রামুতে বন্যার ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট, নদীভাঙনে বিলীন ঘরবাড়ি; পুনর্বাসন ও স্থায়ী বাঁধের দাবি

রামুতে বন্যার ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট, নদীভাঙনে বিলীন ঘরবাড়ি; পুনর্বাসন ও স্থায়ী বাঁধের দাবি

রামুতে বন্যার ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট, নদীভাঙনে বিলীন ঘরবাড়ি; পুনর্বাসন ও স্থায়ী বাঁধের দাবি
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”

Loading

জার্নাল প্রতিবেদক

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের রামু উপজেলায় সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যার পানি নেমে গেলেও এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র। বাঁকখালী নদীর ভয়াবহ ভাঙনে নদীতীরবর্তী বহু বসতভিটা, কৃষিজমি ও অবকাঠামো নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন হাজারো মানুষ। ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকেই অভিযোগ করেছেন, এখনো পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা তাদের কাছে পৌঁছায়নি।

স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, এবারের বন্যায় রামু উপজেলার অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়। পানিবন্দী হয়ে পড়েন অন্তত লাখো মানুষ। টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যায়। পানির নিচে চলে যায় অসংখ্য ফসলি জমি, আমন ধানের বীজতলা, সবজি ক্ষেত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গ্রামীণ সড়ক, বিভিন্ন স্থাপনা এবং শত শত বসতঘর।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, এবারের বন্যায় বাঁকখালী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে। নদীর বিপৎসীমা যেখানে ৫.৭৯ মিটার, সেখানে পানির উচ্চতা বেড়ে ৫.৯৫ মিটার পর্যন্ত পৌঁছায়। ফলে নদীর তীব্র স্রোতে বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন দেখা দেয়।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া, দক্ষিণ মিঠাছড়ি, কাউয়ারখোপ ও ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা। বন্যার পানি সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীভাঙনের কারণে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, বসতভিটা ও গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার দৃশ্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অনেক পরিবার এক রাতেই সর্বস্ব হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে কিংবা স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।

গর্জনিয়া ইউনিয়নের মাঝিরকাটা এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানান, এবারের বন্যা তাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। নদীর ভাঙনে ঘরবাড়ি ও বসতভিটা হারিয়ে তারা এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। অনেকের কাছে রাতে নিরাপদে থাকারও কোনো ব্যবস্থা নেই।

কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের দোছড়ি পূর্বপাড়া এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল হক বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে নদীর পাশে বসবাস করছি। কিন্তু এবারের পাহাড়ি ঢলে আমার পুরো বাড়িটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এখন পরিবার নিয়ে কোথায় থাকব, কীভাবে নতুন করে ঘর তুলব, তা বুঝতে পারছি না। দ্রুত নদীভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”

ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ করা হলেও অনেক দুর্গম এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত সহায়তা পৌঁছেনি। বিশেষ করে যেসব পরিবার সম্পূর্ণভাবে ঘরবাড়ি হারিয়েছে, তাদের পুনর্বাসনের বিষয়ে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান বলেন, “সাম্প্রতিক বন্যায় রামু উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে এবং উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্যার স্রোতে ভেসে গিয়ে দুইজনের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে দুর্গত এলাকার মানুষকে সতর্ক রাখা এবং নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি ত্রাণ ও সহায়তা ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।”

তিনি আরও জানান, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো ইতোমধ্যে পরিদর্শন করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বিষয়টি জানানো হয়েছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতে, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে বাঁকখালী নদীর ভাঙনে রামুর বিভিন্ন ইউনিয়নের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও স্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থা না থাকায় একই দুর্ভোগ বারবার ফিরে আসে। তাই ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের পাশাপাশি নদীভাঙন রোধে টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও নদীশাসনের কার্যকর প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন তারা।

উল্লেখ্য, এবারের বন্যা শুধু সাময়িক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করেনি; এটি রামুর নদীতীরবর্তী মানুষের জীবন-জীবিকা ও ভবিষ্যতের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। ত্রাণ বিতরণের পাশাপাশি যেসব পরিবার ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি হারিয়েছে, তাদের পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ এবং বাঁকখালী নদীর স্থায়ী ভাঙন প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটবে এবং নদীতীরবর্তী মানুষের নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়বে।

  • অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
  • ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
  • ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল  কন্টেন্টের দুনিয়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *