হত্যার দাবি ভারতের, সাবেক সেনা সদস্যকে জীবিত সামনে আনলো পাকিস্তান
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
কাশ্মীরে পাকিস্তানি একটি সশস্ত্রগোষ্ঠীর শীর্ষ কমান্ডারকে হত্যার দাবি করেছে ভারত। তবে নয়াদিল্লির এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী। ভারত যে ব্যক্তিতে নিহত হিসেবে উপস্থাপন করেছে বৃহস্পতিবার (২ অক্টোবর) ইসলামাবাদ তাকে জীবিত অবস্থায় সাংবাদিকদের সামনে হাজির করে। জানা গেছে, মোহাম্মদ আসিফ নামে ওই ব্যক্তি কোনো উগ্র গোষ্ঠীর সদস্য নন, বরং সাবেক সেনা সদস্য।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমদ শরিফ এক টেলিভিশন সংবাদ সম্মেলনে ভারতের বক্তব্যকে ‘বানোয়াট’ বলে দাবি করেন। সেখানে তিনি মোহাম্মদ আসিফকে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করেন।
শরিফের দাবি, ভারত যাকে নিহত লস্কর-ই-তৈয়বার কমান্ডার হিসেবে চিহ্নিত করেছে, ওই ব্যক্তি আসলে পাকিস্তানের সাবেক সেনাসদস্য। তিনি ২০২৩ সালে চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন।
আসিফ নিজেও সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন ও ২০২৩ সালে অবসর নেন। ভারতের গণমাধ্যমে নিজের মৃত্যুর খবর দেখার পর তার বন্ধুরা তাকে ফোন করে বিষয়টি জানতে চেয়েছিলেন। তখন তিনি তাদের জানান, তিনি জীবিত ও সুস্থ আছেন।
তার ভাষায়, নিজের পরিচয় পরিষ্কার করতেই তিনি প্রকাশ্যে এসেছেন। ভারতের গণমাধ্যম তার মৃত্যুর খবর প্রকাশের সময় তার জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি দেখিয়েছে। এ বিষয়ে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন।
ভারতের দাবি কী?
পাকিস্তানের এই বক্তব্যের এক দিন আগে, বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত এক অভিযানে লস্কর-ই-তৈয়বার জ্যেষ্ঠ কমান্ডার মুসা ওরফে আসিফ ফৌজি নিহত হয়েছেন।
ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই হত্যাকাণ্ডকে লস্কর-ই-তৈয়বার জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে বর্ণনা করে। তাদের দাবি, ২০২২ সাল থেকে ওই অঞ্চলে বেশ কয়েকটি বড় হামলার জন্য দায়ী চার সদস্যের কমান্ডার গ্রুপের সর্বশেষ জীবিত সদস্য ছিলেন মুসা। এর আগে পৃথক অভিযানে নিহত হয়েছেন বাকি তিন সদস্য- জুনায়েদ ভাট, সুলেমান ও ইয়াসির।
ভারতের সরকারি বিবৃতিতে আরও বলা হয়, নিরাপত্তা বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে মুসাকে অনুসরণ করছিল। তার গতিবিধি ও অবস্থান সম্পর্কে প্রযুক্তিগত ও মানব গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর তাকে ধরতে একটি বিশেষ সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ভারত বলছে, মুসাকে হত্যার অভিযানটি ‘অপারেশন শেরুওয়ালি’ নামের একটি দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের অংশ, যা ২০২৬ সালের মে মাসে শুরু হয়েছিল।
অর্থাৎ, ভারত বলছে তারা লস্করের শীর্ষ এক কমান্ডারকে হত্যা করেছে; অন্যদিকে পাকিস্তান বলছে, ভারত যে ব্যক্তিকে ওই কমান্ডার হিসেবে শনাক্ত করেছে, তিনি জীবিত ও তিনি পাকিস্তানের সাবেক সেনাসদস্য।
পাকিস্তানের পাল্টা অভিযোগ
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ভারতের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমদ শরিফের দাবি, ভারত জঙ্গি সহিংসতার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করতে ‘বানোয়াট’ অভিযোগ তৈরি করছে ও মিথ্যা অভিযান সাজাচ্ছে।
তিনি বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড অত্যন্ত ‘লজ্জাজনক ও বিব্রতকর’। তার ভাষায়, কোনো আত্মমর্যাদাশীল দেশ এমন কাজ করে না।
পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্রের এই বক্তব্য অবশ্য পাকিস্তানের পক্ষের দাবি। ভারত এখন পর্যন্ত ওই সংবাদ সম্মেলনের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
ফের যুদ্ধের শঙ্কা?
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা নতুন নয়। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীন হওয়ার পর দুই দেশ তিনবার যুদ্ধে জড়িয়েছে। এর মধ্যে দুটি যুদ্ধের কেন্দ্র ছিল কাশ্মীর।
হিমালয়ের বিতর্কিত কাশ্মীর অঞ্চল বর্তমানে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিভক্ত। দুই দেশই পুরো কাশ্মীরের ওপর নিজেদের দাবি জানিয়ে আসছে। এই বিরোধ দীর্ঘদিন ধরেই দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীর সম্পর্কের অন্যতম প্রধান সংকট।
এই পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আহমদ শরিফকে জিজ্ঞেস করা হয়, সাম্প্রতিক অভিযোগের জেরে দুই দেশের মধ্যে আবারও সশস্ত্র সংঘাত শুরু হতে পারে কি না।
জবাবে তিনি বলেন, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। ভারত কোনো পদক্ষেপ নিলে এবার ‘খুব কঠোর’ প্রতিক্রিয়া জানানো হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
শরিফ বলেন, ভারত যদি কিছু করতে চায়, তাহলে তারা তা করতে পারে। তবে এবার পাকিস্তান সহজে ছেড়ে দেবে না। তার ভাষায়, ভারতের এমন ‘কৌশলগত ভুলের’ জন্য পাকিস্তান যে মূল্য চাপিয়ে দেবে, তা হবে ‘খুব, খুব কঠিন’।
এখন পর্যন্ত অবশ্য নতুন কোনো সশস্ত্র সংঘাত শুরু হওয়ার খবর নেই। তবে নিহত ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের এই প্রকাশ্য বিরোধ কাশ্মীরকে ঘিরে দুই দেশের দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস ও উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভারতের দাবি করা নিহত মুসা ওরফে আসিফ ফৌজি ও পাকিস্তানের সংবাদ সম্মেলনে হাজির করা জীবিত মোহাম্মদ আসিফ একই ব্যক্তি কি না- এর নিরপেক্ষ ও ফরেনসিকভাবে যাচাইযোগ্য উত্তরই এখন পুরো ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু। সেই প্রমাণ প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত দুই দেশের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যকে আলাদা করে দেখা ও কোনটি দাবি, আর কোনটি যাচাই করা তথ্য- তা স্পষ্ট বলা যাচ্ছে না।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।