রণক্ষেত্র দিল্লি: বন্ধ ইন্টারনেট, আন্দোলনের মুখ্য নেতা অভিজিৎ দীপককে আটক করল পুলিশ
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
ভারতের পার্লামেন্ট অভিমুখে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে রাজধানী নয়াদিল্লি।
সোমবার (২০ জুলাই) পুলিশের অনুমতি না থাকা সত্ত্বেও সেখানে জড়ো হয় ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনকারীরা।
এ সময় আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে নিরাপত্তা বাহিনী কাঁদানে গ্যাসের শেল ব্যবহার করেছে। একই সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেন্ট্রাল দিল্লির কিছু অংশে মোবাইল ইন্টারনেটও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
মেডিকেল কলেজগুলোর জাতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা—নিটটের কথিত অনিয়মের বিরুদ্ধে এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে এই ‘চলো সংসদ’ পদযাত্রার ডাক দেওয়া হয়। যন্তর-মন্তর বিক্ষোভস্থলে জড়ো হওয়া প্রধানত তরুণদের এই জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠি ও ডান্ডাও ব্যবহার করেছে। পার্লামেন্টের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে ফেলার চেষ্টা করলে কিছু আন্দোলনকারী এবং পুলিশ সদস্য সামান্য আহত হয়েছেন।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সিজেপি তার সমর্থকদের ‘শান্ত থাকার’ আহ্বান জানিয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এমনকি আপনাদের যদি নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় আটকে দেওয়া হয়, তবুও শান্ত থাকুন এবং শান্তি বজায় রাখুন। আমরা কেবল শান্তি ও ভালোবাসা দিয়ে এতে জয়ী হব।
পুলিশ রোববার এই আন্দোলনের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল এবং বড় ধরনের জমায়েত নিষিদ্ধ করেছিল। তারা সতর্কও করেছিল, এই নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারী যে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে পুলিশ জানায়, পূর্বানুমতিসহ যন্তর-মন্তরের নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল ছাড়া অন্য কোথাও প্রতিবাদ পদযাত্রা, মিছিল, বিক্ষোভ এবং পাঁচ বা ততোধিক ব্যক্তির সমাবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। দিল্লি পুলিশ সকল নাগরিককে আইনকে শ্রদ্ধা করার, যে কোনো অননুমোদিত সমাবেশ বা মিছিলে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকার এবং জনশান্তি, নিরাপত্তা ও সুরক্ষা বজায় রাখতে সহযোগিতা করার আহ্বান জানাচ্ছে।
এদিকে আন্দোলনের মুখ্য নেতা অভিজিৎ দীপককে পুলিশ আটক করে নিয়ে গেছে। সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ এই কথা জানিয়েছেন ককরোচ জনতা পার্টির মুখপাত্র সৌরভ দাস। এছাড়াও সোনাম ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমোর উপর পুলিশি হেনস্থার অভিযোগ এনেছেন তিনি।
দিল্লি মেট্রো স্টেশনগুলোতে বিশৃঙ্খলা
নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দিল্লির পাঁচটি মেট্রো স্টেশন বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। স্টেশনগুলো হলো—রাজীব চক, জনপথ, প্যাটেল চক, কেন্দ্রীয় সচিবালয় এবং সেবা তীর্থ।
এগুলো বন্ধ করে দেওয়ার পর বেশ কয়েকটি মেট্রো স্টেশনে তীব্র বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এর ফলে শত শত যাত্রী আটকা পড়েন অথবা তাদের গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য দীর্ঘ পথ ব্যবহারে বাধ্য হন। দিল্লির অন্যতম ব্যস্ত ইন্টারচেঞ্জ মেট্রো স্টেশন রাজীব চকে যাত্রীদের বন্ধ প্রবেশ ও বাহির পথের গেটগুলোর কাছে ভিড় করতে দেখা গেছে।
রবিবার (১৯শে জুলাই) রাত থেকেই যন্তর মন্তরে ২০ তারিখের সংসদ অভিযানের জন্য জড়ো হতে শুরু করেছিলেন ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা আন্দোলনকারীরা। ভারতের সংসদে বাদল অধিবেশন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সংসদ ভবনের দিকে এগোতে শুরু করেন আন্দোলনকারীরা। পুলিশের সঙ্গে একাধিক সংঘর্ষের ছবিও সামনে আসে। বন্ধ করে দেওয়া হয় মধ্য দিল্লির বেশ কয়েকটি মেট্রো স্টেশন। আন্দোলনকারীরা সংসদ ভবনের কাছে রেল ভবন পর্যন্ত পৌঁছে গেলে তাদের উপর কাঁদানে গ্যাস প্রয়োগ করে সশস্ত্র কেন্দ্রীয় পুলিশবাহিনী।
আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছিলেন সোনাম ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো। তিনি শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা দাবি করেছেন। দুপুর ১২টা নাগাদ ককরোচ জনতা পার্টির সহ-প্রতিষ্ঠাতা সৌরভ দাস সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ জানান যে তারা কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন।

শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডার কাছে হলফনামা জমা দিয়েছেন ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিনিধিরা।
আলোচনায় রাজি হওয়ায় সোনাম ওয়াংচুক অভিজিৎ দীপকেকে অনুরোধ করেছেন তার অনশন ভঙ্গ করার জন্য। সোনাম ওয়াংচুককে ধর্ণাস্থল থেকে হাসপাতালে স্থানান্তর করার পর থেকেই অনশনে বসেছিলেন অভিজিৎ দীপকে। যদিও সোনাম ওয়াংচুকের অনশন এখনও চলছে বলেই জানিয়েছেন তার স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো।
প্রতিবাদ মঞ্চ থেকে গীতাঞ্জলি আংমো বলেন, “এই সরকার জনবিরোধী, এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলবে।”
সম্প্রতি ভারতের চিকিৎসাক্ষেত্রে ভর্তির পরীক্ষা নিট-এর প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ায় সারা দেশ থেকে ২১ জন ছাত্রছাত্রীর আত্মহত্যার খবর মিলেছে। ফলে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা চেয়ে আন্দোলন শুরু করে ককরোচ জনতা পার্টি। তাদের সমর্থন দিয়ে অনশনে বসেন শিক্ষকর্মী ও পরিবেশ বিষয়ক আন্দোলনকারী সোনাম ওয়াংচুক।
সিজেপির বিক্ষোভ
ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের ‘পরজীবী’ এবং ‘তেলাপোকা’ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্কের পর গত মে মাসে অভিজিৎ দিপকে একটি ব্যঙ্গাত্মক ডিজিটাল সংগঠন হিসেবে ককরোচ জনতা পার্টি চালু করেছিলেন। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে এটি ইন্টারনেট দুনিয়ায় ঝড় তোলে এবং বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে লাখ লাখ অনুসারী অর্জন করে। এটি বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক নেতা, অধিকারকর্মী, শিল্পী এবং ক্রীড়াবিদদের সমর্থনও আকর্ষণ করে।
৩০ বছর বয়সি দিপকে, যিনি গত দুই বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছিলেন, তিনি প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোতে কথিত অনিয়মের পর শিক্ষা খাতে সংস্কারের দাবিতে দিল্লির বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিতে জুনে ভারতে ফিরে আসেন। পরে তার সঙ্গে যোগ দেন অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক, যিনি গত ২৮ জুন যন্তর-মন্তরে আমরণ অনশনে বসেন।
তবে ৫৯ বছর বয়সি ওয়াংচুককে তার স্বাস্থ্যগত অবস্থার কথা উল্লেখ করে গত শনিবার পুলিশ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সোমবার (২০ জুলাই) হাসপাতাল থেকে দেওয়া এক হাতে লেখা নোটে ওয়াংচুক বলেন, সরকার যদি শিক্ষা ব্যবস্থায় কথিত প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং অন্যান্য ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে অথবা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এমপি ও নেতারা যদি তাকে আশ্বাস দেন যে তারা পার্লামেন্টে এই বিষয়টি উত্থাপন করবেন, তবেই কেবল তার অনশন ভাঙবে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।