বড় বড় গর্ত আর খানাখন্দে বেহাল রামগড়-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়ক
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
খাগড়াছড়ির রামগড়-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়কের রামগড় বাজার থেকে বাগানবাজার পর্যন্ত প্রায় ৪ কিলোমিটার অংশ দীর্ঘদিন ধরে বড় বড় গর্ত ও খানাখন্দে বেহাল হয়ে পড়েছে। কয়েক বছর ধরে স্থায়ী সংস্কার না হওয়ায় প্রতিদিন হাজারো যাত্রী, পরিবহন শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সড়কের গর্তগুলো বৃষ্টির পানিতে ডুবে থাকায় চালকরা গর্তের গভীরতা বুঝতে না পেরে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রামগড় স্থলবন্দরকে ঘিরে সড়কটি প্রশস্তকরণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ থাকায় জনদুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেবল সাময়িকভাবে গর্তে খোয়া বা ইটের টুকরো ফেলে দায়সারা সংস্কার করলেও স্থায়ী কোনো সমাধান হচ্ছে না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রামগড় বাজারের হাইস্কুলের সামনে থেকে স্থলবন্দর এলাকা পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার সড়ক সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। কোথাও কোথাও পিচ ও ঢালাই উঠে গিয়ে বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। একেকটি গর্তের প্রস্থ দুই থেকে ছয় ফুট এবং গভীরতা তিন থেকে আট ইঞ্চি পর্যন্ত। পুরো সড়কজুড়ে ভাঙাচোরা অংশ, উঠে আসা পাথর ও ছড়িয়ে থাকা সুরকি যান চলাচলকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে খাগড়াছড়ি, ফেনী, চট্টগ্রাম ও ঢাকাগামী বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পণ্যবাহী যান, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, টমটম, মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়িসহ শত শত যানবাহন চলাচল করে। অথচ মাত্র পাঁচ মিনিটে অতিক্রম করার মতো রামগড়-বাগানবাজার অংশটি পার হতে এখন সময় লাগছে প্রায় ২০ মিনিট। এতে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে জ্বালানি ব্যয় এবং যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রামগড় স্থলবন্দরকে কেন্দ্র করে রামগড়-বারইয়ারহাট সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় ধাপে ধাপে বারইয়ারহাট থেকে বাগানবাজার পর্যন্ত সড়ক সম্প্রসারণের কাজ শেষ হলেও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার সীমানা সোনাইপুল থেকে রামগড় পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার অংশের কাজ দীর্ঘদিন ধরে অজ্ঞাত কারণে বন্ধ রয়েছে। ফলে ওই অংশের স্থায়ী সংস্কারও হচ্ছে না।
এদিকে প্রকল্পের কাজ শুরু না হওয়ায় খাগড়াছড়ি সড়ক ও জনপথ বিভাগ প্রতি দুই থেকে চার মাস পরপর ভাঙা অংশে সাময়িক মেরামত করেই দায়িত্ব শেষ করছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। কিন্তু ভারী বৃষ্টির কয়েক দিনের মধ্যেই আবারও সেই অংশ ভেঙে আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে।
পরিবহন চালকদের অভিযোগ, সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে প্রতিনিয়ত যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। গর্তে পড়ে বাস-ট্রাকের স্প্রিং, স্টিয়ারিং জয়েন্ট, সাসপেনশনসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছোট-বড় দুর্ঘটনাও ঘটছে।

ব্যাটারিচালিত টমটমচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, “সড়কে এত বড় বড় গর্ত যে গাড়ি চালানোই কষ্টকর হয়ে গেছে। প্রায়ই গাড়ি বিকল হয়ে যায়। কখনো গর্তে পড়ে গাড়ি উল্টে যায়। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে স্কুল-কলেজগামী ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা। প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে গাড়ি চালাতে হয়।”
বাসচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বারইয়ারহাট-খাগড়াছড়ি সড়কের মধ্যে রামগড়-বাগানবাজার অংশটাই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘদিন মেরামত না হওয়া এবং টানা বৃষ্টিতে অসংখ্য বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। বৃষ্টির পানিতে গর্ত ঢেকে থাকায় চালকরা বুঝতে পারেন না কোথায় কত গভীর গর্ত। এতে গাড়ির স্প্রিং ভেঙে যায়, স্টিয়ারিংয়ের জয়েন্ট নষ্ট হয়। দ্রুত স্থায়ী সংস্কার না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায়ও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। সভায় উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি শাহ আলম অভিযোগ করে বলেন, সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের অজুহাতে বছরের পর বছর স্থায়ী সংস্কার করা হচ্ছে না। এতে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থী, পথচারী ও বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রীরা। তিনি দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন অথবা স্থায়ী সংস্কারের মাধ্যমে জনদুর্ভোগ দূর করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে খাগড়াছড়ি সড়ক ও জনপথ বিভাগের রামগড় উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী ধর্ম জ্যোতি চাকমা বলেন, রামগড় স্থলবন্দর সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের আওতায় থাকায় ওই অংশে স্থায়ী সংস্কারে কিছু জটিলতা রয়েছে। তবে জনদুর্ভোগ কমাতে আমরা নিয়মিতভাবে সাময়িক মেরামত করছি এবং বর্তমানে মেরামত কাজও চলমান রয়েছে। স্থলবন্দরকেন্দ্রিক সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের কাজ শুরু হলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে। প্রকল্পটি চট্টগ্রাম সড়ক ও জনপথ বিভাগ বাস্তবায়ন করছে।
উল্লেখ্য, রামগড় স্থলবন্দর ঘেঁষা সড়কটি এ অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হওয়ায় প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক পণ্যবাহী যানবাহন এই সড়ক ব্যবহার করে। একই সঙ্গে এটি খাগড়াছড়ির সঙ্গে ফেনী, চট্টগ্রাম ও ঢাকার অন্যতম প্রধান যোগাযোগপথ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী সংস্কার না হওয়ায় সড়কটি এখন কার্যত দুর্ঘটনার ঝুঁকিপূর্ণ করিডোরে পরিণত হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের মতে, জনদুর্ভোগ কমাতে সাময়িক মেরামতের পরিবর্তে দ্রুত সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের কাজ শুরু করে স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।