব্র ঝড়।
অন্তর্বর্তী সরকারের তত্ত্বাবধানে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডকে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ১৫ বছরের জন্য ইজারা দিতে দ্রুতগতিতে প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। কর্মকর্তারা এটিকে বৈশ্বিক মানের দক্ষতায় পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরলেও সমালোচকদের অভিযোগ, জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে এবং আদালতে বিচারাধীন একটি প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করে চুক্তিটি ‘জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে’।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)—বন্দরের একটি কৌশলগত স্থাপনা, যেখানে দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ কনটেইনারবাহী পণ্য ওঠানামা করে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) সরকার-টু-সরকার ব্যবস্থায় এনসিটি ও এর পাশের ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড ১৫ বছরের জন্য আমিরাতভিত্তিক বৈশ্বিক বন্দর অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
এদিকে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে অর্থনীতিবিদ ও শ্রমিক নেতাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে—কৌশলগত জাতীয় সম্পদ যেখানে জড়িত, সেখানে এমন দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক ইজারা চুক্তি চূড়ান্ত করার আইনগত ও নৈতিক ম্যান্ডেট অন্তর্বর্তী সরকারের আছে কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

অন্তর্বর্তী সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ইজারা চুক্তিতে স্বাক্ষরের আইনগত ক্ষমতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর বিষয়ে সরকার এখনো প্রকাশ্যে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
আদালতের রায়ের আগেই সময়সূচি নির্ধারণ
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর পর্যালোচিত নথি অনুযায়ী, সিপিএ ৮ জানুয়ারি ৬৩ পৃষ্ঠার একটি রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল (আরএফপি) প্রকাশ করে, যেখানে এনসিটি ও এর ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ডের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রস্তাব আহ্বান করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি করা হয় সুপ্রিম কোর্টের ২৯ জানুয়ারির রায়ের তিন সপ্তাহ আগে—যে রায়ে ইজারা প্রক্রিয়ার বৈধতা বহাল রাখা হয়।
ব্যাখ্যা চাওয়ার শেষ সময় ছিল ১১ জানুয়ারি, কিন্তু প্রি-বিড সভা অনুষ্ঠিত হয় ১৪ ও ১৫ জানুয়ারি। ২০ জানুয়ারি একটি সংযোজনী (অ্যাডেনডাম) জারি করা হয় এবং দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি।
পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, “অধিকাংশ আনুষ্ঠানিকতা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এখন শুধু কয়েকটি চূড়ান্ত পর্যায়ের ফর্মালিটিজ প্রক্রিয়াধীন। সেগুলো শেষ হলে নির্বাচনের আগেই যেকোনো সময় এই সপ্তাহে কনসেশন চুক্তি সই করা যেতে পারে,” তিনি বলেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি বিচারাধীন থাকা অবস্থায় এমন অগ্রগতির যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
আবেদনকারীদের পক্ষে থাকা ব্যারিস্টার আনোয়ার হোসেন টিবিএসকে বলেন, “যখন কোনো বিষয় সাব জুডিস থাকে, তখন সেটি নিয়ে এগোনো যায় না। আদালতে শুনানি চলাকালেই যদি সিপিএ আরএফপি প্রকাশ ও বৈঠক করে থাকে, তাহলে তারা আদালতকে অবজ্ঞা করেছে।”
তিনি আরও জানান, রায়ের ওপর স্থিতাবস্থা (স্ট্যাটাস কো) চেয়ে ইতোমধ্যে একটি আবেদন করা হয়েছে। “আদালত যদি পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে আপিল পাঠিয়েও দেয় এবং স্ট্যাটাস কো না দেয়, তবুও আইনগতভাবে কর্তৃপক্ষের এই চুক্তি এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই।”
শ্রমিক ধর্মঘটে বন্দর কার্যক্রম ব্যাহত
এনসিটি বিদেশি অপারেটরের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তাব বন্দর শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। শনিবার থেকে রোববার পর্যন্ত টানা দুই দিন আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতি এবং গতকাল আরেক দফা কর্মসূচির ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য ওঠানামা ও জাহাজ চলাচল কার্যত অচল হয়ে পড়ে। শ্রমিকেরা গতকাল ঘোষণা দিয়েছেন, আজ সকাল ৮টা থেকে ২৪ ঘণ্টার ধর্মঘট পালন করা হবে—যা তাদের মতে কনসেশন চুক্তি সইয়ের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রার সময়ের সঙ্গেই মিলে যায়।
প্রতিদিন যেখানে চট্টগ্রাম বন্দর সাধারণত ৮,০০০ থেকে ৯,০০০ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিঙ্গ করে, সেখানে চলমান অচলাবস্থায় কার্যক্রমে বড় ধরনের ধস নেমেছে।
শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, এনসিটি একটি অত্যন্ত লাভজনক স্থাপনা হলেও কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে এর মূল্য কম দেখাচ্ছে। তাঁদের মতে, বর্তমান ট্যারিফ অনুযায়ী এনসিটিতে প্রতি টিইইউ থেকে প্রায় ১৬১ ডলার আয় হয়। পরিচালন ব্যয় যদি প্রতি টিইইউ ৫৬ ডলারও ধরা হয়, তাহলেও কনটেইনার প্রতি বন্দর কর্তৃপক্ষের নিট আয় দাঁড়ায় প্রায় ১০৫ ডলার।
“সিপিএ এবং রেট নেগোশিয়েশন কমিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে প্রতি টিইইউ ১০৫ ডলারে এনসিটি দিতে চায়। অথচ এক শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা চট্টগ্রাম বন্দরকে মাত্র ৪২ ডলার প্রতি টিইইউ দরে হস্তান্তরের জন্য চাপ দিচ্ছেন,” অভিযোগ করেন বন্দর রক্ষা সংগ্রাম ঐক্য পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির।
টিবিএসের পর্যালোচিত সিপিএর নথিতে প্রস্তাবিত প্রতি টিইইউ হারের ভিত্তি প্রকাশ করা হয়নি।
আরেক আন্দোলনকারী নেতা ইব্রাহিম খোকন সিদ্ধান্তের তাড়াহুড়ো নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, “আর মাত্র ১০ দিনের মধ্যেই দেশে একটি নির্বাচিত সরকার আসছে। তাহলে অন্তর্বর্তী সরকার কেন এমন কৌশলগত সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দিচ্ছে না?” তিনি অভিযোগ করেন, চুক্তি দ্রুত চূড়ান্ত করার পেছনে ব্যক্তিস্বার্থ কাজ করছে।
এদিকে বন্দরে ক্রমবর্ধমান আন্দোলন ও কর্মবিরতির মধ্যে গতকাল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সিপিএর ১৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সংযুক্ত ভিত্তিতে পায়রা ও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষে বদলির আদেশ দেয়। এসব বদলির আদেশ তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে বলে জানানো হয়।
সাম্প্রতিক এই বদলির আদেশ আসে গত ৩১ জানুয়ারি ও ১ ফেব্রুয়ারির আগের আদেশগুলোর পর, যার আওতায় সিপিএর একাধিক কর্মচারীকে পানগাঁও আইসিটি ও ঢাকার বিভিন্ন দপ্তরে বদলি করা হয়।
নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন গতকাল বলেন, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর নিয়ে জাতীয় স্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত সরকার নেবে না। নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে যারা জড়িত, সরকার তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছে।”
তিনি বলেন, রমজান সামনে রেখে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী লাইটার জাহাজে পণ্য মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও দাম বাড়ানোর ষড়যন্ত্র করছে।
লিজ প্রক্রিয়া
২০০৭ সাল থেকে চালু থাকা এনসিটি চট্টগ্রাম বন্দরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এই ব্রাউনফিল্ড নদীভিত্তিক টার্মিনালটির কুই ওয়ালের দৈর্ঘ্য ৮২০ মিটার, এর চারটি কনটেইনার বার্থ এবং বিস্তৃত সহায়ক অবকাঠামো রয়েছে। ২০১৫ সালে নির্মিত এর সংলগ্ন ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড অতিরিক্ত কনটেইনার সংরক্ষণের সুবিধাও দেয়।
আরএফপি অনুযায়ী, উৎপাদন ও রপ্তানি খাতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে বন্দর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দক্ষতা উন্নয়নই সরকারের লক্ষ্য। এজন্য সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে নির্বাচন করা হয়েছে এবং চুক্তিতে পরামর্শক হিসেবে রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি)।
এই কনসেশনে সর্বোচ্চ ছয় মাসের ট্রানজিশন পিরিয়ডের পর ১৫ বছরের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ পর্ব থাকবে। মেয়াদ শেষে অপারেটর কর্তৃক স্থাপিত অতিরিক্ত যন্ত্রপাতি ছাড়া সব সুবিধা বিনা খরচে সিপিএ ফেরত পাবে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২০৫ মিলিয়ন ডলার।
আরএফপিতে দরপত্রে অংশগ্রহণ সীমিত রাখা হয়েছে শুধু ডিপি ওয়ার্ল্ড বা তাদের নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়ামের জন্য, যেখানে লিড মেম্বারের ন্যূনতম ৫১ শতাংশ ইক্যুইটি থাকতে হবে। দরদাতাদের ইংরেজিতে আইনি, কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব জমা দিতে হবে এবং ১.৫ মিলিয়ন ডলারের বিড সিকিউরিটি দিতে হবে, যা ১৮০ দিন বৈধ থাকবে।
প্রথমে কারিগরি দর, পরে আর্থিক দর মূল্যায়ন করা হবে। নির্বাচিত দরদাতাকে আইএফসিকে ২০ লাখ ডলার প্রকল্প উন্নয়ন ফি এবং পিপিপি কর্তৃপক্ষকে ৪ লাখ ডলার সাকসেস ফি দিতে হবে। বাংলাদেশে একটি বিশেষ উদ্দেশ্যভিত্তিক কোম্পানি (এসপিভি) গঠন করতে হবে, যার শেয়ারহোল্ডিং ১০ বছর অপরিবর্তিত থাকবে।
দরপত্রে যোগ্যতা অর্জনের জন্য দরদাতাদের দেখাতে হবে যে, গত তিন অর্থবছরের প্রতিটিতে তারা অন্তত এমন একটি কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করেছে, যেখানে বার্ষিক ন্যূনতম সাড়ে ৭ লাখ টিইইউ হ্যান্ডলিং হয়েছে, এবং একই সময়ে প্রতি বছর ন্যূনতম ১০ কোটি ডলারের নিট সম্পদ মূল্যায়ন ছিল।
২০২৩ সালের মার্চে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি প্রক্রিয়াটির নীতিগত অনুমোদন দেয়। পরে বাংলাদেশ ইয়ং ইকোনমিস্টস ফোরাম প্রস্তাবিত চুক্তিতে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতার অভাবের কথা উল্লেখ করে একটি রিট আবেদন করে।
২০২৫ সালের শেষ দিকে হাইকোর্টের বিভক্ত রায়ের পর—গত ২৯ জানুয়ারির সুপ্রিম কোর্টের রায়ে কনসেশন চুক্তির শেষ আইনি বাধাও দূর হয়। তবে এরপরই এ রায়ের ওপর স্থিতাবস্থা চেয়ে আরেকটি আবেদন করা হয়।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।
সিপিএর পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক রোববার এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তটি সরকারের। “সিপিএ শুধু সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে,” তিনি বলেন।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ অন্তর্বর্তী সরকারের দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক চুক্তিতে এগিয়ে যাওয়ার আইনগত ক্ষমতা নিয়েই প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মতে, এই সরকারের ম্যান্ডেট কেবল নির্বাচন আয়োজন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ, কৌশলগত আন্তর্জাতিক চুক্তি সই করার এখতিয়ার তাদের নেই।
আন্দোলনরত বন্দর শ্রমিকদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দরসহ আন্তর্জাতিক চুক্তি সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম থেকে তাদের সরে আসতে হবে। উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীদের এসব বিষয়ে যুক্ত থাকা বন্ধ করা উচিত।”
-টিবিএস।