সাগরে জেলেদের কাছে যেভাবে পৌঁছে আবহাওয়ার পূর্বাভাস
“এখান থেকে শেয়ার করতে পারেন”
![]()
তারেকুর রহমান, কক্সবাজার
দীর্ঘ ৩০ বছরের জেলে জীবনে সাগরের নানা রূপ দেখেছেন আব্দুল করিম (৪৫)। তিনি কক্সবাজারের টেকনাফ বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর গ্রামের বাসিন্দা। শান্ত সমুদ্র যেমন তাকে দিয়েছে জীবিকার পথ, তেমনি বৈরী আবহাওয়া কেড়ে নিতে বসেছিল তার জীবনও। একবার মাছ ধরার ট্রলার থেকে পড়ে গিয়ে মৃত্যুর মুখোমুখিও হয়েছিলেন তিনি।
সেই অভিজ্ঞতার পর সাগরে যাওয়ার আগে আবহাওয়ার খবর নেওয়া এখন তার নিয়মিত অভ্যাস। শুধু নিজে নন, সহকর্মী জেলেদেরও সতর্ক করেন তিনি।
আব্দুল করিম বলেন, ‘আগে আমরা আকাশের অবস্থা দেখে আন্দাজ করতাম। কিন্তু এখন হঠাৎ করেই আবহাওয়া খারাপ হয়ে যায়। কয়েক বছর আগে গভীর সমুদ্রে ঝড়ের মধ্যে পড়েছিলাম। এরপর থেকে মাছ ধরতে যাওয়ার আগে আবহাওয়ার খবর দেখি। সঙ্গে রেডিও যুক্ত মোবাইল রাখি। সেখান থেকে আবহাওয়ার খবর জেনে নিই।’
শুধু আব্দুল করিম নন, কক্সবাজারের উপকূলের অনেক জেলেই এখন সাগরে যাওয়ার আগে আবহাওয়ার সর্বশেষ পরিস্থিতি জানার চেষ্টা করেন। কারণ নিম্নচাপ, দমকা হাওয়া, বজ্রঝড় কিংবা উচ্চ ঢেউ যেকোনো একটি মুহূর্তের মধ্যে সাগরের অবস্থা বদলে গিয়ে আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের জেলে মোহাম্মদ ইলিয়াস (৩১) বলেন, ‘সাগরে গেলে পরিবার সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকে। এখন মোবাইলে আবহাওয়ার খবর পাই বলে কিছুটা নিশ্চিন্তে যেতে পারি।’
মহেশখালীর জেলে নুরুল আলমও (৪০) এখন আবহাওয়ার পূর্বাভাসকে গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, ‘আগে সতর্ক সংকেতের কথা তেমন বুঝতাম না। এখন মাছ ধরতে যাওয়ার আগে মোবাইলে আবহাওয়ার খবর দেখি। সংকেত বেশি থাকলে সাগরে যাই না।’
কক্সবাজার ফিশারিঘাটের জেলে নুরুল আলম (৫২) ওরফে নুরু মাঝি বলেন, ‘ট্রলার নিয়ে ১৫ জন জেলেসহ একবার ঝড়ের মধ্যে পড়ে অনেক কষ্টে ফিরে এসেছিলাম। এরপর থেকে আবহাওয়ার খবর না জেনে সাগরে যাই না।’
প্রায় ৪০ বছরের অভিজ্ঞ এই জেলে বলেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এখন সাগরে যাওয়া, ফিরে আসা কিংবা নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করার সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
গভীর সমুদ্রে কীভাবে পৌঁছে সতর্কবার্তা
জেলেদের কাছে আবহাওয়ার তথ্য পৌঁছানোর প্রধান উৎস বাংলাদেশ আবহাওয়া
অধিদপ্তরের পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা। এর পাশাপাশি মোবাইল ফোন, রেডিও, মৎস্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা, স্থানীয় প্রশাসনের মাইকিং এবং ঘাটভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমেও জেলেদের সতর্ক করা হয়।
কক্সবাজার ফিশারিঘাটের আরেক জেলে নুর কাশেম (৩৮) বলেন, ‘ঘাটে গেলে অন্য জেলেদের কাছ থেকেও খবর পাই। এখন অনেকের মোবাইলে আবহাওয়ার অ্যাপ আছে। কেউ তথ্য পেলেই গভীর সমুদ্রে গেলেও সবাইকে জানিয়ে দেয়।’
টেকনাফের বাহারছড়ার কচ্ছপিয়া এলাকার জেলে সাইফুল ইসলাম (২৮) বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় বা নিম্নচাপের খবর এলে স্থানীয় সাংবাদিককে ফোন করে বিস্তারিত জেনে নিই। এতে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে পারি।’
কক্সবাজার জেলা ফিশিংবোট শ্রমিক ইউনিয়নের উপদেষ্টা মিজানুর রহমান বাহাদুর বলেন, ‘উপকূল থেকে গভীর সমুদ্রে যাওয়ার পর যোগাযোগের ব্যবস্থা বদলে যায়। দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত হয়ে পড়তে পারে। ফলে সাগরে থাকা জেলেদের জন্য রেডিওসহ নির্ভরযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি নৌকার মাঝি ও জেলেদের আবহাওয়ার সংকেত ও সতর্কবার্তা বোঝার সক্ষমতাও বাড়ানো প্রয়োজন। তবে রেডিও সবসময় কার্যকর নাও থাকতে পারে। তখন ট্রলারে থাকা অন্য যোগাযোগব্যবস্থা, আশপাশের নৌযান, মাঝি-জেলেদের পারস্পরিক যোগাযোগ করে ঘাটে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে। ’
তিনি বলেন, ‘মোবাইলের রেডিও সুবিধার পাশাপাশি আবহাওয়ার তথ্য ও পূর্বাভাসনির্ভর উন্নত অ্যাপ ব্যবহার করা গেলে জেলেরা আগেভাগেই বৈরী আবহাওয়ার বিষয়ে সতর্ক হতে পারবেন। এতে ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে সাগরে থাকা এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কা অনেকটাই কমানো সম্ভব।’

জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে অনিশ্চয়তা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবহাওয়ার তথ্যের গুরুত্ব বাড়ার আরেকটি কারণ হলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, আবহাওয়ার পরিবর্তনশীলতা এবং আকস্মিক বৈরী পরিস্থিতি উপকূলীয় জেলেদের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ে কাজ করা কক্সবাজারের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আহমদ গিয়াস বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে নিম্নচাপ, ঘূর্ণিঝড় এবং আকস্মিক ঝড়ো হাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। তাই জেলেদের জন্য নির্ভরযোগ্য আবহাওয়া তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্ষা মৌসুম কিংবা নিম্নচাপের সময় ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। বৈরী আবহাওয়ায় উচ্চ ঢেউ, প্রবল বাতাস ও দৃষ্টিসীমা কমে যাওয়ায় নৌযান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে। অতীতে এমন পরিস্থিতিতে মাছ ধরার নৌকা দুর্ঘটনায় পড়া, জেলে নিখোঁজ হওয়া এবং নৌকা ও জাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।’
সতর্কবার্তা পেলেই কী করবেন জেলেরা?
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বলেন,
‘সাধারণত প্রতিদিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আমরা রেডিওতে আবহাওয়ার বুলেটিন পাঠাই। রেডিও কর্তৃপক্ষ তাদের সময়সূচি অনুযায়ী তা প্রচার করে। বুলেটিনে বাতাসের গতিবেগ, ঝড়ের ধরন, বৃষ্টিপাত ও পানির উচ্চতাসহ প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হয়।’
তিনি বলেন, ‘সমুদ্রে যাওয়ার আগে আবহাওয়ার সর্বশেষ পূর্বাভাস জেনে নেওয়া জরুরি। সতর্ক সংকেত জারি থাকলে গভীর সমুদ্রে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। সাগরে অবস্থানকালে হঠাৎ আবহাওয়ার অবনতি হলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যেতে হবে।’
এ আবহাওয়াবিদ আরও বলেন, ‘প্রতিটি ফিশিং ট্রলারে পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট, যোগাযোগের ব্যবস্থা এবং জরুরি নিরাপত্তা সরঞ্জাম থাকা প্রয়োজন। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তা অনুসরণ করলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।’

পূর্বাভাসই হতে পারে জীবন রক্ষার মাধ্যম
কক্সবাজার সদরের খুরুশকুল এলাকার জেলে আবদুন নবী বলেন, ‘আবহাওয়ার খবর এখন আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। আগে শুধু অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করতাম, এখন তথ্যের ওপরও ভরসা করি।’
কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, গত এক বছরে কক্সবাজারে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সাগরে ট্রলারডুবির ঘটনায় প্রায় ২০ জন জেলে নিখোঁজ রয়েছেন। সাগরের আবহাওয়া সবসময় একই রকম থাকে না। বিশেষ করে বৈরী আবহাওয়ার ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকায় জেলেদের নিরাপত্তার জন্য সময়মতো নির্ভরযোগ্য আবহাওয়ার তথ্য ও সতর্কবার্তা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কক্সবাজার বেতার কেন্দ্রের আঞ্চলিক প্রকৌশলী এটিএম মেহেদী কামাল বলেন, ‘আমরা সম্প্রচারে দুটি ট্রান্সমিটার ব্যবহার করি, অ্যামপ্লিটিউড মড্যুলেশন (এএম) ও ফ্রিকোয়েন্সি মড্যুলেশন (এফএম)। সমুদ্রে থাকা জেলেরা দিনের বেলায় এএম ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূর থেকে এবং রাতের বেলায় আরও দূর থেকে কক্সবাজার বেতারের সম্প্রচার শুনতে পারেন।’
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।