কক্সবাজার থেকে সাইকেলে ৩৮ দিনে এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে কাপ্তাইয়ের বীর কুমার
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
কক্সবাজারের সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাইকেলে যাত্রা শুরু করে দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরিয়ে ৩৮ দিনের অভিযাত্রা শেষে নেপালের ৫ হাজার ৩৬৪ মিটার উচ্চতার এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে পৌঁছেছেন রাঙামাটির কাপ্তাইয়ের সাইক্লিস্ট ও অভিযাত্রী বীর কুমার তনচংগ্যা। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে সাইকেল নিয়ে এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে পৌঁছে দীর্ঘ ও চ্যালেঞ্জিং অভিযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি।
বীর কুমারের দাবি, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে স্থলপথে সাইকেল চালিয়ে এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে পৌঁছানো প্রথম বাংলাদেশি এবং প্রথম আদিবাসী সাইক্লিস্ট তিনি। ‘সি টু হিমালয়াস—এক্সপেডিশন ফর অ্যাওয়ারনেস’ নামের এই অভিযানের মধ্য দিয়ে সমুদ্রের কাছ থেকে শুরু করে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গের পাদদেশ পর্যন্ত দুই চাকার যানে পৌঁছানোর এক ব্যতিক্রমী যাত্রা সম্পন্ন করেছেন তিনি।
অভিযানের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় গত ১৬ আগস্ট সকাল ৮টা ৩৯ মিনিটে কক্সবাজারের কবিতা চত্বর বিচ থেকে। প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহের মধ্য দিয়ে শুরু করা এই অভিযানের উদ্দেশ্য শুরু থেকেই শুধু দূরত্ব অতিক্রম বা পাহাড় জয় করা ছিল না। রক্তদান, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু ন্যায্যতা বিষয়ে সচেতনতা তৈরি এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরার লক্ষ্যও ছিল এর সঙ্গে। একই সঙ্গে দেশের অ্যাডভেঞ্চার পর্যটনের সম্ভাবনাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরারও চেষ্টা করেছেন বীর কুমার।
কক্সবাজার থেকে যাত্রা শুরুর পর দেশের বিভিন্ন পথ পেরিয়ে বাংলাবান্ধা সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন তিনি। এরপর শিলিগুড়ি হয়ে নেপালে পৌঁছে শুরু হয় অভিযানের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। হিমালয়ের দুর্গম ও উঁচু পাহাড়ি পথ, প্রতিকূল আবহাওয়া, দীর্ঘ ট্রেইল এবং উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার শারীরিক চাপ—সবকিছুর মধ্য দিয়েই সাইকেল চালিয়ে এগিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে।
অভিযানের শুরু থেকেই প্রতিদিনের যাত্রার অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেছেন বীর কুমার। কখনো ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে, কখনো দুর্গম পাহাড়ি পথে, আবার কখনো প্রচণ্ড উচ্চতার প্রতিকূল পরিবেশে সাইকেল চালিয়ে তাঁকে এগিয়ে যেতে হয়েছে। পথের নানা ঝুঁকি ও শারীরিক-মানসিক চাপের মধ্যেও নির্ধারিত লক্ষ্য থেকে সরে আসেননি তিনি।
এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে পৌঁছানোর আগের কয়েক দিনেই হিমালয়ের তিনটি দুর্গম চূড়া ও গিরিপথ অতিক্রম করেন বীর কুমার। গত ১৮ সেপ্টেম্বর ৫ হাজার ৮৩ মিটার উচ্চতার নাংকার্তশাং পিক সামিট করেন তিনি। ওই দিন বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটে চূড়ায় পৌঁছান। পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর ৫ হাজার ৫৫০ মিটার উচ্চতার ছুকুং রি পিক সামিট করেন। সেখানে তিনি পৌঁছান বিকেল ৪টা ৫১ মিনিটে।
এরপর ২১ সেপ্টেম্বর ৫ হাজার ৫৩৫ মিটার উচ্চতার কংমা লা পাস অতিক্রম করেন তিনি। ওই দিন দুপুর ১টা ৫৩ মিনিটে কংমা লা পাসে পৌঁছানোর পর পরদিনই তাঁর চূড়ান্ত গন্তব্য এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের উদ্দেশে যাত্রা করেন। শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবার দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে ৫ হাজার ৩৬৪ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে পৌঁছান কাপ্তাইয়ের এই অভিযাত্রী।
৩৮ দিনের এ অভিযাত্রায় একদিকে যেমন ছিল শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষা, অন্যদিকে ছিল মানসিক দৃঢ়তা ও লক্ষ্য ধরে রাখার লড়াই। দীর্ঘ পথ, দ্রুত পরিবর্তনশীল আবহাওয়া, দুর্গম পাহাড়ি ট্রেইল এবং উচ্চতার কারণে সৃষ্ট নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে প্রতিটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়েছে তাঁকে। বীর কুমারের ভাষায়, ‘স্বপ্ন বড় হলে পথ যত কঠিনই হোক, থেমে যাওয়া যায় না।’
এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে পৌঁছানোর পর বীর কুমার বলেন, এই অর্জন তাঁর একার নয়। দীর্ঘ অভিযাত্রায় যাঁরা তাঁকে সহযোগিতা ও উৎসাহ দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ। দেশের মানুষের শুভকামনা, ভালোবাসা ও সহযোগিতা তাঁকে কঠিন সময়েও সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছে। সামনে থাকা লক্ষ্যগুলো পূরণ করে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে নিরাপদে দেশে ফিরতে চান বলেও জানান তিনি।
বীর কুমারের এই অভিযানের বিশেষ দিক হলো, এটি শুধু একজন সাইক্লিস্টের দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রমের ঘটনা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে জনসচেতনতা, পরিবেশ সংরক্ষণ, রক্তদান এবং জলবায়ু ন্যায্যতার মতো সামাজিক বার্তা। ক্রীড়া ও অ্যাডভেঞ্চারের মাধ্যমে এসব বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি বাংলাদেশের তরুণদের সামনে নতুন ধরনের অভিযাত্রা ও অ্যাডভেঞ্চারের সম্ভাবনাও তুলে ধরতে চেয়েছেন তিনি।
সাইকেল অভিযানে বীর কুমারের অভিজ্ঞতাও দীর্ঘদিনের। এর আগে সাইকেলে বাংলাদেশের ৬৪ জেলা ভ্রমণ করেছেন তিনি। দেশের দীর্ঘতম ক্রস-কান্ট্রি রুট টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্তও সাইকেলে পাড়ি দিয়েছেন। ভারতের ১০টি রাজ্য ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে শুরু করে প্রায় ৭১ দিনে ৫ হাজার ৭০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ২০২৪ সালের মার্চে দেশে ফেরেন তিনি।
কাপ্তাই উপজেলার ওয়াগ্গা ইউনিয়নের বাসিন্দা বীর কুমার তনচংগ্যা কাপ্তাই ব্লাড ব্যাংক ও ওয়াগ্গা ভলান্টিয়ারের প্রতিষ্ঠাতা। দীর্ঘদিন ধরে স্বেচ্ছায় রক্তদান, মানবসেবা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জলবায়ু বিষয়ে সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত তিনি। ফলে তাঁর এবারের অভিযানেও অ্যাডভেঞ্চারের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতার বার্তা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
কক্সবাজারের সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে শুরু করে বাংলাদেশের উত্তর সীমান্ত বাংলাবান্ধা, ভারতের শিলিগুড়ি হয়ে নেপালের দুর্গম হিমালয়—দুই চাকার সাইকেলে একের পর এক চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে ৫ হাজার ৩৬৪ মিটার উচ্চতার এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে বীর কুমার তনচংগ্যার ৩৮ দিনের অভিযাত্রা শেষ হয়েছে। কাপ্তাইয়ের এই অভিযাত্রীর কাছে এটি যেমন ব্যক্তিগত স্বপ্নপূরণের মুহূর্ত, তেমনি দেশের অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী তরুণদের জন্যও নতুন সম্ভাবনার একটি উদাহরণ হয়ে থাকল।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।