মিয়ানমারে জ্বালানি সংকট তীব্র, সপ্তাহে দুইবার তেল নেওয়ার সীমা নির্ধারণ
![]()
নিউজ ডেস্ক
মিয়ানমারের সামরিক সরকার রোববার জ্বালানি ব্যবহারে আরও কড়াকড়ি আরোপ করেছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যানবাহন মালিকরা এখন সপ্তাহে সর্বোচ্চ দুইবার জ্বালানি নিতে পারবেন। বিদ্যমান ‘জোড়-বিজোড়’ (odd-even) রেশনিং পদ্ধতির পরিবর্তে এ সাপ্তাহিক সীমা কার্যকর হবে বলে জান্তা সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
একই সঙ্গে জ্বালানি সংকটের গভীরতা বোঝাতে সরকার সকল সরকারি কর্মকর্তাকে প্রতি বুধবার বাসা থেকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে।
ইয়াঙ্গুনের এক বাসিন্দা বলেন, “দেখে মনে হচ্ছে জান্তা জ্বালানি রেশনিং আরও কঠোর করছে।” তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, নতুন এই বিধিনিষেধে পেট্রোল পাম্পগুলোতে বিশৃঙ্খলা আরও বাড়বে, যেখানে ইতোমধ্যেই উচ্চমূল্য এবং ত্রুটিপূর্ণ ডিজিটাল রেশনিং ব্যবস্থার কারণে ভোগান্তি চলছে।
আরেক বাসিন্দা বলেন, “পেট্রোল পাম্প সকাল ৬টায় খোলার আগেই রাতভর গাড়ির লাইন পড়ে থাকে। কিন্তু দুই-তিন ঘণ্টার মধ্যেই জ্বালানি শেষ হয়ে যায় এবং পাম্প বন্ধ হয়ে যায়। শনিবার আমরা প্রায় দুই মাইল দীর্ঘ লাইন দেখেছি, মানুষ রাস্তায় সময় নষ্ট করছে।”
রোববার জান্তা সরকার দাবি করেছে, দেশের ডিজেল ও পেট্রোলের মজুত আরও ৫০ দিন চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট।
তবে এই আশ্বাসের পরও সরকারি কর্মচারীদের বাসা থেকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং বেসরকারি খাতকেও একই পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানানো হয়েছে।
মিয়ানমার প্রায় ৯০ শতাংশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে যৌথ সামরিক হামলার কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দেশে এ সংকট তৈরি হয়েছে।
গত ৭ মার্চ সরকার ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য ‘জোড়-বিজোড়’ পদ্ধতি চালু করে। পরে নেপিদো, ইয়াঙ্গুন, মান্দালয় ও তাউংজি শহরে ডিজিটাল রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হয়, যাতে দৈনিক একবার জ্বালানি নেওয়া ও নির্দিষ্ট কোটা নিশ্চিত করা হয়। তবে এ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে পাম্পে ভিড় আরও বেড়ে যায় এবং চালকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়।
অনেক চালক অভিযোগ করেছেন, তাদের গাড়ির আইডি চুরি করে অবৈধ যানবাহনের মালিকরা জ্বালানি নিচ্ছেন। তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শিথিলতার অভিযোগ তুলে বলেন, সড়ক ও পরিবহন প্রশাসন বিভাগ এবং পুলিশ এ জালিয়াতি ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে।
ডিজিটাল রেশনিং ব্যবস্থার আওতায় নিবন্ধনবিহীন মোটরসাইকেলগুলো নেই, যা গ্রামীণ অঞ্চলে প্রধান পরিবহন মাধ্যম।
২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, মিয়ানমারে নিবন্ধিত মোট ১১ লাখ ৭৭ হাজার ৩০৫টি যানবাহনের মধ্যে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা ৫ লাখ ৯৯ হাজার ৩০১টি।
বর্তমান ‘জোড়-বিজোড়’ নিয়মে ব্যক্তিগত গাড়ি প্রতি দুই দিনে ১৫ লিটার এবং হালকা ট্রাক ২৫ লিটার জ্বালানি নিতে পারে। যাত্রীবাহী গাড়ির জন্য ৫০ লিটার এবং ভারী ট্রাকের জন্য ১৫০ লিটার সীমা নির্ধারিত রয়েছে।
সংকট তীব্র হওয়ায় জ্বালানির দামও দ্রুত বাড়ছে। ইয়াঙ্গুনের এক বাসিন্দা জানান, চালু থাকা অল্প কয়েকটি পাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে, মানুষ যতটুকু সম্ভব জ্বালানি সংগ্রহে ছুটছে।
শুক্রবার ইয়াঙ্গুনে প্রিমিয়াম ডিজেলের দাম রাতারাতি লিটারপ্রতি ৩,৫৬০ কিয়াত থেকে বেড়ে ৪,৮২০ কিয়াত (প্রায় ২.৩০ মার্কিন ডলার) হয়েছে। অকটেন ৯২ বেড়ে ২,৮৩০ থেকে ৩,৬১০ কিয়াত এবং অকটেন ৯৫ বেড়ে ২,৯৩০ থেকে ৩,৮৫০ কিয়াত হয়েছে।
কালোবাজারে অকটেন ৯২-এর দাম ৭,০০০ থেকে ১০,০০০ কিয়াত পর্যন্ত উঠেছে।
ইয়াঙ্গুনসহ অন্যান্য অঞ্চলে দাম বাড়লেও মন স্টেটে জ্বালানির দাম সবচেয়ে বেশি। ডেনকো ট্রেডিংয়ের দৈনিক মূল্যতালিকা অনুযায়ী, সেখানে প্রিমিয়াম ডিজেলের দাম বেড়ে ৫,১১০ কিয়াত, অকটেন ৯২-এর দাম ৩,৮৪৫ কিয়াত এবং অকটেন ৯৫-এর দাম ৪,০৮০ কিয়াত হয়েছে।
মন স্টেটের বিলিন শহরের এক বাসিন্দা বলেন, “মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে জ্বালানি নিচ্ছে। আমাদের শহরের পাম্পগুলো সাধারণত তিন দিনে একদিন খোলা থাকে, কারণ দ্রুত জ্বালানি শেষ হয়ে যায়।”
তিনি আরও বলেন, মোটরসাইকেলের জন্য ৫,০০০ কিয়াত এবং গাড়ির জন্য ১০,০০০ কিয়াত পর্যন্ত জ্বালানি কেনার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়ছে বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে জান্তা সরকারের পেট্রোলিয়াম পণ্য নিয়ন্ত্রণ বিভাগ এবং মিয়ানমার পেট্রোলিয়াম ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের কাছে মন্তব্য চাওয়া হলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।