ভারতে আদিবাসী, মুসলিম ও বনবাসীদের ওপর ‘নজিরবিহীন’ মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে জাতিসংঘের উদ্বেগ প্রকাশ

ভারতে আদিবাসী, মুসলিম ও বনবাসীদের ওপর ‘নজিরবিহীন’ মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে জাতিসংঘের উদ্বেগ প্রকাশ

ভারতে আদিবাসী, মুসলিম ও বনবাসীদের ওপর ‘নজিরবিহীন’ মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে জাতিসংঘের উদ্বেগ প্রকাশ
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

নিউজ ডেস্ক

ভারতে আদিবাসী, আসামের বাংলাভাষী মুসলিম ও বনবাসী সম্প্রদায়ের ওপর ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ‘আর্লি ওয়ার্নিং’ (সতর্কবার্তা) ও জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে জাতিসংঘের জাতিগত বৈষম্য বিলোপ কমিটি (সিইআরডি)। ছত্তিশগড়ের আদিবাসী, আসামের বাংলাভাষী মুসলিম ও বিভিন্ন বনাঞ্চলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ওপর হত্যা, যথেচ্ছ গ্রেপ্তার, বলপূর্বক উচ্ছেদ ও ভূমির অধিকা থেকে বঞ্চিত করার মতো অভিযোগে এই পদক্ষেপ নিয়েছে সংস্থাটি।

গত ১৯ জানুয়ারি ভারত সরকারকে পাঠানো এক বার্তায় জাতিসংঘের এই সংস্থাটি বলেছে, ভারতের নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও বন সংরক্ষণ-সংক্রান্ত নীতিগুলো বর্ণবৈষম্যমূলক উপায়ে পরিচালিত হতে পারে। এটি আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা তৈরি করছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জেনেভায় ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধির কাছে তিনটি পৃথক চিঠি পাঠিয়েছে এই কমিটি। এতে তারা আর্লি ওয়ার্নিং অ্যান্ড আর্জেন্ট অ্যাকশন পদ্ধতিটি সক্রিয় করেছে। সাধারণত কোনো পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের দিকে মোড় নেয়, তখনই এই বিশেষ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। এটি ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন অন দি এলিমিনেশন অভ অল ফর্মস অভ রেশিয়াল ডিসক্রিমিনেশন-এর অধীনে সুরক্ষিত অধিকারগুলো রক্ষার প্রচেষ্টা। জাতিসংঘের এ চিঠিতে নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, বিনাবিচারে আটক, বলপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং ভূমি ও সম্পদের ওপর স্থানীয়দের সম্মতির তোয়াক্কা না করার মতো বিষয়গুলো উঠে এসেছে।

বস্তার: সামরিকায়ন, হত্যাকাণ্ড ও বাস্তুচ্যুতি

সবচেয়ে গুরুতর উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ছত্তিশগড়ের বস্তার অঞ্চল, যেখানকার প্রায় ৭০ শতাংশ জনসংখ্যাই আদিবাসী। কমিটির পর্যবেক্ষণ অনুসারে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে এ অঞ্চলে বিদ্রোহী দমনে সরকারি অভিযান নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে।

কমিটির কাছে আসা তথ্যমতে, এ অভিযান জোরদার করায় সাধারণ আদিবাসী নাগরিকদের ওপর ‘ব্যাপক ও নজিরবিহীন সহিংসতা’ নেমে এসেছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে অন্তত ৫০০ আদিবাসী নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে সাধারণ নাগরিকরাও রয়েছেন। কমিটি লক্ষ করেছে, সরকারি নথির সঙ্গে এই অঞ্চলে কাজ করা মানবাধিকার কর্মী ও নাগরিক সমাজের দেওয়া তথ্যের মধ্যে ব্যাপক অসংগতি রয়েছে।

এ ছাড়া, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে অন্তত পাঁচটি ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনী বিমান থেকে বোমা হামলা চালিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে, যা কমিটিকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। এসব হামলায় আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রাম, কৃষি জমি এবং বনাঞ্চলকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এ ধরনের সামরিক অভিযান বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আইনের ‘প্রপোশনালিটি’ বা যৌক্তিকতার নীতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে এই অঞ্চলে অন্তত ৩০০ নতুন নিরাপত্তা ঘাঁটি স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি গত এক দশকে পুলিশ স্টেশনের সংখ্যা ৬৫ থেকে বেড়ে ৫০০ ছাড়িয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এই স্থাপনাগুলোর বড় অংশ আদিবাসীদের পিতৃভূমিতে তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা বা সম্মতি ছাড়াই নির্মাণ করা হয়েছে। এটি ভারতীয় সংবিধানে দেওয়া সুরক্ষা কবচের সরাসরি লঙ্ঘন।

যথেচ্ছ গ্রেপ্তার ও অপরাধী সাব্যস্তকরণ

জাতিসংঘের কমিটি লক্ষ্য করেছে, বেআইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইন (ইউএপিএ) এবং ছত্তিশগড় বিশেষ জননিরাপত্তা আইনের মতো কঠোর নিরাপত্তা আইনের আওতায় আদিবাসী নাগরিকদের যথেচ্ছ গ্রেপ্তার ও দীর্ঘমেয়াদি আটকের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব আটক প্রক্রিয়া যথাযথ আইনি পদ্ধতি অনুসরণ না করে এবং দীর্ঘ সময় বিচারহীন অবস্থায় রাখা হচ্ছে।

চিঠিতে সুনির্দিষ্ট কিছু ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন, ২০২৪ সালের মে মাসে বিজাপুর জেলায় নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে অন্তত ১০ জন গ্রামবাসী ও কৃষক নিহত হন, গ্রেপ্তার করা হয় প্রায় ৫০ জনকে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভোরে নিরাপত্তা বাহিনী আদিবাসীদের ঘরে চড়াও হলে প্রাণভয়ে গ্রামবাসী বনে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়; প্রায় ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

জাতিসংঘের কমিটি আরও উদ্বেগের সাথে জানিয়ে বলেছে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জন্য সরকারিভাবে আর্থিক পুরস্কার ও পদোন্নতির ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে।

আত্মসমর্পণ নীতিমালা ও বেসামরিক নাগরিকদের আটক

কমিটির মতে, আত্মসমর্পণকারী ব্যক্তিদের (যাদের বেশিরভাগই আদিবাসী) যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ব্যক্তি স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। বিজাপুর জেলার একটি কেন্দ্রে নারী ও শিশুসহ প্রায় ২০০ জনকে আটকে রেখে জোরপূর্বক কায়িক শ্রমে বাধ্য করার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

বস্তার অঞ্চলে মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে কাজ করা মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক ও আইনজীবীরাও হুমকি, নজরদারি এবং গ্রেপ্তারের শিকার হচ্ছেন। ২০২৪ সালের অক্টোবরে আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন মূলবাসী বাঁচাও মঞ্চকে (এমবিএম) রাজ্য নিরাপত্তা আইনের অধীনে বেআইনি ঘোষণা করার বিষয়টি কমিটি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে।

কমিটি জোর দিয়ে বলেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের কোনো নিরপেক্ষ বা স্বাধীন তদন্ত হচ্ছে না। ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার মধ্যে একটি ‘পদ্ধতিগত বৈষম্য’ রয়েছে; অভিযানে নিহত আদিবাসীদের ঢালাওভাবে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর আইনি প্রতিকার পাওয়ার পথ কার্যত রুদ্ধ হয়ে যায়।

আসাম: এনআরসি, উচ্ছেদ ও ঘৃণাসূচক বক্তব্য

একটি পৃথক বার্তায়, সিইআরডি আসামের বাংলাভাষী মুসলিমদের বিষয়ে উদ্বেগ পুনর্ব্যক্ত করেছে—বিশেষ করে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) প্রসঙ্গে। ভারত সরকার দাবি করেছে, নাগরিকত্বের এই কাঠামো কোনো যোগ্য আবেদনকারীকে বাদ দেয় না। তবে কমিটি বলছে, বৈষম্যের অভিযোগের বিষয়ে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো জোরালো বা সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায়নি।

কমিটির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ত্রুটি-বিচ্যুতি, নথিপত্র সংগ্রহে জটিলতা ও ‘অ-মূলনিবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করার কারণে এনআরসি থেকে বিপুলসংখ্যক বাংলাভাষী মুসলিম বাদ পড়েছে। সংস্থাটির মতে, এই ‘অ-মূলনিবাসী’ শব্দটির কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই। এছাড়া তথাকথিত মূলনিবাসীদের তুলনায় এই জনগোষ্ঠীর জন্য যাচাই-বাছাইয়ের মানদণ্ড অনেক বেশি কঠোর করা হয়েছে। ফরেইনা ট্রাইব্যুনাল-এর কার্যক্রম স্থগিত থাকায় অনেকেই তাদের নাগরিকত্ব প্রমাণে আইনি চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

আসামের বেশ কিছু জেলায় পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসন ছাড়াই বাংলাভাষী মুসলিম পরিবারগুলোকে সুপরিকল্পিতভাবে উচ্ছেদ করার অভিযোগেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় ঘৃণামূলক বক্তব্য, সহিংসতায় প্ররোচনা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ ও সংগঠিত গোষ্ঠীর হামলার বিষয়গুলোও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বন সংরক্ষণ এবং বনবাসী সম্প্রদায়ের বাস্তুচ্যুতি

তৃতীয় চিঠিতে জাতীয় বাঘ সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষের (এনটিসিএ) সংরক্ষণ নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বনাঞ্চলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও আদিবাসীদের কথা বলা হয়েছে। ভারত সরকার কমিটিকে জানিয়েছে, বাঘ প্রকল্পের মূল এলাকা থেকে স্থানান্তর প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বেচ্ছামূলক ও সংশ্লিষ্টদের সম্মতির ভিত্তিতেই করা হয়। বর্তমানে এ ধরনের এলাকায় প্রায় ৬ হাজার ৪০০ পরিবার ও ৫৯০টি গ্রাম রয়েছে।

তবে কমিটি উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে, এ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের সঙ্গে অর্থবহ আলোচনা করা হয়েছে কি না বা তাদের ‘অবাধ, পূর্ববর্তী ও অবহিত সম্মতি’ নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য নেই। এছাড়া বাস্তুচ্যুতির ফলে ওই জনগোষ্ঠীর ওপর কী প্রভাব পড়বে, সে-সংক্রান্ত কোনো সমীক্ষাও চালানো হয়নি। পর্যাপ্ত বিকল্প আবাসন বা ক্ষতিপূরণ ছাড়া উচ্ছেদের ঝুঁকি এবং এর ফলে সৃষ্ট মানবিক সংকটের বিষয়েও সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।

-টিবিএস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may have missed