দুই দশক ধরে ‘ভূতের বাড়ি’, এবার শিক্ষার্থীদের জন্য খুলবে রামগড়ের সেই আবাসিক বিদ্যালয়
ছবি- দৈনিক আজাদী।
![]()
জার্নাল প্রতিবেদক
পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে একতলা বিদ্যালয় ভবন। পাশে শিক্ষার্থীদের থাকার হোস্টেল, শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য ডরমিটরি, ডাইনিং হল, রান্নাঘর, পানির ট্যাংক—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালুর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর কমতি নেই। অথচ প্রায় দুই দশক ধরে সেখানে নেই কোনো শিক্ষক, নেই কোনো শিক্ষার্থী। শ্রেণিকক্ষের দরজা-জানালায় জমেছে মরিচা, দেয়াল ঢেকেছে লতায়-পাতায়, ছাদ থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা। শিক্ষার্থীদের জন্য কেনা খাট, লেপ, তোশক, বেডশিট, বালিশ ও মশারিও পড়ে থেকে নষ্ট হয়েছে। সরকারি অর্থে নির্মিত একটি আবাসিক বিদ্যালয় এভাবেই বছরের পর বছর পড়ে ছিল রামগড়ের তৈচালা পাড়ায়।
এবার সেই নীরব ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের পদচারণা ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্ধ থাকার প্রায় দুই দশক পর রামগড় আবাসিক বিদ্যালয়টি চালুর উদ্যোগ নিয়েছেন খাগড়াছিড়ির স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড। গতকাল শুক্রবার বিকেলে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানকে সঙ্গে নিয়ে বিদ্যালয়টির ক্যাম্পাস পরিদর্শন করেন সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূইয়া। পরিদর্শন শেষে বিদ্যালয়টি চালুর বিষয়ে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়।

রামগড় বাজার থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে তৈচালা পাড়ায় ১২ একর জায়গাজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছিল বিদ্যালয়টি। সীমানাপ্রাচীর পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে বিদ্যালয় ভবন। এর পাশেই রয়েছে আবাসিক হোস্টেল এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের ডরমিটরি। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় বর্তমানে পুরো ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থাপনায় অযত্নের ছাপ স্পষ্ট। শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চ, চেয়ার ও ব্ল্যাকবোর্ড নষ্ট হয়ে গেছে। হোস্টেলের ভেতরে পড়ে থাকা আসবাবেও ধরেছে পচন। বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, পানির পাম্প, পানির ট্যাংক ও রান্নাঘরসহ বিভিন্ন সুবিধা থাকলেও দীর্ঘদিনের অব্যবহারে সেগুলোর অনেকটাই এখন অচল বা নষ্ট।
পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, পার্বত্য এলাকার অনাথ ও দরিদ্র শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে তিন পার্বত্য জেলায় তিনটি আবাসিক বিদ্যালয় নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০০৪ সালে প্রতিটি বিদ্যালয়ের জন্য পাঁচ কোটি টাকা করে মোট ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০০৫ সালে রাঙামাটির রাজস্থলী ও বান্দরবানের রুমায় নির্মিত দুটি আবাসিক বিদ্যালয় চালু হলেও রামগড়ের বিদ্যালয়টি আর চালু করা সম্ভব হয়নি।

বিদ্যালয়টি চালুর প্রস্তুতিও একসময় নেওয়া হয়েছিল। ২০০৭ সালে মাস্টাররোলে চারজন গার্ড, দুজন টেবিল বয়, দুজন আয়া, দুজন পিয়ন ও একজন ঝাড়ুদার নিয়োগ দেওয়া হয়। পরের বছর জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ৬০ জন অনাথ বালক ও ৬০ জন বালিকার ভর্তির জন্য আবেদনও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিদ্যালয় চালু না হওয়ায় কর্মীদের নিয়োগ এবং শিক্ষার্থীদের ভর্তি বাতিল হয়ে যায়। এরপর থেকে শিক্ষার্থীদের অপেক্ষায় থাকা ভবনটি ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত স্থাপনায় পরিণত হয়।
বিদ্যালয়ের উদ্বোধনী ফলক অনুযায়ী, ২০০৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ওয়াদুদ ভূইয়া ভবনটির উদ্বোধন করেন। শুক্রবার পরিদর্শনের সময় নিজের বক্তব্যে তিনি বলেন, তৎকালীন সময়ে জিয়াউর রহমানের ধারণাকে অনুসরণ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে এ ধরনের আবাসিক বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ওয়ান-ইলেভেনের সময় প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায় এবং পরে আর এগোয়নি। তাঁর ভাষ্য, তৎকালীন সময়ে বিদ্যালয়টি নির্মাণে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল।

ওয়াদুদ ভূইয়া বলেন, সরকারি অর্থে নির্মিত ভবনটির অনেক কিছুই এখন নষ্ট হয়ে গেছে। এখানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। বিদ্যালয়টি চালু করা গেলে দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগ বাড়বে এবং ঝরে পড়া রোধে ভূমিকা রাখবে। অনাথ, এতিম ও দরিদ্র শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে পড়াশোনার সুযোগ পাবে বলেও জানান তিনি।
পরিদর্শন শেষে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) অনুপ কুমার চাকমা বিদ্যালয়টির দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এত অর্থ ব্যয় করার পরও প্রতিষ্ঠানটি চালু না হওয়া দুঃখজনক। তাঁর ভাষায়, সরকারি অর্থ ব্যয় হওয়ার পর বিদ্যালয়টি কার্যত ‘ভূতের বাড়ি’ হয়ে ছিল এবং এর কারণে শিক্ষার্থীরা একটি সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বিদ্যালয়টি নতুন করে চালুর জন্য উন্নয়ন বোর্ড উদ্যোগ নেবে বলেও জানান তিনি।

বিদ্যালয়টি আবার চালুর উদ্যোগের খবরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে উচ্ছ্বাস। তাদের মতে, দীর্ঘদিন পড়ে থাকা এত বড় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু হলে রামগড়ের দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকার দরিদ্র, অনাথ ও এতিম শিশুদের জন্য শিক্ষার নতুন সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে আবাসিক সুবিধা থাকায় দূরবর্তী এলাকার শিক্ষার্থীরাও এখানে থেকে পড়াশোনার সুযোগ পাবে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত প্রয়োজনীয় সংস্কার ও শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের মাধ্যমে বিদ্যালয়টি চালু করা হবে এবং দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এলাকার শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ের নীরবতার মধ্যে পড়ে থাকা রামগড় আবাসিক বিদ্যালয়টির সামনে এখন তাই নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলছে। অবকাঠামো থাকলেও যে প্রতিষ্ঠান এতদিন শিক্ষার্থীদের জন্য বন্ধ ছিল, সেটি চালু হলে রামগড়সহ পার্বত্য এলাকার অনাথ, এতিম ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের আবাসিক শিক্ষার সুযোগ তৈরির পাশাপাশি সরকারি অর্থে নির্মিত দীর্ঘদিনের অব্যবহৃত স্থাপনাটিও কার্যকর ব্যবহারে ফিরবে।
- অন্যান্য খবর জানতে এখানে ক্লিক করুন।
- ফেসবুকে আমাদের ফলো দিয়ে সর্বশেষ সংবাদের সাথে থাকুন।
- ইউটিউবেও আছি আমরা। সাবস্ক্রাইব করে ঘুরে আসুন ডিজিটাল কন্টেন্টের দুনিয়ায়।